দুর্গাপুজোর (Durgapuja 2025) প্রাণ ঢাকের সুর। আগে বাঁশ-বেতের কাঠি থাকলেও এখন সস্তা প্লাস্টিক কাঠি দখল করেছে স্থান। ঢাকিদের জীবন, বাজারের প্রবণতা আর হারানো ঐতিহ্যের গল্প।

ঢাকের কাঠিতে হারিয়েছে ঐতিহ্য। ছবি: এআই নির্মিত।
শেষ আপডেট: 19 September 2025 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'আয় রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে! ঢ্যাংকুড়াকুড় ঢ্যাংকুড়াকুড় বাদ্যি বেজেছে!'
দুর্গাপুজো এলেই অন্তরা চৌধুরীর এই গান প্রাণে বাজে না, এমন বাঙালি কমই আছেন। আর এই গানে দুর্গাপুজোর গন্ধের সঙ্গেই যেটা ছুটে আসে, তা হল ঢ্যাংকুড়াকুড় ঢাকের বাদ্যি। ঢাকের বাদ্যি ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ বাঙালির দুর্গাপুজো। দ্রিমদ্রিম শব্দ দূর থেকে ভেসে এলেও মনে হয়, মা আসছেন মহা সমারোহে।
এককথায় বলতে গেলে, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে ঢাকের গর্জন। আর সেই সুরের প্রাণ আসে কাঠি থেকে। বেত বা বাঁশের কাঠিতে চামড়ার মাথা লাগিয়ে যে আঘাত পড়ে, তাতেই কাঁপে মণ্ডপ, আলোড়িত হয় বাঙালির মন। কিন্তু আজ, সেই কাঠির জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক। ঐতিহ্যের বুক চিরে এসেছে এক কৃত্রিম স্বর।
ক’দশক আগেও পুজোর আগে ঢাকিদের অন্যতম এক বিশেষ কাজ ছিল কাঠি জোগাড় করা। স্থানীয় বাঁশবনে পাওয়া বেত কেটে শুকিয়ে বানানো হতো কাঠি। সময় লাগত। লাগত পারদর্শিতা, বিশেষ যত্ন। তবেই নাকি একটা কাঠি নিখুঁত বোল তোলার যোগ্য হয়ে উঠত। তার দাম অবশ্য ছিল নামমাত্র।
কিন্তু আজ সেই ছবি অতীত। গ্রামে বাঁশবন কমেছে, বেতের জোগান দুষ্প্রাপ্য। হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর এখনও সে কাঠি বানালেও, তার দাম ছুঁয়েছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা জোড়া। অনেক সময় পুজোর কয়েকদিনের বাজনাতেই কাঠি ভেঙে যায়, তাই বারবার কিনতে হয়।
অন্যদিকে বাজার ভরে গেছে ফাইবার ও প্লাস্টিকের কাঠিতে। মাত্র ১৫ থেকে ২৫ টাকায় সহজলভ্য। টেকসইও বটে। একবার কিনলেই গোটা মরশুম টিকে যায়। ফলে ঢাকিদের প্রজন্ম দ্রুত ঝুঁকছে এই নতুন কাঠির দিকে। এখন প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ঢাকি প্লাস্টিক কাঠিই ব্যবহার করেন বলে জানান ঢাকি সংগঠনগুলির সদস্যরা।
হাওড়ার সাঁকরাইলের ঢাকি কালো রুইদাস আক্ষেপ করেন, “বাবার কাছ থেকে ঢাক বাজাতে শিখেছিলাম বেতের কাঠিতেই। সেই বোলটা ছিল আলাদা, একেবারে প্রাণ কাঁপানো। কিন্তু এখন বেত পাওয়া যায় না। দামও অনেক বেশি। বাধ্য হয়েই প্লাস্টিক হাতে তুলতে হচ্ছে।”
তাঁর কথায় মিশে আছে অভিমানও। বললেন, “এখনকার ছেলেরা আর বেতের কাঠি চিনেই না। প্লাস্টিক দিয়েই শিখছে। হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে বেতের কাঠি শুধু গল্পেই থাকবে।”
ঢাক বাজানো মানেই পূজোর দিনগুলোতে সামান্য রোজগার। বাকিটা সময় চলে অন্য পেশায়। কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন, কেউ দিনমজুর। পুজোই তাদের প্রধান ভরসা। সেই কয়েক দিনের আনন্দেই চোখে ঝলক আসে। কালো রুইদাস হেসে বলেন— “কটা টাকা রোজগার হয়, ঠিকই। কিন্তু ঢাক বাজানো মানেই আনন্দ, মানেই মা আসছেন। সেটার স্বাদ কোনও প্লাস্টিক কাঠি নষ্ট করতে পারে না।”
তবু একথা বলতেই হয়, আসল বেতের কাঠির সুর যেন একটু গভীর, একেবারে বুকের ভেতর আঘাত করে। প্লাস্টিক কাঠিতে সুর ওঠে বটে, কিন্তু অনেক ঢাকির মতে, তাতে প্রাণের কাঁপনটা কিছুটা কম। শ্রোতার কান হয়তো পার্থক্য টের পায় না, কিন্তু বাজনেওয়ালার হাত চেনে।
তবে বাস্তবের হিসেব অন্য কথা বলে। খরচ কম, সহজে পাওয়া যায়, টেকে অনেকদিন, এসব দিক থেকেই প্লাস্টিক কাঠি ঢাকিদের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠছে। মুর্শিদাবাদ থেকে নদিয়া, কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ— সবখানেই এ বছর প্লাস্টিক কাঠির বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। বাদ্যযন্ত্রের দোকানিরাও খোলাখুলি বলছেন, আগের মতো বেতের কাঠির চাহিদা আর নেই।
আশার কথা এটাই, এই কাঠির বদল এখনও ঢাকের মাহাত্ম্যকে ছুঁতে পারেনি। তাই পুজোর চারদিন জুড়ে মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে ছুটে বেড়ানো ঢাকিদের হাতে কাঠি উঠলেই গর্জে ওঠে উৎসবের প্রাণ। আরতির ধুনো-ধোঁয়ায় মিশে যায় ঢাকের ছন্দ, সিঁদুরখেলায় কান পাতলেই শোনা যায় ঢাকের ডাক, বিজয়ার শোভাযাত্রায় চোখ ভিজে আসে সেই ঢাকেরই করুণ বোলে।
কাঠি বদলেছে, উপকরণ বদলেছে, বাজার বদলেছে। কিন্তু ঢাকের প্রথম আঘাত এখনও জানিয়ে দেয়, “মা আসছেন।” আর যতদিন বাঙালি পুজো করবে, ততদিন সেই আওয়াজ বাঙালির রক্তে ছন্দ তুলবে। প্লাস্টিক হোক বা বাঁশ, ঢাকই বাংলার প্রাণের সুর।