Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কাস্কি, ক্যান্ডেললাইট ডিনার আর পরিবার, বিয়ের জন্মদিনে কোন স্মৃতিতে ভাসলেন আলিয়া? পরপর দু’বার ছাঁটাই! চাকরি হারিয়ে 'বিহারি রোল' বানানো শুরু, এখন মাসে আয় ১.৩ কোটিনববর্ষে সস্তায় পেটপুরে খাওয়া! দুই বাংলার মহাভোজ একই থালিতে, হলিডে ইন-এ শুরু হচ্ছে ‘বৈশাখী মিলনমেলা’কষা মাংস থেকে কাটলেট! নববর্ষে তাজের সমস্ত হোটেলে জিভে জল আনা ভোজ, রইল সুলুকসন্ধানপিএসএল ছেড়ে আইপিএলে আসার কড়া মাশুল! ২ বছরের জন্য সাসপেন্ড কেকেআরের এই পেসার রণবীর-দীপিকার ৮ বছরের দাম্পত্যে বিচ্ছেদ! স্বামীর সঙ্গে বাড়তে থাকা দূরত্বই কি ডিভোর্সের কারণ?'বিজেপির কথায় চললে আমাদের কাছেও তালিকা থাকবে', পুলিশ কর্তাদের চরম হুঁশিয়ারি ব্রাত্য বসুর!একসময় নীতীশকেই কুর্সি থেকে সরানোর শপথ নিয়েছিলেন! তাঁর ছেড়ে যাওয়া পদেই বসলেন শকুনি-পুত্র‘একজনকে ধরলে হাজার জন বেরোবে...’, আইপ্যাক ডিরেক্টর গ্রেফতারের পরই নাম না করে হুঁশিয়ারি মমতার

‘মা কালী মিট শপে’র লম্বা লাইন বনাম ‘মোকাম্বো’র প্যাঁচালো কিউ: বাঙালির পুজো-রসনার পালাবদল

নবমীর মাহাত্ম্য নিয়ে পুরাণ-পঞ্জিকায় যা কিছু লেখা থাক না কেন, বাঙালি সর্বসুখ খোঁজে ‘নিরামিষ মাংসে’। যার আধ্যাত্মিক প্রতিশব্দ ‘প্রসাদ’। 

‘মা কালী মিট শপে’র লম্বা লাইন বনাম ‘মোকাম্বো’র প্যাঁচালো কিউ: বাঙালির পুজো-রসনার পালাবদল

ছবি: এআই নির্মিত

রূপক মিশ্র

শেষ আপডেট: 26 September 2025 15:56

রূপক মিশ্র 

পাঁঠার মাংস যে-যুগে নির্ভেজাল ‘পাঁঠার মাংস’ই ছিল, বিলিতি ‘মটনে’র অপভ্রংশে জাতিচ্যুত, কুলভ্রষ্ট হয়নি, সেই আমলে একটি উৎকৃষ্ট ও উপাদেয় ছোটগল্প লেখেন ‘পরশুরাম’ রাজশেখর বসু। গল্পের নাম ‘লম্বকর্ণ’। বিষয়বস্তু বাঙালি পরিবারের অন্দরমহল, ঘরকন্নার যোগবিয়োগ, দাম্পত্যের মিলন-বিরহ। যদিও আর সবাইকে ছাপিয়ে আখ্যানের লাইমলাইট কেড়ে নেয় একটি ‘হৃষ্টপুষ্ট ছাগল’... ‘কুচকুচে কালো নধর দেহ, বড় বড় লটপটে কানের উপর কচি পটলের মত দুটি শিং বাহির হইয়াছে। বয়স বেশী নয়, এখনও অজাতশ্মশ্রু।’

Durgapuja 2025

<strong>অলঙ্করণে শিল্পী যতীন্দ্রকুমার সেন।</strong>

আপাতনিরীহ প্রাণীটি আপাতদৃষ্টিতে নিস্তরঙ্গ পরিবারে ঢুকে থিতিয়ে যাওয়া স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ঝাঁকিয়ে দেয়। এই রহস্য গল্পের শেষে উন্মোচিত হলেও ‘অজাতশ্মশ্রু’ ও ‘অজাতশত্রু’ লম্বকর্ণকে দেখামাত্র বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় আসা আড্ডাধারীদের প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন ছিল, তা কাহিনির গোড়ায় বলা হয়েছে। আমাদের লেখার প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ভেবে কিছু প্রাসঙ্গিক অংশ দীর্ঘ হলেও উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না:

‘বংশলোচন ছাগল লইয়া ফিরিলেন। বিনোদবাবু বলিলেন—‘বাহবা, বেশ পাঁঠাটি তো। কত দিয়ে কিনলে হে?’

বংশলোচন সমস্ত ঘটনা বিবৃত করিলেন। বিনোদ বলিলেন—‘বেওয়ারিস মাল, বেশী দিন ঘরে না রাখাই ভাল। সাবাড় করে ফেল—কাল রবিবার আছে, লাগিয়ে দাও।’

চাটুজ্যে মশাই ছাগলের পেট টিপিয়া বলিলেন—‘দিব্বি পুরুষ্টু পাঁঠা। খাসা কালিয়া হবে।’

Durgapuja 2025

<strong>অলঙ্করণ: যতীন সেন&nbsp;</strong>

নগেন ছাগলের উরু টিপিয়া বলিল—‘উহুঁ হাঁড়িকাবাব। একটু বেশী করে আদা—বাটা আর প্যাঁজ।’

উদয় বলিল— ‘ওঃ, আমার বউ অ্যায়সা গুলি কাবাব করতে জানে!’

নগেন ভ্রূকুটি করিয়া বলিল—‘উদো, আবার?’

বংশলোচন বিরক্ত হইয়া বলিলেন—‘তোমাদের কি জন্তু দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে? একটা নিরীহ অনাথ প্রাণী আশ্রয় নিয়েছে, তা কেবল কালিয়া আর কাবাব!’

ছাগলের সংবাদ শুনিয়া বংশলোচনের সপ্তমবর্ষীয়া কন্যা টেঁপী এবং সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ঘেণ্টু ছুটিয়া আসিল। ঘেণ্টু বলিল—‘ও বাবা, আমি পাঁঠা খাব। পাঁঠার ম—ম—ম—’

বংশলোচন বলিলেন—‘যাঃ যাঃ, শুনে শুনে কেবল খাই খাই শিখছেন।’

ঘেণ্টু হাত—পা ছুড়িয়া বলিল— ‘হ্যাঁ আমি ম—ম—ম—মেটুলি খাব।’

Durgapuja 2025

<strong>গল্পের উপসংহার&nbsp;</strong>

রাজশেখর বসু অতিরঞ্জিত করেননি। বঙ্গজ জনতার পাঁঠাপ্রীতি আজও এতটাই রসনাসিক্ত, তদুপরি রিপুতাড়িত৷ সকালের আড় ভাঙার আগেই ‘মা কালী মিট শপে’র বাইরে দাঁড়াতে মধ্যবিত্ত বাঙালির দরকার দুটো জিনিস। এক, পকেটে রেস্তো। দুই, মগজে ছুতো। এই দুইয়ের মণিকাঞ্চন মানে সোনায় সোহাগা! মাসের শুরু, রবিবার, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই সুসিদ্ধ মাংসের প্রমাণ সাইজের পিস টগবগে ঝোল, তৎসহ মখমলে নরম আলু যোগে থালাভর্তি ধূমায়িত ভাতে পড়ার অপেক্ষা!

দুর্গাপুজো এই ছুতো খোঁজার প্রশস্ত অবসর। নবমীর মাহাত্ম্য নিয়ে পুরাণ-পঞ্জিকায় যা কিছু লেখা থাক না কেন, বাঙালি সর্বসুখ খোঁজে ‘নিরামিষ মাংসে’। যার আধ্যাত্মিক প্রতিশব্দ ‘প্রসাদ’। বলিকৃত ছাগকে বিনা রসুন-পেঁয়াজে এমন করে রাঁধা, যাতে তার বোঁটকা গন্ধটুকু উবে গিয়ে মশলাদার মাংসল খুশবাইটুকু জেগে থাকে—এ কাজ সাধারণের কম্ম নয়। এটা আর্ট। শিল্প। সকলে শিল্পী নন। তা ছাড়া বলির ‘প্রসাদ'-ও ক'জনের পাকশালায় ঢোকে? তাই দুঃখ ভুলে, ছুতো খুঁজে সেই ‘আদি অকৃত্রিম ‘মা কালী মিট শপে’র শরণাপন্ন হওয়া!

Durgapuja 2025

<strong>মাংস-ভাতেই বাঙালির সর্বসুখ!</strong>

একথা সত্যি, যে ২০২৫-এর কলকাতা আর পরশুরামের ‘লম্বকর্ণে'র কলকাতা এক নয়। মাংসের দোকানের বাইরে সাতসকালের ‘লাইন’ আজও অদৃশ্য না হলেও তার সমান্তরালে ক্রমশ ডালপালা মেলেছে রেস্তোরাঁর ‘কিউ’! যে সংস্কৃতি বিগত কয়েক বছরে ‘ফুড ভ্লগিং’ নামক মঞ্চকে হাতিয়ার করে ফুলেফেঁপে উঠেছে! সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরের ফুড সার্ভিস খাতের বাজারমূল্য ৮ হাজার ৫৫ কোটি টাকা, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে ১০ হাজার কোটির গণ্ডি পেরোবে বলে অনুমান। বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে এই খাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু ফাইন ডাইনিং নয়, ক্যাফে, ফুড কোর্ট, কুইক-সার্ভিস রেস্তোরাঁ আর ক্লাউড কিচেন চিরচেনা অভ্যাস দিয়েছে পালটে।

দুর্গাপুজোকে ঘিরে এই পরিবর্তনের প্রবণতা সবচেয়ে প্রকট। পুজোর আগে-পরে শহরের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় ৯০ শতাংশেরও বেশি আসন বুক করা থাকে। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ থেকে পার্ক স্ট্রিট, সল্ট লেক থেকে নিউটাউন—সর্বত্র একই ছবি। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত অষ্টপ্রহর সুদীর্ঘ বিসর্পিল লাইন। শুধু তাই নয়, অনলাইন অর্ডারও রেকর্ডছোঁয়া। ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলো পুজোর সপ্তাহে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্ডার পাচ্ছে। অর্থাৎ, সহজ বাংলায়: নবমীর সকালে মাংসের দোকানে লাইন দেওয়ার বদলে প্যান্ডেল হপিংয়ের ফাঁকে রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়াই ইদানীং সময়ের চালু দস্তুর।

Durgapuja 2025

<strong>'লাইনেই ছিলাম বাবা...'</strong>

এতটুকু লিখে থেমে গেলে অর্ধসত্য বলা হয়। কারণ, বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির ইতিহাসও জানাচ্ছে: ‘পুজোর ভোগ’ কখনও নির্দিষ্ট, অনড় কিছু ছিল না। ফলে ‘সব বদলাল, সংস্কৃতি রসাতলে গেল’ বলে কাঁদুনি গাওয়াটা বোকামো। সপ্তমীর নবান্ন থেকে অষ্টমীর পশুবলি, নবমীর নিরামিষ মাংস বা দশমীর মাছভোগ—সবই সময়ের সঙ্গে বদলেছে। পূর্ববঙ্গের ‘বাঙাল’ পরিবারের দশমীর ইলিশ ভোগ যেমন চির-অমলিন ঐতিহ্য, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের বনেদি বাড়ির নিরামিষ মাংসও স্বধর্মে স্থির। শীতল ভোগ—জলভেজা ভাত আর পদ্মডাঁটার চাটনি—এক সময় ছিল গ্রামীণ বাঙালির বিজয়াদশমীর অভিজ্ঞান। আজ এই প্রথা, রেওয়াজ সবই পুথির পাতায় মুখ লুকিয়েছে।

ঐতিহ্যের এই স্তরগুলিকে যদি বর্তমানের পরিবর্তনের সঙ্গে মেলানো যায়, তবে বোঝা যাবে পালাবদলের আসল রহস্য! একদিকে বনেদি বাড়ির আঙিনায় আজও বলির মাংস বিনা পেঁয়াজ-রসুনে রাঁধা হচ্ছে, অন্যদিকে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবার পুজোর দিন সুশি-পাস্তা-বিরিয়ানি-বার্গারকেই উৎসবের খাবার হিসেবে বেছে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, গ্লোবালাইজেশনের বাজারে আজকের বাঙালি অনেক বেশি ‘ফুড এক্সপেরিমেন্টে’ অভ্যস্ত। প্রজন্মান্তরে খাওয়ার অভ্যাসেই তৈরি হচ্ছে দ্বন্দ্ব। ঠাকুমা এখনও নবমীর ঝোল-মাংসেই শান্তি খুঁজছেন। অন্যদিকে নাতিরা ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করছে।

Durgapuja 2025

<strong>কলকাতার জনপ্রিয় রেস্তরাঁ (সূত্র: ইন্টারনেট)&nbsp;</strong>

অর্থনীতির সঙ্গেও এই পালাবদলের সম্পর্ক গভীর। পুজোর সময়ে বাইরে খাওয়ার বাজারে রেস্তোরাঁয় বিক্রিবৃদ্ধি ২৫ শতাংশের উপরে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২২–২৩ সালে তা চড়েছে। ২০২৫-তে তা ঊর্ধ্বমুখী হবে, বলাই বাহুল্য। এই প্রবণতার তালে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান, খরচের ধরন, এমনকি সামাজিক আড্ডার চরিত্রও বদলাচ্ছে।

তাহলে কি বলা যায়, বাঙালির ‘পুজো-প্যালেট’ পাল্টে গেছে? উত্তরটা আংশিক হ্যাঁ, আংশিক না। পুরনো রীতি—মাংসের দোকানের ভিড়, ঘরোয়া রান্না—অদৃশ্য হয়নি। কিন্তু তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নতুন রুচি, নতুন রীতি—রেস্তোরাঁর ভিড়, আন্তর্জাতিক কুইজিন, ফুড ডেলিভারির সুবিধা। দুর্গাপুজো আজ বাঙালির কাছে শুধু দেবীর আরাধনা নয়, সামাজিক উৎসব, আড্ডা, শপিং, আর রসনার পরিপূর্ণ তৃপ্তি। আর এই তৃপ্তির ছবিতে যতটা মাংসের ঝোলের সুবাস, ততটাই গ্লোবাল কুইজিনের এক্সপেরিয়েন্স!  যে কারণে, ‘নবমীর মাংসের দোকানের লাইন’ ও ‘রেস্তোরাঁর কিউ’—দুটোই এখনকার বাস্তব। যার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাঙালির পুজো-রসনার নতুন পরিসর।


```