পালকিতে চেপে ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা গঙ্গার ঘাটে যেতেন, বাকিরা যেতেন হেঁটে। যন্ত্রী, ঢাক, বাদ্যের সঙ্গে হতো সেই শোভাযাত্রা। বিসর্জনের রাতে ঠাকুরবাড়িতে বসত গানের আসর।

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর আঁকা 'প্রতিমা বিসর্জন'
শেষ আপডেট: 2 October 2025 16:18
উপরের চিত্রকর্মটির নাম ‘প্রতিমা বিসর্জন’ (DURGAPUJA 2025)। ১৯১৫ সালে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Gaganendranath Tagore) আঁকা এই জলরঙের ছবি যেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির (Jorasanko) সেই হারানো দুর্গাপুজোরই (Bijaya Dashami) এক কল্পরূপ। বাস্তবের রং কেমন অদ্ভুতভাবে কল্পনার ক্যানভাসে মিশে যেতে পারে, তারই সাক্ষী এই শিল্পকর্ম।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জোড়াসাঁকোর দুর্গাপুজো স্বচক্ষে কখনও দেখেননি গগনেন্দ্রনাথ। এমনকি রবীন্দ্রনাথও (Rabindranath Tagore) নন। কারণ, ১৮৬১ সালে কবির জন্মের সেই বছরেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণের পর বন্ধ হয়ে যায় দুর্গাপুজো।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেছিলেন নীলমণি ঠাকুর ১৭৮৪ সালে। তবে এই পুজো সর্বাধিক ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলে। রাজকীয় আভিজাত্য, বিদেশি অতিথি, বেনারসি শাড়ি, সোনার মুকুট, স্বর্ণালঙ্কার, ৫১ রকম ভোগ, সব মিলিয়ে জোড়াসাঁকোর দুর্গোৎসব ছিল কলকাতার অন্যতম রাজসিক পুজো।

প্রতিমা গঙ্গার পাড়ের মাটি দিয়ে তৈরি হত। মহালয়ার দিনে দ্বারকানাথ আকাশে ছেড়ে দিতেন শঙ্খচিল, বিশ্বাস ছিল এই পাখিই দেবীকে নিয়ে আসবে। দেবীর ভোগ সাজানো হত সোনার থালা-বাটিতে। বলির জায়গায় থাকত কুমড়ো। আর প্রতিদিনের আরতি শুরু হতো রুপোর প্রদীপদানিতে এক হাজার একটি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে।
প্রতিমার গায়ে স্বর্ণালঙ্কার পরানোর রীতি জোড়াসাঁকো শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি থেকেই আসে। টক্কর দিতে ফ্রান্স থেকে বিশেষ গয়না আনান দ্বারকানাথ। বিসর্জনের সময় সেই গয়না খুলে নেওয়ার নিয়ম ভেঙে দেন তিনি— নির্দেশ দেন, দেবীর সঙ্গে গয়নাও বিসর্জন হবে। ফলে বিসর্জনের পর গঙ্গার ধারে ভিড় জমাতেন বহু মানুষ, প্রতিমা থেকে গয়নাগাটি সংগ্রহ করার আশায়।
পালকিতে চেপে ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা গঙ্গার ঘাটে যেতেন, বাকিরা যেতেন হেঁটে। যন্ত্রী, ঢাক, বাদ্যের সঙ্গে হতো সেই শোভাযাত্রা। বিসর্জনের রাতে ঠাকুরবাড়িতে বসত গানের আসর। বাইজি, ওস্তাদদের সুরে মেতে উঠত গোটা বাড়ি। যাত্রাও মঞ্চস্থ হত পুজোর দিনগুলিতে।
এই সবই থেমে যায় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে। নিরাকার ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী তিনি মূর্তিপুজোকে মানেননি। ধীরে ধীরে ঠাকুরবাড়ির ভেতরে ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৮৬১ সালে শেষ হয় জোড়াসাঁকোর দুর্গাপুজো।
কিন্তু ঐতিহ্যের রেশ থেকে গিয়েছিল। দেবেন্দ্রনাথ নিজে পুজোয় অংশ নিতেন না, পাহাড়ে চলে যেতেন। অথচ তাঁরই আত্মজীবনীতে ফুটে উঠেছে শৈশবের সেই স্মৃতি, ‘‘বিদ্যালয়ে পরীক্ষার আগে সিদ্ধেশ্বরীর কাছে প্রার্থনা করতাম, ঈশ্বরই শালগ্রাম, ঈশ্বরই দুর্গা, ঈশ্বরই সিদ্ধেশ্বরী।”
দুর্গাপুজো বন্ধ হলেও তার ছায়া ঠাকুরবাড়ির উত্তরসূরিদের জীবনযাপনে রয়ে গিয়েছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ষষ্ঠী থেকেই আত্মীয়-বন্ধুদের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে যেতেন। আর গগনেন্দ্রনাথ আঁকলেন সেই কল্পিত বিসর্জন— যা আজও আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক রাজসিক ঐতিহ্যের স্মৃতির কাছে।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ‘প্রতিমা বিসর্জন’ ছবিতে ধরা আছে কলকাতার রাতের মায়াবী আবহ। ছবির বাঁ দিকে বিসর্জনের শোভাযাত্রার আগে জ্বলছে মশাল, আলোকিত উত্তর কলকাতার রাস্তা। প্রকাণ্ড প্রতিমার সামনে ভিড় জমিয়েছে মানুষজন। দেবীর বরণ চলছে মহা ধুমধামে। সেই আলোই ছড়িয়ে পড়েছে ছবির অর্ধেক জুড়ে, বাকিটা রয়ে গেছে রহস্যময় আবছা অন্ধকারে। কোথাও হালকা আলো এসে পড়েছে রাস্তার ধারের দোতলা-বাড়িগুলির জানালায়। আর একটিতে দেখা যাচ্ছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্তঃপুরের মহিলারা— দূর থেকে চেয়ে দেখছেন দেবীর বরণ।

এই একটি ছবিই নয়, গগন ঠাকুর আরও একটি জলরঙে এঁকেছিলেন বিসর্জনের দৃশ্য— সেখানে দেবীকে দেখা যায় জোড়া নৌকায় ভেসে যেতে।
গগনের শিল্পসত্তা ছিল শহরনির্ভর। তিনি ছিলেন অন্তরে সমাজমুখী, প্রকৃত শহুরে শিল্পী। সন্ধ্যা নামলে কোনও ছাদের কার্নিশে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি আকাশ দেখতেন, রেখা কাটতেন। তাই তাঁর ছবিতে কলকাতা ফুটে উঠত নিখুঁত ভাবে। বাজারের ভিড়, আলোকিত পথ, কিংবা ঠাকুর বিসর্জনের দৃশ্য, সবই হয়ে উঠত চেনা অথচ নতুন।
দুর্গা বিসর্জনের ছবিটিতে যেমন বোঝা যায় এ কলকাতারই রাস্তা। আরও স্পষ্ট করে বললে, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। যাঁরা শহরটিকে অন্তর দিয়ে চেনেন, তাঁদের কাছে এই স্বীকৃতি অনিবার্য।