শিবের আপন ঘর কাশীতে ২৬০ বছর ঘরণীর দায়িত্ব সামলে চলেছেন দুর্গা। যেখানে আবাহন হয়, বোধন হয়, সন্ধিপুজো হয়, বিজয়া দশমীর সিঁদুরখেলা হয়, ঘট বিসর্জন হয়। কিন্তু, প্রতিমার নিরঞ্জন নেই।

শিবের কাশী ছেড়ে স্বপ্নাদেশে খোদ দুর্গার কৈলাসে যাওয়ার আপত্তি।
শেষ আপডেট: 28 September 2025 10:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘শিবের ঘরে এসে আমি সুখেই আছি। এখান থেকে আমাকে সরাস না। আমাকে সারা জীবন এই কাশীতেই কাশীবাসীর সঙ্গে থাকতে দে।‘ সেই থেকে শিবের আপন ঘর কাশীতে ২৬০ বছর ঘরণীর দায়িত্ব সামলে চলেছেন দুর্গা। যেখানে আবাহন হয়, বোধন হয়, সন্ধিপুজো হয়, বিজয়া দশমীর সিঁদুরখেলা হয়, ঘট বিসর্জন হয়। কিন্তু, প্রতিমার নিরঞ্জন নেই। পারিবারিক প্রথা মেনে ২৬০ বছর ধরে একই একচালার মূর্তিতে পুজো চলে আসছে। কারণ, শিবের কাশী ছেড়ে স্বপ্নাদেশে খোদ দুর্গার কৈলাসে যাওয়ার আপত্তি।
এই প্রথার পিছনে এক বিরাট অত্যাশ্চর্য কাহিনি। ইতিহাসের নানান টানাপড়েন। কিছু গল্প, কিছু সত্যির এক রঙিন মিশেল। শারদীয়া দুর্গাপুজোর শেষদিন। সাল ১৭৬৭। পলাশির যুদ্ধের ১০ বছরের মাথায়। বাঙালিটোলার মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির ছোট একচালার দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনে যাবে। লোকলস্কর মিলে অনেক টানাটানি করেও সেই দুর্গা নড়াতে পারল না। কোনও বার তো এরকম হয় না। অবশেষে ডাক পড়ল মদনপুরা যাদব গোয়ালাদের।
লোক গিয়ে খবর দিল, দুর্গাকে নড়ানো যাচ্ছে না। কয়েকজনকে চাই। তাই শুনে জনা ১৫ মোটাসোটা পেশিবহুল গোয়ালা এসে হাজির বাবুর বাড়িতে। বড় বড় মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা হল প্রতিমাকে। একদিকে গোয়ালারা অন্যদিকে বাড়ির যুবকরা জয় দুর্গা মাইকি বলে হাঁক পাড়ল। কিন্তু, দুর্গা নড়লেন না। বহু চেষ্টার পড়েও সকলে যখন ঘেমেনেয়ে ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে পড়েছে। দিনের আলোয় ফুরিয়ে এসেছে। নেমে আসছে অন্ধকার। এই অবস্থায় কত্তামশাই ঠিক করলেন, আজ থাক এই পর্যন্ত। কাল দেখা যাবে।
কিন্তু, দুর্গার মনে মনে ছিল অন্য বুদ্ধি। রাতে বড় কর্তামশাই কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নে দেখা দিলেন। যুদ্ধং দেহী রূপে নয়, বরং বাড়ির মেয়ের রূপে। কালীপ্রসন্নকে তিনি বলেন, আমায় এখানেই থাকতে দে। চিরকালের মতো আমি শিবঠাকুরের কাছে কাশীবাসী হয়ে থাকতে চাই। সেই থেকে দুর্গার নিরঞ্জন বন্ধ হল। কথিত যে, ২৬০ বছর ধরে সেই একই প্রতিমা বছর বছর পূজিত হয়ে আসছে। এ বছরেও হচ্ছে।
১৭৬৭ সাল থেকে চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে একচালার এই দুর্গাপ্রতিমার উচ্চতা মাত্র ৬ ফুট। সাধারণ মৃন্ময়ী রূপ। আজও বারাণসীর পুরনো দুর্গাবাটীতে প্রতিবছর পুজোর সময় পরিবার ও গোটা তল্লাটের লোক এসে হাজির হন ঐতিহাসিক দুর্গা দেখতে। বাংলা ছবির অনেক দিকপালরাও এই পুজো দেখতে আসেন। ইংরেজি সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালকে মুখোপাধ্যায় পরিবারের সদস্য ৪২ বছরের ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায় বলেন, বিজয়া দশমীতে বেশিরভাগ দুর্গাপ্রতিমারই বিসর্জন হয়ে যায়। আমাদের মা দুর্গা আমাদের সঙ্গেই থেকে যান। শুধু পুজোর দিনগুলিতেই নয়। প্রতিদিন নিয়ম করে এই দুর্গা প্রতিমার পুজো, আরতি ও ভোগ হয়।
এএসআই-রেজিস্টার্ড আড়াই শতাব্দী প্রাচীন এই দুর্গাবাটীতে রয়েছে একাদশ শতকের গ্র্যানাইটের একটি বিষ্ণু মূর্তি, সম্ভবত যা পাল আমলের। এছাড়াও রয়েছে, ২২টি শিবলিঙ্গ। যেগুলি মাটির তলা থেকে ভিত তৈরির সময় মিলেছে। কারণ, এই পরিবারের বসত একসময় বারাণসীতে ছিল না। যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার জনাই রোড এলাকা।
মুখোপাধ্যায় পরিবারের শিকড় রয়েছে হুগলিতে। পারিবারিক ঝামেলায় সম্পত্তি বঞ্চিত হয়ে কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় তাঁর পরিবার নিয়ে কাশীবাসী হয়ে যান। কাশী ছিল তখনকার দিনে বাঙালির দ্বিতীয় ঘরবাড়ি। এই শহরকে একসময় ছোটখাট কলকাতা বলা হতো। এখানে বসতি পত্তনের কয়েক বছর পরেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। পরিবারের দাবি, এই পুজোটাই বেনারসের আদি দুর্গাপুজো। ইন্দ্রনীল বলেন, দুর্গাপ্রতিমার মুখটি যদি খুব ভালভাবে খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন একটি কিশোরী মেয়েটি যেন। অন্যদের তুলনায় একেবারে আলাদা।
ফিরে যাওয়া যাক ১৭৬৭ সালে। পুজোবিধি সব শেষ। মেয়েদের সিঁদুরখেলাও শেষ। দুর্গা এবার যাবেন পান্ডে ঘাটে বজরায় চেপে বিসর্জনে। কিন্তু, বাড়ির হাট্টাকাট্টা যুবকরা কেউ গাড়িতে তুলতে পারছে না দুর্গাকে। ডাক পড়ল গোয়ালাপট্টির ষন্ডাগুন্ডা মার্কা লোকদের। কিন্তু কিছুতেই নড়ছে না প্রতিমা। ইন্দ্রনীলের মা ৭০ বর্ষীয়া সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বলেন, এটা কোনও গল্পকথা নয়। দুর্গা স্বয়ং স্বপ্নে এসে বলেছিলেন এখানেই থাকতে চান।
পরদিন সকালে কালীপ্রসন্ন সকলকে স্বপ্নের কথা জানিয়ে নির্দেশ দেন যে, বিসর্জন হবে না। তারপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে কত জল, কিন্তু সেই থেকে এই ঐতিহ্য চলে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতি তিন-চার বছর অন্তর এই দুর্গার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রংয়ের প্রলেপ লাগানো হয়। প্রতিদিন পুজো ছাড়াও পুজোর সময় বিশেষ ভোগের ব্যবস্থা হলেও আগের মতো ১৫১ ভোগ এখন অতীত। এতকিছুর মধ্যেও আসছে বছর আবার হবে-র পরেও কাশীতে স্বামীর ঘরেই থেকে যান উমা। এখনও বড় কত্তা মা দুর্গার কানে কানে গিয়ে বলেন, আবার এসো মা।