ইতিহাস বলছে, প্রায় ৬০ হাজার নারী সেই সময় এই অপবাদ মাথায় নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ বা এমন কেউ যাঁদের আয়ুর্বেদিক ওষুধের জ্ঞান রয়েছে।

ফাইল ছবি (এআই নির্মিত)
শেষ আপডেট: 30 October 2025 16:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হ্যালোইন (Halloween) মানেই মজা, 'ভুতুড়ে' সাজ আর একটু ভয় মেশানো রহস্য! প্রতি বছর অক্টোবরের শেষে পশ্চিমে এই উৎসব পালিত হয় ভূতের সাজে, কুমড়ো-আলো, আর নানা রঙের পোশাকে। কেউ ডাইনির মতো সেজে, কেউ আবার ঘর সাজায় ভয়ংকর আলোকসজ্জায়। কিন্তু জানেন কি, এই মজার উৎসবের পেছনে লুকিয়ে আছে এক সময়ের ভয়, কুসংস্কার আর নারীদের ওপর অন্যায়ের ইতিহাস?
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর দিনটিকে 'হ্যালোইন' (Halloween) হিসেবে উদযাপন করা হয়। অনেক বছর আগে এটি ছিল 'সামহেইন' নামে ফসল কাটার উৎসব। যেখানে বিশ্বাস করা হত, এই রাতে মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসে। তবে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক নির্মম কাহিনি।
একসময় ইউরোপে ‘ডাইনি’ (witches) শব্দটা ছিল ভয় আর মৃত্যুর প্রতীক। তখন সমাজ ছিল কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসে ভরা। যেসব নারী অন্যদের থেকে একটু আলাদা চিন্তা করতেন, ভেষজ গাছপালা দিয়ে ওষুধ বানাতে জানতেন বা চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞান রাখতেন, তাঁদের অনেক সময়ই মানুষ ভুল বুঝত। কেউ অসুস্থ হলে বা খারাপ কিছু ঘটলে, সবাই ভাবত- এই নারীরাই নাকি তার কারণ, এরা নাকি শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
এই ভুল ধারণার কারণেই হাজার হাজার নির্দোষ নারীকে 'ডাইনি' বলে চিহ্নিত করে জনসমক্ষে নির্যাতন ও পুড়িয়ে মারা হত। আসলে সেই সময়ের মানুষরা বুঝতে পারেনি বা চাইতেন না, এই নারীরাই ছিলেন জ্ঞানী, সাহসী আর সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে।
১৫শ থেকে ১৭শ শতাব্দীর ইউরোপে ডাইনিবিদ্যা নিয়ে তৈরি হয় এক প্রবল আতঙ্ক। বিশ্বাস করা হত, কিছু নারী নাকি শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করে অদ্ভুত শক্তি অর্জন করে। এই ডাইনিরাই নাকি ফসল নষ্ট করে, বৃষ্টি নামায়, এমনকি কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারেন। এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে তখনকার সমাজে শুরু হয় তথাকথিত 'উইচ হান্ট'- ডাইনিদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা। অনেক মহিলাই শুধু কারও প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণেও ডাইনির অভিযোগে অভিযুক্ত হন।
সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল ইংল্যান্ড, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডের 'উইচ ট্রায়াল'। অভিযুক্ত মহিলাদের উপর চালানো হত নির্মম নির্যাতন- কখনও ডুবিয়ে মারা হত আবার কখনও জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলতেও দু'বার ভাবতেন না। ইতিহাস বলছে, প্রায় ৬০ হাজার নারী সেই সময় এই অপবাদ মাথায় নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ বা এমন কেউ যাঁদের আয়ুর্বেদিক ওষুধের জ্ঞান রয়েছে।
কুসংস্কার থেকে সংস্কৃতি
কালের পরিক্রমায় ডাইনিদের ভয়াবহ ছায়া মুছে গিয়ে তারা আজ হ্যালোইনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। টুপি, ঝাড়ু, কালো পোশাক- সবই এখন বিনোদনের অংশ। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্ধকার এক ইতিহাস, যেখানে নারীদের ভয় ও অজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছিল শুধুমাত্র 'অন্যদের থেকে আলাদা' হওয়ার কারণে।
আজ আমরা ডাইনিদের দেখি সিনেমা, বই আর হ্যালোইনের সাজে—ভয় নয়, মজার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু এই উৎসবের আনন্দের পিছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর বার্তা। এক সময় যাদের মানুষ ভয় পেত, আজ তারাই সাহস আর স্বাধীন চিন্তার প্রতীক। হ্যালোইন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভয়কে জয় করে মানুষ শিখেছে নিজের মতো ভাবতে এবং বাঁচতে।