শুধুই ভীম নাগের সন্দেশ নয়, মিষ্টিপ্রিয় ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ নিখুঁতিরও গুণমুগ্ধ ছিলেন। পশুপতি ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে ওঠে।

নিখুঁতি
শেষ আপডেট: 1 June 2025 18:38
গো-ভাগাড়। শান্তিপুরের একটি অঞ্চল। শ্রতিমধুর নাম না হলেও এখানেই ছিল স্বাদে মধুর এক মিষ্টির দোকান। মালিক ইন্দ্র ময়রা। ইন্দ্র অবিশ্যি নাম নয়, পদবি। সেই পরিবারের এক আদুরে একরত্তি কন্যে—রূপে নিখুঁত, গুণেও—সকলে ডাকতেন ‘নিখুঁতি’ বলে।
একদিন মেয়েকে দোকান পাহাড়ায় বসিয়ে বাবা গেলেন অন্য এক কাজে। পাশে রাখা ছানা। ছটফটে নিখুঁতির ভাল লাগছিল না চুপচাপ বসে থাকতে। নিরালা দুপুর তো হুটোপুটি করার জন্য। তখন এভাবে নিষ্কর্মার মতো একা থাকা যায়?
অনেক ভেবে সেই মুহূর্তে নিজের জন্য একটা খেলা আবিষ্কার করে ফেলল সে। কিন্তু হাতের কাছে তো খেলনাপাতি নেই। তাহলে উপায়? ভেবেচিন্তে পাশে রাখা ছানা মাখাকেই বেছে নিল নিখুঁতি। ঠিক যেভাবে দোকানে কাজ করা হালুইকরেরা গোল গোল, লম্বা লম্বা পিণ্ড তৈরি করে, সেভাবে মাখা ছানাকে পাকিয়ে পাকিয়ে কড়াইতে ফুটন্ত তেলে দিল ছেড়ে। কিন্তু বাচ্চা মেয়ে। তাই সেগুলি সময়মতো কায়দা করে হাতা দিয়ে আর তুলতে পারল না। বেশি ভাজা হয়ে যাওয়া ছানা খানিক বাদেই ‘রেগে লাল’! আর তাই দেখে নিখুঁতি তো ভয়ে জুবুথুবু। কিন্তু একটা হিল্লে যে না করলেই নয়। তাই কোনওমতে ম্যানেজ দিতে ভাজা ছানার পিণ্ডগুলি তুলে ডুবিয়ে দিল গামলা ভরা রসে। তারপর বাবাকে আসতে দেখেই একছুটে বাড়ি!

দোকানে এসে কাণ্ড দেখে তো ময়রার মাথায় হাত। এ কী করেছে মেয়ে! এত কষ্টে তৈরি ছানা এভাবে নষ্ট করে দিল! দুশ্চিন্তায় আর রাগে মুহূর্তে মাথা গরম। কিন্তু সিরায় চোবানো ছানাভাজা এভাবে তো ফেলে দেওয়া যায় না। তাই কাছের, পরিচিত খরিদ্দারদের কাছে বিক্রি করে দিলেন মেয়ের বানানো নতুন মিষ্টি। সবই নামেমাত্র দামে।
পরদিন অপেক্ষা করছিল বড়সড় চমক। ক্রেতাদের সক্কলে ইন্দ্র ময়রার কাছে বায়না নিয়ে হাজির। সবার একটাই দাবি: গতদিনের মিষ্টিটি আরও চাই। অতুলনীয় খেতে; সত্যি অপূর্ব তার স্বাদ। ‘কী নাম এর? আগে তো খাইনি কখনও!’—নাম-না-জানা মিষ্টির পরিচয় জানতে চান এক খরিদ্দার। আর কানে খাটো ময়রা ভাবেন, ওই ব্যক্তি হয়তো হালুইকরের নাম জিজ্ঞেস করছেন। তাই সত্যিকারের কারিগর যে, তার মেয়ে, সেই নিখুঁতির গুণপনার কথাই ওই মুহূর্তে সোচ্চারে ঘোষণা করেন তিনি। আর কিছুদিনের মধ্যে ‘নয়া মিষ্টি’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে নাম। নদিয়ার শান্তিপুর থেকে সারা বাংলায়। জন্ম নেয় একদম নয়া কিসিমের একটি মিষ্টান্ন—‘নিখুঁতি’।

ঘটনাটা ১৮৫৬ সালের আশপাশের কোনও একটা সময়ের। ইন্দ্র ময়রার পরিবার কালের নিয়মে নিজেদের পেশা ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু শান্তিপুরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গেছে নিখুঁতির গৌরব।
মহিমা বাংলা-জোড়া। যদিও এর প্রস্তুতির কৌশল কিন্তু সরল, উপকরণও আহামরি কিছুই নয়। ছানা, ময়দা, ঘি-ই প্রধান বস্তু। প্রথমে ছানার সঙ্গে মেশাতে হয় ময়দা। ১ কেজির অনুপাতে ২০০ গ্রাম হিসেব করে। এই মিশ্রণকে গুলে তৈরি হয় খামি। তারপর সেই খামিকে ফুটো করা হাতার উপর ফেলে টিপে টিপে কড়াইয়ে ফুটন্ত ঘিয়ে ফেলার পালা। ঘিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভাজার পর রং লাল হয়ে গেলে হালুইকর তা হাতা দিয়ে তুলে সিরায় চুবিয়ে দেন। তারপর রস থেকে তুলে পরিবেশন। শুধু হাতে তুলে দেওয়া আগে মিষ্টান্নের গায়ে দু-এক চিমটে গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া। ব্যাস! ছোট্ট এই কাজেই বদলে যায় স্বাদ আর সুবাস।

শান্তিপুরের একাধিক দোকানে বারকোশ ভরা নিখুঁতির সম্ভার সাজানো। তবে সেই তালিকায় একদম উপরের সারিতে থাকবে ‘পশুপতি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। ১৯০৩ সালে স্থাপিত। ঠিকানা: কশ্যপপাড়ার গোস্বামী বাড়ির একদম কাছে। প্রায় ১২২ বছর ধরে সাবেকি ধারা মেনে নিখুঁতি তৈরি করে যাচ্ছেন মালিক পশুপতি ইন্দ্রের বংশধরেরা। বাইরে থেকে তেমন জাঁক নজরে আসবে না। কিন্তু ইতিহাসের একটা মৃদু স্পন্দন দোকানের অঙ্গসজ্জা, মিষ্টান্ন প্রস্তুতির তারিকায় অনুভব করা যায়।
নিখুঁতি দেখতে অনেকটা ল্যাংচার মতো লম্বাটে। আকারে, প্রকারেও। কিন্তু স্বাদে ফারাক রয়েছে। শীতকালে আবার এর এক নতুন ধরনও বাজারে আসে। যদিও সেটা লম্বাকৃতি নয়, গোলাকার। আর ময়দা-মেশানো ছানার পাশাপাশি হালুইকরেরা তখন এলাচ, গোলমরিচও ব্যবহার করে থাকেন। নাম ‘বাঁধা নিখুঁতি’। দাম ৩২০ টাকা প্রতি কেজি। সাবেকি ‘লম্বা নিখুঁতি’ও আশপাশের দামেই বিক্রি হয়।
শুধুই ভীম নাগের সন্দেশ নয়, মিষ্টিপ্রিয় ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ নিখুঁতিরও গুণমুগ্ধ ছিলেন। পশুপতি ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে ওঠে। ছিল নিয়মিত যোগাযোগ। চিঠিপত্র চালাচালিও হত দুজনের মধ্যে। পশুপতিবাবুর দেরাজে দীর্ঘদিন ফাইলবন্দি হয়ে ছিল আশুতোষের পাঠানো চিঠি। কিন্তু ছয়ের দশকে মারা যাওয়ার আগে কোনও এক অজানা কারণে সমস্ত পত্র তিনি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। শুধু দুই ব্যক্তিত্বের সংযোগের সূত্রই তো নয়, এক আগুনে নিমেষে ভস্মীভূত হয়ে যায় বাংলার অমূল্য সাংস্কৃতিক দলিলও! একজন প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ব্যাবসায়ী ও প্রাতঃস্মরণীয় শিক্ষাবিদের কথালাপে সমৃদ্ধ চিঠিগুলি আজ গবেষকদের হাতে এলে, কে বলতে পারে, খুলে যেতে পারত বঙ্গভূমির সুপ্রাচীন মিষ্টান্ন সংস্কৃতির নতুন দিগন্ত।