Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

কামারপুকুরের ঐতিহ্য ‘সাদা বোঁদে’, পড়শির ভিয়েনের এই মিষ্টিতে মাতোয়ারা ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব

গবেষকদের দাবি, আঠারো শতকের শেষার্ধ থেকে এই বিশেষ মিষ্টির রমরমা শুরু। বানাতেন কামারপুকুরে হাতেগোনা ময়রা। যার মধ্যে অন্যতম মধুসূদন মোদক। 

কামারপুকুরের ঐতিহ্য ‘সাদা বোঁদে’, পড়শির ভিয়েনের এই মিষ্টিতে মাতোয়ারা ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস

শেষ আপডেট: 15 June 2025 13:18

রূপক মিশ্র 


বাংলার মিষ্টান্ন সংস্কৃতির দুয়ার আলো করে রেখেছে লোকশ্রুতি। আর এই জনপ্রিয় কিংবদন্তির অন্যতম বিষয়: হয় রাজা-বাদশা, সাহেব-জমিদার, নয়তো ধর্মগুরু, ধর্মগ্রন্থ। অমুক রাজাকে তুষ্ট করতে তমুক ময়রা বিশেষ মিষ্টি বানালেন এবং তারপর তা বঙ্গভূমের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছড়িয়ে গেল—এই গেল একটা দিক।

অন্যদিকে কোনও ধর্মপ্রচারক বা মনীষী নির্দিষ্ট কোনও মিঠাইয়ের অনুরক্ত ছিলেন এবং সেই সূত্রে তাঁর প্রচারকদের সুবাদে সেই মিষ্টর কদর সুসজ্জিত নৈবেদ্য আকারে চতুর্দিক সংক্রমিত হল।

‘বাংলার মিষ্টি-কথা'র বিগত পর্বগুলিতে ‘মোরব্বা’, ‘রামচাকি’, ‘মনোহরা’র উৎপত্তির ইতিহাসে আমরা এই দুই চালু ছক দেখেছি। আজ যে মিষ্টি নিয়ে আলোচনা করব, সেই ‘সাদা বোঁদে’র বিপুল সুখ্যাতির পেছনেও সেই একই ধারণার অনুসৃতি লক্ষ্য করা যায়। সাদা বোঁদেকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন যিনি, তাঁর নাম রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। বাংলার ভক্তি আন্দোলন ও ধর্মসংস্কৃতির যুগপুরুষ। পূর্বনাম গদাধর। গাদাধর চট্টোপাধ্যায়। ১৮৩৬ সালে হুগলি জেলার কামারপুকুরে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় ও চন্দ্রমণি দেবীর ঘর আলো করে জন্ম নেন আদরের গদাই।

রামকৃষ্ণদেব শ্রীচৈতন্যদেবের মতো কোনও গ্রন্থ লিখে যাননি। ‘রামকৃষ্ণকথামৃত’ নামে তাঁর রসসিক্ত উপদেশ ও কথনের অনুলিখন করেন শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত। সেখানেই ঠাকুরের জীবনের নানান ছোট-বড় কাহিনি, কিংবদন্তি কথাপ্রসঙ্গে উঠে এসেছে। বইটি পড়লে জানা যায়, দুটি মিষ্টি নিয়ে রামকৃষ্ণদেবের বিশেষ আসক্তি ছিল। একটি ছানার জিলিপি। অন্যটি সাদা বোঁদে। ছানার জিলিপি বাংলার আনাচেকানাচে সহজলভ্য হলেও সাদা বোঁদে শুধুমাত্র রামকৃষ্ণ ও সারদাদেবীর স্মৃতিধন্য কামারপুকুর ও জয়রামবাটীতেই মেলে।

গবেষকদের দাবি, আঠারো শতকের শেষার্ধ থেকে এই বিশেষ মিষ্টির রমরমা শুরু। বানাতেন কামারপুকুরে হাতেগোনা ময়রা। যার মধ্যে অন্যতম মধুসূদন মোদক। মধুসূদনের পুত্র দুর্গাদাস ছিলেন ঠাকুরের নিত্য সহচর৷ আবাল্য বন্ধুত্ব। সেই সুবাদে সাদা বোঁদে হামেশাই চেখে দেখার সুযোগ জুটত।

রামকৃষ্ণদেবের সূত্রেই সাদা বোঁদে নিয়ে বিশেষ প্রীতি জন্মায় সারদাদেবীর। দুর্গাদাসের ছেলে সত্যকিঙ্কর মোদকের (সত্য ময়রা) হাতে তৈরি শ্বেতশুভ্র, রসস্নাত বোঁদে ছিল তাঁর প্রিয় মিষ্টি।

কালের নিয়মে ঠাকুর, মার মর্ত্যদেহ পঞ্চভূতে লীন হলেও মুছে যায়নি সাদা বোঁদের রমরমা। বরং, তাঁদের ভাবানুষঙ্গে তা আরও বিস্তারিত হয়েছে। শতক গড়ালেও জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি।  

কামারপুকুরের ময়রাদের মতে, সাদা বোঁদের প্রধান উপকরণ দুটি: রমা কলাইয়ের বেসন ও আতপ চালের গুঁড়ো৷ সেই সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি গাওয়া ঘি ও চিনির রস। রমা কলাইয়ের নামান্তর রম্ভা কলাই। আসলে বরবটির বীজ৷ আগে কামারপুকুরের চাষিরা বরবটি চাষ করতেন। তাঁরাই প্রভূত পাকা বীজ বেছে ময়রাদের হাতে তুলে দিতেন। শুরু হত ঝাড়াই-বাছাই। তারপর রমা কলাই বা বড়বটির বীজকে জলে ধুয়ে রোদে শুকোনোর পালা। শুকিয়ে গেলে কলাইকে জাঁতায় পিষে তৈরি হত সাদা বেসন৷

আজকাল কামারপুকুরে বরবটির চাষ উঠে গেছে। এখন দোকানিরা কলকাতার বড়বাজার থেকে রমা কলাইয়ের সাদা বেসন কিনে আনেন। কেজি দরে, প্যাকেটে ভরে। আর আতপ চাল মেশিনের বদলে ঢেঁকিতে পিষে রাখা হয়। তাতে নাকি স্বাদ বাড়ে।

উপকরণ তৈরি হলে শুরু হয় মিশ্রণ। সাধারণত, একভাগ সাদা বেসনের সঙ্গে দু'ভাগ আতপ চালের গুঁড়ো মেশানো হয়। এরপর জলে ভিজিয়ে রাখার পালা। পরদিন কারিগররা সেই মিশ্রণকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফেটাতে থাকেন। তাতেই তৈরি হয় খামি। তারপর খামিকে ছানতায় রেখে ফোঁটা ফোঁটা আকারে কড়াইয়ে রাখা গরম ঘিয়ে ভাজার পালা। ডালডা বা তেলের বদলে ঘিয়ে ভাজা বলে বোঁদের রং লালচে হয় না, সাদাই থাকে।

ভাজা শেষ হলে কড়াই থেকে বোঁদে তুলে রসে চুবিয়ে রাখা হয়। খানিক বাদে রস থেকে উঠিয়ে শুকিয়ে নেওয়া। এরফলে বোঁদে বাইরে থাকে শুকনো দেখালেও ভেতরে রসস্থ থাকে। প্যাকেটবন্দি করার পর এই মিষ্টি একমাস পর্যন্ত রেখে খাওয়া যেতে পারে।  

কোনও কৃত্রিম রং নেই। ডালডার বদলে ঘিয়ে ভাজা। তার উপর দীর্ঘদিন রেখে খাওয়ার সুবিধে। এইসমস্ত কারণে কামারপুকুরে ঠাকুরের জন্মভিটে ও রামকৃষ্ণ মঠ সন্দর্শনে আসা ভক্তদের মধ্যে প্যাকেটবন্দি বোঁদের চাহিদা তুঙ্গে। আজকাল ভিন রাজ্য, এমনকি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। মূলত শীতের সময়, নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সাদা বোঁদের রমরমিয়ে বিক্রিবাটা চলে। কামারপুকুর মিশনকে ঘিরেই গজিয়ে উঠেছে খান বিশেক দোকান। শীতকালে, ব্যাপক হারে পর্যটক, পুণ্যার্থী আসার মরশুমে, দিনে ৮০ থেকে ১০০ কুইন্টাল বোঁদে বানানো হয়। বাকি সময় এতটা না হলেও ২০-৩০ কুইন্টাল সাদা বোঁদে তৈরি হয়ে থাকে।

রামকৃষ্ণদেবের ভোগে নিত্য নিবেদিত এই মিষ্টান্ন স্থানীয় বাসিন্দাদেরও আবেগের বস্তু। বাড়িতে অতিথি এলে প্লেটে সাদা বোঁদে থাকা চাই-ই-চাই। আত্মীয়দের বাড়িতে গেলে প্লেটের বদলে প্যাকেট হাতে রওনা দেন তাঁরা।

যেহেতু কামারপুকুর ছাড়া আর কোথাও তৈরি হয় না, সেই কারণে ২০১৭ সালে রসগোল্লা জিআই ট্যাগ পাওয়ার পর সাদা বোঁদের কৃত্রিম মেধাসত্ত্ব নিয়েও আওয়াজ ওঠে। এলাকার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের এক অংশের দাবি, এখানকার জলের গুণেই নাকি বোঁদের রং এতটা ধবধবে সাদা। অন্য কোথাও চেষ্টা করেও নাকি এমন রং আনা সম্ভব নয়! পরের বছর, ২০১৮-তে জিআই ট্যাগ নিয়ে কামারপুকুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কথাবার্তা চলে৷ এরই সুবাদে এ বছর (২০২৫) ৩১ মার্চ মিলেছে জিআই স্বীকৃতি।


```