পুরুলিয়ার লোকগানের সুর নতুন প্রজন্ম ভুলে গিয়েছে। বোলের রেশটুকু ধরে রেখেছে জিয়াগঞ্জের মিষ্টি। এর চাইতে কালোত্তীর্ণ ‘ফিউশন’ আর কী হতে পারে!

জিয়াগঞ্জের মিষ্টি 'সাধুবাবা'
শেষ আপডেট: 8 June 2025 13:40
সুর, কথা পছন্দ হোক, চায় না হোক, ‘ছি ছি ছি রে ননী ছি’ গানের দু'কলি আপনি নিজের অজান্তে, কাজের ফাঁকে কখনও না কখনও গেয়েছেন। আলবাত গেয়েছেন। হাল আমলে ওড়িশার এই লোকসংগীত যেভাবে সমাজমাধ্যমে হাসির রোল, মিমের উপাদান জুগিয়েছে, আজ থেকে পনেরো-ষোলো বছর আগে এমনই এক গান সারা বাংলায় ঝড় তুলেছিল। লোকের মুখে মুখে ঘুরত। নাম: ‘বাঁচাও সাধুবাবা!’
পুরুলিয়ার (Purulia) কোনও এক গাইয়ে এই একটি গানে বঙ্গদেশ মাতিয়ে তোলেন। লোকসংগীত মৌখিক পরম্পরা (Oral Tradition)। তাই এর স্রষ্টা কে—সেটা হলফ করে বলা কঠিন। ‘বাঁচাও সাধুবাবা’র গায়ককেও, খুব স্বাভাবিকভাবে, কেউ চেনে না।
আরও অনেকের মতো গানের তালে তাল মিলিয়ে গুনগুন করতেন জয়দেব রায়। বাড়ি জিয়াগঞ্জে (Jiaganj)। মিষ্টির দোকানি। দাদু দেবেন্দ্রনাথ রায়ের দোকান। শহরজোড়া সুনাম। রসগোল্লা, সন্দেশ, পান্তুয়া, মিষ্টি দই তো রয়েছেই৷ এর পাশাপাশি বহরমপুর, মুর্শিদাবাদের আইকনিক কালোজামেরও বিশেষ কদর।
জয়দেববাবু সাবেকিয়ানা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাশাপাশি তাঁর ছিল পরীক্ষানিরীক্ষার ধাত। মিষ্টান্ন নিত্যনবায়মান! একে যত ‘ইনফিউজ’ করো, ততই খুশবাই ছড়াবে, স্বাদকোরকে ফেলবে সাড়া। পরীক্ষা তো সেই ছানা আর ক্ষীর নিয়ে। সঙ্গে চিনির পরিমাণ, কম-বেশি আঁচের খেলা। শেষপাতে ছড়িয়ে দাও খোয়া, গুটিকতক শুকনো ফল। দিয়ে দাও চকমদার নাম। ব্যাস! কেল্লাফতে। গুণমান নিয়ে নো কমপ্রোমাইজ হলেই হল। নতুন মিষ্টি ফেলবে সাড়া, বিকোবে দেদার!

এই রসায়নেই একদম নতুন কিসিমের মিষ্টান্ন আবিষ্কার করেন জয়দেববাবু। এমনটাই জানালেন তাঁর মেয়ে, দোকানের বর্তমান কর্ণধার পায়েল বসু। ছানা নিয়ে গবেষণার ছলে জন্ম নেয় চ্যাপ্টা আকারের সুগন্ধি ও সুস্বাদু মিষ্টি।

আকারে-প্রকারে কোনও মিল না থাকলেও সেই সময়ের হিট গানের বুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবিষ্কর্তা জয়দেববাবু এর নাম দেন ‘সাধুবাবা’! শুনতে সাত্ত্বিক। কিন্তু রসনা আর বাসনায় মাখামাখি। যেমন দেখে সুখ৷ তেমনই খেয়ে তৃপ্তি। লোকগানের বোল মিলিয়ে বানানো জিয়াগঞ্জের লোকজ মিষ্টি ‘সাধুবাবা’ (SadhuBaba)। শহরের বাইরে আর কোথাও এর চল নেই। গুপো সন্দেশ, বাবরশা, মনোহরার মতো এও বাংলার ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক মিষ্টি।
সাধুবাবা দেখতে চ্যাপ্টা। গোলাকার। আসল উপাদান ছানা। তবে চারপাশে মোয়ার আস্তরণ৷ উপরিভাগে ছোট্ট, গোল সন্দেশ শোভমান—ঠিক যেন কেকের উপর ঝলমলে চেরি! রূপবাহারী এই মিষ্টি কামড় দেওয়ামাত্র মুখে গোলাপজলের সুবাস খেলে যায়।

মিষ্টিতে গোলাপজল কেন? পায়েলের অনুমান, সম্ভবত শেহেরওয়ালি সম্প্রদায়ের প্রভাবে এই অনুপান জুড়ে দেওয়া হয়৷ মুর্শিদাবাদ ঐতিহাসিক জেলা। এখানে ডাচ, ওলন্দাজ, ব্রিটিশের পাশাপাশি বাণিজ্যে বসত গড়েন দূগড়, দুধরিয়া, নওলক্ষা, সিংঘী, শেঠ সমাজ। এই সমাজকে একত্রে ‘শেহেরওয়ালি’ বলা হয়ে থাকে। যাদের একটি বড় অংশ আজও আজিমগঞ্জ, জিয়াগঞ্জের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন। তাঁদের কথা মাথায় রেখে ক্রেতা টানতেই ‘সাধুবাবা’য় গোলাপ জল মেশানোর সিদ্ধান্ত নেন জয়দেববাবু। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে!

বাংলার সাবেকি ছানা-প্রধান নরম পাকের মিষ্টি। কিন্তু সাধুবাবাকে আলাদা করেছে মোয়ার আবরণ। বাইরের কভারই গেমচেঞ্জার। আর উপরের সন্দেশের গুলি ঠিক যেন বিক্রিয়ার অনুঘটক—এক কামড়ে স্বাদ দ্বিগুণ বাড়ায়।
জিয়াগঞ্জ বাজারের কাছে দোকান। প্রতিষ্ঠাতা দেবেন্দ্রনাথের ছেলে ক্ষুদি রায়ের হাত ধরে বোলবোলাও৷ তাই ‘ক্ষুদি রায়ের দোকান’ বলেই লোকে চেনে। বাকি মিষ্টি কেনাবেচা চলতে থাকে। কিন্তু সুনাম আর ইতিহাসকে ‘বাঁচিয়ে’ রেখেছে সেই ‘সাধুবাবা'! কর্ণধার পায়েল তা বিলক্ষণ জানেন। তাই মানের সঙ্গে কদাপি আপোষ নয়।
পুরুলিয়ার লোকগানের সুর নতুন প্রজন্ম ভুলে গিয়েছে। বোলের রেশটুকু ধরে রেখেছে জিয়াগঞ্জের মিষ্টি। এর চাইতে কালোত্তীর্ণ ‘ফিউশন’ আর কী হতে পারে!