
রামচাকি
শেষ আপডেট: 27 April 2025 18:23
'মিষ্টি-কথা'র প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম জনাইয়ের মনোহরার কথা। কীভাবে এক কোপনস্বভাব জমিদারের মন জিতে বাংলার মিষ্টান্ন সংস্কৃতির মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে মনোহরা, তারই ইতিবৃত্ত প্রথম নিবন্ধ।
আজকের আলোচ্য 'রামচাকি'। এর সঙ্গে অবশ্য রাজা-জমিদার, সাহেবসুবো কেউ সংশ্লিষ্ট নেই। রামচাকি-কে অমরত্ব দিয়েছেন যিনি, তাঁর নাম রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।
অবশ্য ঠাকুরের কথায় আসার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে তারও আগের ইতিহাসে।
আসুন যাত্রা শুরু করা যাক!
গৌর-নিতাইয়ের স্মৃতিধন্য পানিহাটি
পানিহাটি (Panihati)। অতীতের ‘পণ্যহট্ট’। ইতিহাসমতে, পূর্ববঙ্গে যশোরের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র। সবই নদীপথে। তারপর স্বাধীনতা, দেশভাগ। একদা বঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ ‘বাণিজ্যতট’ কালের নিয়মে ‘পৌরসভা’য় এসে ঠেকেছে। তবু এর শরীর থেকে মুছে যায়নি ইতিহাসের ধুলো।
পানিহাটির সঙ্গে বাঙালির নাড়ির বাঁধনটি বেঁধে দিয়েছিলেন যিনি, তিনি শ্রীচৈতন্যদেব। জনশ্রুতিমতে, মহাপ্রভু দু'বার পানিহাটি ভ্রমণ করেন। নৌকাপথে নেমেছিলেন মহোৎসবতলা ঘাটে। একবার নবদ্বীপ থেকে পুরী যাওয়ার পথে (১৫১৫ খ্রি)। আরেকবার গৌড় হয়ে পুরী থেকে বৃন্দাবন যাওয়ার সময়৷ পানিহাটিতেই ছিল শিষ্য রাঘব পণ্ডিতের নিবাস। সেখানেই বার দুই এসেছিলেন চৈতন্যদেব।
পাশাপাশি এই অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রভু নিত্যানন্দের স্মৃতিও। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন নিত্যানন্দ। পথিমধ্যে পানিহাটিতে বিশ্রাম। সপ্তগ্রামের জমিদার রঘুনাথ নারায়ণদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ। প্রভু নিতাইকে চোখের দেখা দেখতে অগণিত তীর্থযাত্রীদের আগমন। এই উন্মাদনা দেখে নিত্যানন্দ ফিরে যাওয়ার আগে নারায়ণদেবকে নির্দেশ দেন, আগত ভক্তদের মধ্যে যেন দই-চিড়া বিতরণ করা হয়। সেই থেকে পানিহাটিতে বিখ্যাত বৈষ্ণব-সমাবেশের সূচনা। নাম ‘দণ্ড-মহোৎসব’।
মিষ্টির কিস্যা শোনাতে বসে এই গৌরচন্দ্রিকাটুকু যে সেরে ফেলতে হল, তার একটা কারণ, শুধু পানিহাটি নয়, গোটা বঙ্গভূমির মিষ্টান্ন সংস্কৃতি প্রভূতভাবে বৈষ্ণব প্রভাবপুষ্ট। পিঠেপুলি, ক্ষীরিকা, রসকদম্ব—হরেক কিসিমের মিষ্টান্নে বৈষ্ণবদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব মিলেমিশে রয়েছে। পানিহাটির দণ্ড-মহোৎসবও তার ব্যতিক্রম নয়।
পানিহাটি, রামচাকি ও শ্রীরামকৃষ্ণদেব
উনিশ শতকে বাংলায় ভক্তি আন্দলন যখন বিভিন্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন সর্বধর্মসমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব দু’বার পানিহাটি আসেন। প্রথমবার ১৮৮৩-তে। তারপর ১৮৮৫ সালে। এসেছিলেন দণ্ড-মহোৎসবে যোগ দিতে। ইতিহাসে তা-ই লেখা আছে। কিন্তু রসনাপ্রিয় বাঙালি এই ঘটনাকে স্মরণে রেখেছে মিষ্টান্নের সূত্রে। নাম ‘রামচাকি’ (Ramchaki)। কথিত আছে, বিশেষ কায়দায় প্রস্তুত গোলাকার ছানার মণ্ডটি রামকৃষ্ণের মন জয় করেছিল। সপার্ষদ পানিহাটি এসেছিলেন তিনি। স্থানীয় ভক্তবৃন্দ তাঁকে ঘোড়ার গাড়ি করে শম্ভুচরণ পালের দোকানে নিয়ে যান। তখন শম্ভুবাবুর দোকান ছিল গঙ্গাতীরে, বাজারঘাটের কাছে।
অন্য একটি মত বলে, শম্ভুচরণ নয়, রামকৃষ্ণ রামচাকির স্বাদ নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ মোদকের দোকানে। কিন্তু তাঁকে ঘোড়ার গাড়ি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যদি ঐতিহাসিকভাবে সত্যি হয়, তাহলে প্রথম অনুমানই গ্রহণযোগ্য। কারণ, শ্রীকৃষ্ণ মোদকের দোকান দণ্ড-মহোৎসবের উৎসবস্থলের কাছে। তুলনায় শম্ভুচরণের দোকান বেশ কিছুটা দূরে।
যাই হোক, শম্ভুচরণ পালই যে রামচাকির উদ্ভাবক এই বিষয়ে ঐতিহাসিকেরা একমত। শম্ভুচরণ প্রথমে দোকানে খোলেন পানিহাটি বাজারে, রাধাগোবিন্দ জীউর মন্দিরের কাছে। তাঁর মৃত্যুর পর দায়িত্ব তুলে নেন পুত্র পশুপতিনাথ পাল। তারপর শরিকি বিবাদ। দোকান ভাগ। অনেক টালবাহানার পর পশুপতিবাবুর ছেলে প্রশান্ত পাল নতুন করে সাজিয়ে তোলেন ‘পাল সুইটস’। পানিহাটির আরেক প্রসিদ্ধ মিষ্টি গুপো সন্দেশের পাশপাশি রমরমিয়ে আজও বিকোচ্ছে রামচাকি। দোকান নিতান্তই ছাপোষা। দেয়ালে ইতিহাসের গরিমা-দর্শানো কোনও ব্যানার বা পোস্টার লাগানো নেই। তবু এলাকার মানুষ একডাকে রামচাকি সন্দেশের ‘বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান’ বলতে পাল সুইটসকেই চেনেন।
রামচাকির ভিয়েন-কৌশল
অন্য সন্দেশ থেকে রামচাকি ছানার গুণমানে আলাদা। এর জন্য বিশুদ্ধ ছানা প্রয়োজন। নয়তো সন্দেশ বানানো অসম্ভব। মাখন তোলার পর দুধ অনেকটা পাতলা হয়ে যায়। ফলে মাখন-না-তোলা দুধ থেকেই রামচাকি বানানোর ছানা তৈরি হয়। আর বিশুদ্ধতা নিয়ে আপোষ চলে না বলে বাজারে কেনা নয়, একমাত্র বাড়িতে বানানো ছানাই ব্যবহার করেন প্রশান্তবাবু।
ছানা তৈরি শেষ হলে কড়াইয়ে বসিয়ে শুরু হয় পাক দেওয়া। অল্প অল্প করে চিনি ঢেলে তা পাকানো হয়। তার কিছুক্ষণ বাদে কারিগরেরা ছোট এলাচের গুঁড়ো মিশিয়ে দেন। কড়াই থেকে নামানোর পর খানিক অপেক্ষা। পরের ধাপ: ছানার মিশ্রণ ঠান্ডা হলে ছোটবড় মণ্ড কাঠের ছাঁচে ফেলা। তারপর হাল্কা হাতের চাপ। ব্যাস! তৈরি হয় রামচাকি সন্দেশ।
এমনিতে সারা বছরই চিনির পাকের মিষ্টি দোকানে মেলে। শুধুমাত্র শীতাকালে নলেন গুড় মেশানো হয়। ১৫ টাকা, ২০ টাকা—সন্দেশের আকার অনুযায়ী দাম হেরফের করে।
শেষ পাতে মিষ্টিমুখ, দৃষ্টিসুখ
ভাষাতত্ত্বের যুক্তি মতে, ‘রাম’ এখানে নিছক শব্দ নয়। উপসর্গও বটে। খাঁটি বাংলা উপসর্গ। যার অর্থ: বড়, প্রকাণ্ড (তুলনীয় শব্দ: রামছাগল, রামশিঙা, রামদা)। অন্যান্য সন্দেশের এই মিষ্টান্ন চাইতে আকারে বড়। আর বানানো হয় চাকিতে চাপ দিয়ে। দুইয়ে মিলে রামচাকি। একবার হাতে নিলেই সন্দেশের গায়ে চোখে পড়ে হরেক কিসিমের অলংকরণ। মধ্যিখানে লেখা ‘রামচাকি’। তীব্র নয়, মিষ্টত্বের পরিমাণ বেশ হাল্কার দিকে। জিভের স্বাদ মেটানোর পাশাপাশি এই সন্দেশ ক্রেতার মনও ভোলাবে। কারণ সৌন্দর্য-সৌকর্যে ‘রামচাকি’ হয়ে উঠেছে প্রাচীনত্বের স্মারক। মাত্রাছাড়া ফিউশনের রাস্তায় হাঁটেনি সে। সাবেক ঘরানা আর সাধারণ উপকরণকে মূলধন করে শুধুমাত্র বিশুদ্ধতা ও ভিয়েনের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েও যে উৎকৃষ্ট মিষ্টি প্রস্তুত করা সম্ভব, রামচাকি তার অন্যতম প্রমাণ। শুধু স্বাদের মাহাত্ম্যে নয়, দৃষ্টিসুখেও পানিহাটির এই মিষ্টান্ন গৌড়ীয় স্পন্দনকে ধরে রেখেছে।