ছোট্ট পজ, মাপা হাসি – তারপর কয়েক শব্দে গোছানো একটা উত্তর। উল্টো দিকে বসা প্রশ্নকর্তার মুখের পরের কথাটি কেড়ে নেওয়ার জন্য সেটাই কাফি।

গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 5 November 2025 20:46
মডেলিং দিয়ে শুরু গ্ল্যামার জগতে পথচলা। তারপর ১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব। অনেকেই মনে করেন এখনও ‘সবচেয়ে সুন্দরী নারী’র উত্তরাধিকার পাওয়ার মতো যোগ্য কাউকে পায়নি পৃথিবী। নীলচে গভীর চোখ, মাপা হাসি আর বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে বোল্ড হয়নি এমন মানুষ খুঁজে দেখান দেখি! ‘বিউটি উইথ ব্রেন’-এর তকমা পাওয়া যে এত সহজ নয়, আর হলেও তা ধরে রাখা যে মোটেও মুখের কথা নয় – তা বারবার প্রমাণ করেছেন তিনি নানা সাক্ষাৎকারে।
কথা হচ্ছে, ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সফল অভিনেত্রী ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনকে নিয়ে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর নাম আজও সমানভাবে সম্মানিত। বলিউডের পাশাপাশি ঐশ্বর্যা পা রেখেছিলেন হলিউডেও। কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে শুরু করে নানা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ভারতীয় সিনেমার প্রতিনিধি হিসেবে বহুবার শিরোনামে এসেছেন তিনি।
মুখে মাপা হাসি, চোখের স্থির দৃষ্টিতে যেকোনও পুরুষ তো বটেই, মহিলাদের হৃদয়েও ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখেন তিনি। বহু মহিলার ‘লেডি ক্রাশ’-এর ধারণাই নতুন করে তৈরি হয়েছিল ঐশ্বর্যাকে ঘিরে। যাঁরা ঐশ্বর্যার ‘ডাই হার্ড’ অনুরাগী, তাঁরা জানেন, এক ঝলকে ঘায়েল করে দেওয়ার ক্ষমতার অধিকারিণী এই নারীর মধ্যে রূপের চেয়েও বেশি ঝকঝক করে ওঠে তাঁর ব্যক্তিত্ব। অদ্ভুত এক ‘অরা’ কাজ করে তাঁকে ঘিরে, যা অস্বীকার বা তুচ্ছ করার ক্ষমতা এখনও অর্জন করে ওঠা সম্ভব হয়নি কারও।
অভিনয়, মডেলিং সমস্ত কিছু পেরিয়েও যদি আজও মানুষ কিছুতে আকৃষ্ট হয়ে থাকেন, তা হল, তাঁর কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর অসাধারণ দক্ষতা। ক্যামেরার সামনে কঠিন বাউন্সার সামলে বলে বলে ছক্কা হাঁকিয়েছেন। এখন যখন প্রিয়াঙ্কা, দীপিকা, ক্যাটরিনাদের কড়া জবাব নিয়ে কথা হয়, মনে হয় সেই নিদর্শন রাখা তো অনেক আগে থেকেই শুরু করেছেন ঐশ্বর্যা।
যখনই কোনও প্রশ্ন ধেয়ে এসেছে তাঁর দিকে, প্রথম ধাক্কায় একটু টলে গেলেও সেই চমক কখনও তাঁর চোখ ছাড়িয়ে ঠোঁট পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পারেনি। প্রশ্ন শুনে, ছোট্ট একটা পজ, মাপা হাসি – তারপর কয়েক শব্দে গোছানো একটা উত্তর। উল্টো দিকে বসা প্রশ্নকর্তার মুখের পরের কথাটি কেড়ে নেওয়ার জন্য সেটাই কাফি।
একবার এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন এক আমেরিকান সাংবাদিক, ‘আমি এমন কোনও মহিলাকে দেখিনি, যিনি যেমন - ঠিক তেমন ভাবেই ১০০% খুশি। আপনি কি খুশি নিজেকে নিয়ে?’ উত্তরে সেই ‘এপিক’ পজ, তারপর উত্তর এল, ‘এটা জটিল প্রশ্ন। যদি আমি হ্যাঁ বলি, তাহলে বলা হবে আমি অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু আমি সেটা একেবারেই নই। আমি যেমন, আমি সেভাবে ভালই তো আছি।’ পরের প্রশ্ন আসে, ‘একজন এমন মহিলা যাঁর নিজস্ব কেরিয়ার আছে, টাকাও উপার্জন করছেন, কিন্তু বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকছেন – এটা তো আমেরিকানদের কাছে বেশ অদ্ভুত একটা বিষয়।’ জবাবে বলেছিলেন, ‘আমিও এটা ঠিক বুঝি না, তবে হতে পারে ভারতের জীবনধারা যেমন, সেখানে এমনটাই স্বাভাবিক।’ তাহলে ঐশ্বর্যা কি নিজেকে স্বাধীনচেতা নারী বলে মনে করেন? উত্তরে বিশ্বসুন্দরীর জবাব, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কিন্তু আমি তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে আলাদা থাকা আর স্বাধীনচেতা হওয়া – এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকার কোনও কারণ দেখতে পাই না।’
ওই প্রশ্ন দিয়েও ঐশ্বর্যাকে অতটা কাবু করতে পারেননি সাংবাদিক। প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা, পুরুষরা কি আপনাকে কিছুটা হলেও সমীহ করে চলেন?’ উফ, সেই এপিক পজ। তারপর উত্তর এল, ‘আপনিও কি সমীহ করার কথা ভাবছেন?’ টলে উঠল সাংবাদিকের অভেদ্য আত্মবিশ্বাস। মৃদু প্রতিরোধে বলতে চেষ্টা করলেন, ‘না ঠিক তা নয়…’। সাংবাদিক মহাশয় বেশ বিব্রত হয়ে পড়েন। সেখান থেকেই আবারও ঐশ্বর্যা নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসে বলে ওঠেন, ‘আপনি তো লজ্জা পাচ্ছেন দেখছি। আমার কিন্তু ভাল লাগছে ব্যাপারটা বেশ।’
২০০০-এর শুরুর দিকে Bride and Prejudice ছবির প্রচারে গিয়েছিলেন আমেরিকান টক শো সঞ্চালক ডেভিড লেটারম্যান–এর অনুষ্ঠানে। সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি তো আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন। এটা কি ভারতীয়দের জন্য খুব সাধারণ একটা বিষয় যে, তাঁরা এক বয়সের পরও বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকেন?’
প্রশ্ন খানিক থমকে দিয়েছিল বিশ্বসুন্দরীকে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের ভারতীয়দের জন্য এটা সাধারণ ব্যাপার। আমাদের অন্তত বাবা-মায়ের সঙ্গে রাতের খাবার সময় দেখা করার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয় না।’ সাংবাদিকের থতমত মুখ আর মুখের ভাবভঙ্গি বলে দিয়েছিল এমন একটা উত্তরের জন্য তিনি আদৌ তৈরি ছিলেন না। শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘যাক আমরা কিছু নতুন শিখলাম আজ।’
আবার আরও এক প্রশ্ন ওই শোতেই উঠে এসেছিল। ডেভিড জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনার যখন বয়স কম ছিল তখন থেকেই কি আপনি মডেলিং করছেন?’ প্রশ্ন শুনে ঐশ্বর্যা কি খানিক বিরক্ত হয়েছিলেন? সেটা সঠিক বোঝা না গেলেও ভালভাবে যে নেননি, সেটা পরিষ্কার ছিল। ডেভিড জিজ্ঞাসা করে চলেন, ‘আপনি কি ১৬-১৭ বছরেই ঠিক করে নিয়েছিলেন যে আপনি এই পেশায় আসবেন?’ সেই সময় আগের প্রশ্নের জের টেনে সপাটে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি কবে ঠিক করলেন এই পেশায় আসবেন?’
এখানেই শেষ নয়। একবার মুখোমুখি হয়েছিলেন অপরা উইনফ্রের। অপরা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমি জানি, আপনি সব ভারতীয়র হয়ে তো উত্তর দিতে পারবেন না, তাও যেহেতু এখানে আপনি আপনার সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন, এটা বলুন যে আমেরিকান মহিলাদের নিয়ে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী? তাঁদের কী মনে হয়, আমরা একটু বেশি রুঢ়? প্রথম বাউন্সার। এক্সপ্রেশন দিয়ে ম্যানেজ করলেন। দ্বিতীয় বাউন্সার এল, ‘আমরা কী বেশি কথা বলি?’ সামলে নিয়ে বললেন, ‘না হতেই পারে আপনাদের নিজস্ব মতামত রয়েছে।’ তৃতীয় প্রশ্ন উড়ে এল, ‘তাঁদের কি এটা মনে হয় যে, আমাদের এখানে ডিভোর্সের সংখ্যা বেশি?’ এই প্রশ্নে বাউন্ডারির বাইরে ছক্কা হাঁকিয়ে বলে বসলেন – ‘হুম, এবার এটা অন্তত আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হতেই পারে।’
সলমনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। সেসব পেরিয়ে এসে বিয়ে করেছেন বিখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের ছেলে অভিষেককে, যিনি নিজেও অভিনয়ের জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘কফি উইথ করণ’-এর বিখ্যাত র্যাপিড ফায়ার রাউন্ডে করণ প্রশ্ন করেছিলেন ‘শাহরুখ, সইফ, সলমন আর আমির – কোন খান সব সময় এগিয়ে?’ বচ্চন পরিবারের আত্মবিশ্বাসী পুত্রবধূর উত্তর ছিল, ‘আমরা বচ্চন এবং সব সময় প্রাসঙ্গিক। আর… মাই নেম ইজ নট খান।’
এক ফরাসি সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পর্দায় নগ্ন সাহসী চরিত্রের সুযোগ আসলে তিনি কি করবেন? তিনি বলেছিলেন তিনি চান না পর্দায় এমন কিছু করতে। ত্রাপর কিছু প্রশ্ন আসলে, সপাটে ক্যামেরা চলাকালীনই বলে বসেন, আমার তো মনে হচ্ছে আমি আমার গাইনোকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলছি। আপনি তো পেশায় একজন সাংবাদিক, সেটাইতেই বরং থাকুন না।
কখনও সাংবাদিকের মুখের ওপর বলেছেন, আপনি হয়তো নতুন সাংবাদিকতায় এসেছেন। আবার কখনই বিরক্তি চেপে হাসিমুখে বলেছেন, যা ছড়াচ্ছে সেগুলো আপনারা আপনাদের মতো করেই উপভোগ করুন না।
বিশ্বসুন্দরী, বলিউড আইকন, আন্তর্জাতিক তারকা - ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনকে বর্ণনা করতে অনেক বিশেষণই আছে। অভিনয় দক্ষতা নিয়ে যতটা না কথা হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি কথা হয়েছে ঐশ্বর্যার সোজাসাপ্টা উত্তর নিয়ে, তাঁর চোখ ঝলসানো রূপ নিয়ে। যা নিয়ে আরও বেশি কথা হওয়া উচিত ছিল, তা বরাবর চাপা পড়ে গেছে তাঁর রূপের ছটায়। তাঁর না টলাতে পারা আত্মবিশ্বাস…