ফেভিকল থেকে ক্যাডবেরি, পোলিওর ‘দো বুন্দ জিন্দেগিকে’ থেকে পন্ডসের ‘গুগলি উগলি উশ’—ভারতীয় বিজ্ঞাপনের কিংবদন্তি পীযূষ পাণ্ডে (Piyush Pandey) রেখে গেলেন সৃজনশীলতার এক উত্তরাধিকার।

বিজ্ঞাপনের জাদুকর পীযূষ পাণ্ডে।
শেষ আপডেট: 24 October 2025 13:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পীযূষ পাণ্ডে (Piyush Pandey) প্রয়াত হলেন। শুক্রবার, ৭০ বছর বয়সে চলে গেলেন বিজ্ঞাপন জগতের (Advertisement) জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি এমন একজন শিল্পী ছিলেন, যিনি ‘বিজ্ঞাপন’কে কেবল বিক্রির হাতিয়ার নয়, আবেগের ভাষা বানিয়ে তুলেছিলেন।
ওগিলভি-র এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও গ্লোবাল চিফ ক্রিয়েটিভ অফিসার হিসেবে চার দশকের কর্মজীবনে পাণ্ডে রেখে গেছেন অসংখ্য স্মরণীয় বিজ্ঞাপন। ফেভিকল, ক্যাডবেরি, পন্ডস, এশিয়ান পেইন্টস, পোলিও অভিযান— আরও কত নাম যে এই তালিকায় আছে!
১৯৮৮ সালে ওগিলভি অ্যান্ড মাদারে অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার থাকা অবস্থায় পীযূষ লিখেছিলেন ভারতের ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা গান, ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’। লোকসেবা সংচার পরিষদের উদ্যোগে তৈরি ও দূরদর্শনে সম্প্রচারিত এই গানে শাস্ত্রীয় ও আঞ্চলিক সুর মিলেছিল এক অনন্য জোটে। লতা মঙ্গেশকর, ভীমসেন যোশি প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে ভারত যেন নিজেকে চিনেছিল নতুনভাবে।

যখন বিজ্ঞাপনে মিষ্টি মানেই ছিল কেবল শিশুদের আনন্দ, তখন পীযূষ এক কিশোরীর উচ্ছ্বাসে প্রাপ্তবয়স্কদের আনন্দকেও একই মিষ্টতায় মিশিয়ে দিলেন। মাঠে নাচতে থাকা সেই মেয়েটি, আর পটভূমিতে ভেসে আসা, “কুছ খাস হ্যায়...”—আজও যে কোনো ভারতীয়র মনে nostalgia জাগায়। এর পর ২০০০ সালে ক্যাডবেরিকে ফের নতুনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন পীযূষ। লিখেছিলেন, ‘পাপ্পু পাস হো গয়া’—প্রজন্মের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো সাফল্যের গান।

‘শর্মা কি দুলহানিয়া বিয়াহ কে আই’— ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই বিজ্ঞাপন ছিল পিযূষের ফেভিকলকে ঘিরে নির্মিত ‘১৯৫৯: এ লাভ স্টোরি’ ক্যাম্পেইনের অংশ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত এক সোফার গল্পে বাঁধা ছিল সম্পর্ক, স্মৃতি আর স্থায়িত্বের মমতা।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের টানাপড়েনকে ভালবাসার বার্তায় রূপ দিয়েছিলেন তিনি। ‘তোড়ো নহি, জোড়ো’—এই এক লাইনে তিনি মিলিয়ে দিলেন মানবিকতা আর মার্কেটিং।
/afaqs/media/post_attachments/5634248eda0cf52e6bb5d617572fd123a52cdd88baf28ea59a1e8c5577d8eb9b.jpg)
এক তরুণীর মুখে মাখার কোল্ড ক্রিমে গ্ল্যামার রূপান্তরের এক কিউট গল্প বোনেন পীযূষ। ‘গুগলি উগলি উশ’— এই জিঙ্গলটি যেমন আদুরে, তেমনি বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে এক মাইলফলক। তখনকার দিনে টিভি পর্দায় প্রতিবার এই সুর বাজলে ঘরে ঘরে হাসি ফুটত।
/socialsamosa/media/post_banners/Hu0fVf6V3BlHYG7RnGtD.jpg)
২০০০-এর শুরুর দিকের এই চিউইং গামের বিজ্ঞাপনে সেলুনের দৃশ্য আর অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া— সব মিলিয়ে এক দারুণ মজা ধরা পড়েছিল। তা যেন ছিল তীব্র ঝাঁঝালো, ঠিক যেমন ছিল ওই মারাত্মক টক সেন্টার শক!
নয়ের দশকের প্রথম দিকে পীযূষ যুক্ত হন পোলিও সচেতনতা প্রচারে। ‘দো বুন্দ জিন্দেগিকে’—এই বাক্যটাই হয়ে ওঠে জনজাগরণের প্রতীক। অমিতাভ বচ্চন, জ্যাকি শ্রফ, ঐশ্বর্যা রাই—সবাইকে নিয়ে এই ক্যাম্পেইন ছড়িয়ে দেয় আশার বার্তা, বদলে দেয় ভারতের স্বাস্থ্য ইতিহাস।

২০০৭ সালে একটা ধারণাকে প্রাণ দেন পীযূষ পাণ্ডে। বলেন, ‘প্রত্যেক ঘরেরই এক গল্প আছে’।
বাড়ি শুধু ইট-সিমেন্ট নয়, মানুষের অনুভূতির প্রতিফলন— এই উপলব্ধিকেই তিনি রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন।
পীযূষ পাণ্ডে প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞাপন মানে কেবল পণ্য বিক্রি নয়—এ এক সাংস্কৃতিক ভাষা, এক আবেগের চিত্রনাট্য।

তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনও আমাদের প্রতিদিনের জীবনে, আমাদের হাসিতে, আমাদের ভালবাসায় বেঁচে আছে, আগামী বহু বছর ধরে থাকবে। ঠিক ফেভিকলের মতো, যা সাধারণ মানুষের মনগুলোকে চিরতরে জোড়া লাগিয়ে রেখেছে।