যে পুরুষ অলজ্জ দৃষ্টিতে মেয়ে দেখে, অথচ দখল করতে চায় ন; যার মধ্যবিত্ত ভীরু প্রেম টেস্ট পেপারের রাখা থাকে, দুরুদুরু বক্ষে সেও হয়তো সব ভুলে বলে ফেলতেই পারে, 'খাসা তোর চেঁচানি'।

সুকুমার রায়
শেষ আপডেট: 30 October 2025 17:36
'ভালবাসা' শব্দটা যতটা সহজ শোনায়, তার গভীরতা ততটাই দুর্বোধ্য। আমরা কেন ভালবাসি (Love), তার কোনও উত্তর থাকে না। রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) লিখেছিলেন, “জীবের মধ্যে অনন্তকে অনুভব করার অন্য নামই ভালবাসা।” অন্যদিকে স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda) বলেছিলেন, “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” এই দুই ভাবনার ভিতরেই যেন লুকিয়ে আছে প্রেমের প্রকৃত তাৎপর্য। এক সীমিত মানুষে অসীমের স্পর্শ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
যে পুরুষ অলজ্জ দৃষ্টিতে মেয়ে দেখে, অথচ দখল করতে চায় ন; যার মধ্যবিত্ত ভীরু প্রেম টেস্ট পেপারের রাখা থাকে, দুরুদুরু বক্ষে সেও হয়তো সব ভুলে বলে ফেলতেই পারে, 'খাসা তোর চেঁচানি'। এ প্রেমও দুই জীবের। প্যাঁচা আর প্যাঁচানির। যারা কিনা গালে গাল ঘষে চূড়ান্ত বিনয় করতে জানে। নামে প্যাঁচ থাকলেও মনটা বড্ড নরম। হাড়-পাঁজরে রাগের কোনও বালাই নেই।
ভালবাসা আসলে এমনই এক আত্মার প্রসার। তা কোনও শর্তে বাঁধা নয়, কোনও বিনিময়ে স্থির নয়। যেখানে ‘আমি’ আর ‘তুমি’-র ব্যবধান মিলিয়ে যায়।
কিন্তু সেই আমি-তুমির মাঝখানেই প্রেমের উচ্চারণ করেছিলেন সুকুমার রায় (Sukumar Ray Birthday)। “তোর গানে পেঁচি রে, সব ভুলে গেছি রে”— বাংলা কবিতায় একমাত্র তিনিই শিখিয়ে দিয়েছেন লাই দেওয়া কাকে বলে।
তাঁর লেখায় প্রেম মানে মায়া নয়, জীবনেরই এক সরল উচ্ছ্বাস। আবার “চট্ করে মনে পড়ে মট্কার কাছে, আধখানা মালপোয়া কাল থেকে আছে”— এই একটিমাত্র লাইনে যে ছুটন্ত, বেঁচে থাকা, খাসা বাংলার গন্ধ পাওয়া যায়, তা আর কারও লেখায় মেলে কি?
এই সহজ অথচ মায়াময় ভাষার ভিতরেই লুকিয়ে আছে বাঙালির হাসি, অভিমান, প্রেম, ক্ষুধা আর খেয়াল— এক কথায়, জীবনের আসল স্বাদ। তাই হয়তো সুকুমার রায়ের কবিতা যতই সময় পেরোয়, ততই নতুন লাগে। কারণ, তাঁর ভাষা বইয়ের নয়, রক্তের— বাঙালির জীবনের প্রতিটি তন্তুতে জড়িয়ে থাকা এক চিরচেনা সুর।
স্বল্প জীবনে বিপুল কর্মযজ্ঞ— এই বাক্যটিই যেন সুকুমার রায়ের (Sukumar Ray) জীবনের সারাংশ। মাত্র ছত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু তাঁর কলমের ছোঁয়ায় যে উজ্জ্বল হাস্যরসের জগৎ তৈরি হয়েছে, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান প্রিয়। শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার— এই প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি এক ও অনন্য। আজও।
তাঁর লেখায় শব্দের খেলা, বাক্যের বাঁক, চরিত্রের নাম, সবকিছুতেই এক আশ্চর্য প্রাণপ্রাচুর্য। ‘হযবরল’-এর অদ্ভুত জগৎ, ‘আবোলতাবোল’-এর পাগলাটে ছড়া, কিংবা ‘পাগলা দাশু’-র উদ্ভট বুদ্ধি, সবখানেই সুকুমার যেন হাসির মোড়কে বুদ্ধির ছটায় আলো ফেলেছেন। তাঁর সৃষ্ট ‘রামগরুড়ের ছানা’, ‘বকচ্ছপ’, ‘হাতিমুখো কুমির’, ‘গণ্ডুমুখো ঘোড়া’— এসব শুধু চরিত্র নয়, বাংলা ভাষার রোজকার কথাবার্তার অংশ হয়ে গেছে।
তাই তো গোমড়ামুখো মানুষ দেখলে আমরা আজও বলি— “ও তো রামগরুড়ের ছানা!” কিংবা কথার ফাঁকে যদি কেউ হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ টেনে আনেন, তখন অনায়াসে উচ্চারণ করি, “ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল।”
এইসব বাক্যবন্ধ বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে মিশে গেছে যে, আমরা প্রায় ভুলেই যাই, এর জন্মদাতা ওয়ান অ্যান্ড ওনলি সুকুমার রায়।
তাঁর লেখার সৌন্দর্য এখানেই। শিশুসুলভ কৌতুকের আড়ালে তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন সূক্ষ্ম সমাজবোধ, প্রেম, বিদ্রূপ ও মানবিকতার আলো। যে বুদ্ধিমত্তা, যে পরিশীলন, আর যে সহজাত আনন্দ তিনি শব্দের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা আজও আমাদের মানসিক পরিসরে আলো জ্বালে। বাতাস খেলায়।
মৃত্যুর দোরগোড়ায় বসেও কলম থামাননি 'ননসেন্স' কবি। লিখেছিলেন— “ছুটলে কথা থামায় কে, আজকে ঠেকায় আমায় কে।” যেন মৃত্যুকেও বলছেন, ‘আমায় আটকাতে পারবি না।’ তাঁর মুখেও তাই না ছিল শোকের ছাপ, না ছিল ভয়ের ছায়া। ছিল চিরচেনা সেই প্রশান্ত হাসি। জীবনের শেষ প্রহরেও নির্মল, নির্মোহ, অনাসক্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্ময়ে দেখেছিলেন তাঁর এই তরুণ বন্ধুর মৃত্যুকালীন শান্তি।
আজও সমস্ত প্রেমিকা যে শান্তির দাবি রাখে তার কাছের মানুষের কাছে। আগ্রহ নিয়ে শুনতে চায় 'তোর গানে পেঁচি রে, সব ভুলে গেছি রে!'