শেষ পর্দা নামল ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। শহরের সিনেমাপ্রেমীরা যখন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে এক সপ্তাহের সিনেমা-ভ্রমণ থেকে, তখনও রবীন্দ্র সদনের আলো যেন থেমে থাকতে চাইছিল না।

কার হাতে পুরস্কার?
শেষ আপডেট: 13 November 2025 19:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ পর্দা নামল ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। শহরের সিনেমাপ্রেমীরা যখন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে এক সপ্তাহের সিনেমা-ভ্রমণ থেকে, তখনও রবীন্দ্র সদনের আলো যেন থেমে থাকতে চাইছিল না। উৎসবের শেষ দিনে ফের একবার সেই আলোকমালার মধ্যে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রঙিন সন্ধ্যার মঞ্চে তখন জড়ো হয়েছেন বাংলা সিনেমার তারকারা—অভিনেতা দেব, সাংসদ মহুয়া মৈত্র, সুরকার শান্তনু মৈত্র, পরিচালক অরিন্দম শীল, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষ, হরনাথ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল সেন—আরও অনেকে। আলো, ক্যামেরা আর করতালির ভেতর দিয়ে যেন এক অনন্ত ভালোবাসার আবেশে মোড়া হয়ে উঠেছিল সেই মুহূর্ত।
এদিন কম্পিটিশন অন ইন্ডিয়ান ডকুমেন্টারি ফিল্মস বিভাগে সেরা ছবির সম্মান পেল ‘বিজয়ী যাপনের পটকথা’। পরিচালক জয়দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ছবিই জিতে নেয় বেঙ্গল ইন্ডিয়ান ডকুমেন্টারি ফিল্ম বিভাগের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারও।
এই ডকুমেন্টারিটি বিশিষ্ট আবৃত্তিকার ও অভিনেত্রী বিজয়লক্ষ্মী বর্মনের জীবনের পথচলার এক অনন্য দলিল। জমিদার পরিবারে জন্ম, বাংলাদেশের রংপুরের তাজহাটে কাটানো শৈশব—কিন্তু দেশভাগের অভিঘাতে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ভারতে চলে আসতে হয় তাঁকে। শুরু হয় সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়। সেই ছোট্ট মেয়েটিই পরে হয়ে ওঠেন বাংলা আবৃত্তি ও নাট্যমঞ্চের এক উজ্জ্বল নাম।
১৯৮৫ সালে কিংবদন্তি শিল্পী শম্ভু মিত্র ও সৌলি মিত্রের সঙ্গে ‘দশচক্র’ নাটকে অভিনয়ের বিরল সুযোগ পান বিজয়লক্ষ্মী। এরপর ১৯৯৭ সালে মঞ্চস্থ করেন একক নাটক ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’—যা তাঁকে এনে দেয় নাট্য আকাদেমি পুরস্কার। তাঁর অসামান্য আবৃত্তি-জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমি তাঁকে সম্মানিত করে কাজী সব্যসাচী সম্মানে।

পুরস্কার হাতে বিজয়ী ললিত রাথায়ে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস ক্যাটাগরিতে গোল্ডেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার অ্যাওয়ার্ড পেলেন শ্রীলঙ্কার পরিচালক ললিত রাথায়ে। তাঁর চলচ্চিত্র ‘রিভার স্টোন’ পুলিশ হেফাজতে তথাকথিত গ্যাংস্টারদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার রাজনীতি, রাষ্ট্রের মুখোশ, আর নৈতিকতার জটিল প্রশ্নগুলিকে গভীরভাবে তুলে ধরে।
তিনজন পুলিশ অফিসারকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সিনেমায় দেখা যায়—তারা এমন এক সন্দেহভাজন ব্যক্তির হত্যায় অংশ নিতে যাচ্ছে, যার সঙ্গে তাদের কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। সরকারি নির্দেশ, পদোন্নতির প্রলোভন আর বিবেকের টানাপোড়েন—এই দ্বন্দ্বই ছবিটির মূল সুর। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন ললিত রাথায়ে, সঙ্গে পান ২১ লক্ষ টাকার নগদ সম্মানরাশি।
এই একই বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নেয় ‘টু দ্য ওয়েস্ট ইন জাপাতা’, পরিচালক ডেভিড বিমের নির্মিত এক হৃদয়স্পর্শী গল্প। মেক্সিকোর জাপাতা অঞ্চলের জলাভূমিতে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমে পড়া এক দম্পতির কাহিনি এই ছবি—যারা তাঁদের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে অবিশ্বাস্য সীমা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর ভালোবাসার শেষ আশ্রয়—সব মিলিয়ে ছবিটি এক গভীর মানবিক সুরে বোনা। এই ছবির জন্য ডেভিড বিম পান ৫১ লক্ষ টাকার নগদ পুরস্কার।
উৎসবের সমাপনী পর্ব শুরু হয় ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়ের নৃত্যগোষ্ঠী ‘দীক্ষামঞ্জরী’-র মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায়। নৃত্যে অংশ নেন ডোনা নিজেও—মঞ্চজুড়ে নাচে, সুরে, আলোয় যেন জেগে ওঠে সিনেমার আত্মা। সেই আবেশের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী ফের বললেন তাঁর চিরচেনা বিশ্বাসের কথা—বাংলা সিনেমায় বিনিয়োগের আহ্বান। “হলিউড, বলিউডের হাতে সামর্থ্য আছে ভালো সিনেমা তৈরির,” বললেন তিনি, “কিন্তু কলকাতা তো সংস্কৃতির আঁতুরঘর। যদি এখানে বিনিয়োগ হয়, তবে বাংলা সিনেমা আরও অনেক দূর উড়ে যাবে।”
তাঁর কণ্ঠে ছিল একদিকে আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে আবেগের ছোঁয়া—“আমাদের রাজ্যে আসার জন্য সকলকে ধন্যবাদ। পরের বারও যেন আসেন সবাই।” সেই মুহূর্তে যেন পুরো রবীন্দ্র সদন ভরে উঠেছিল একসঙ্গে করতালি আর কৃতজ্ঞতার সুরে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন উৎসবের প্রকৃত মানে—“বাংলা সবসময় উৎসবে বিশ্বাস করে। মানুষের মেধা, সৃষ্টিশক্তি, এইসব উৎসবের মধ্য দিয়েই ইতিবাচক আলো ছড়ায়। এই সিনেমার উৎসব জনগণের উৎসব, সবার উৎসব।”
আসলে, এই শেষ দিনে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি একরকম অপ্রত্যাশিতই ছিল। তাঁর অন্য একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পুরস্কারজয়ীদের আনন্দ দেখার টান তিনি আটকাতে পারলেন না। তাই নিজের ব্যস্ততার ফাঁকেই এসে পৌঁছলেন রবীন্দ্র সদনে—শুধু সেই গর্বিত মুখগুলোর হাসি দেখতে।