কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো সময়ের নিয়ম মানে না। মৃত্যু সেখানে শেষ কথা নয়, বরং স্মৃতির ভিতর দিয়ে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে ওঠা।

শেষ আপডেট: 20 December 2025 14:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো সময়ের নিয়ম মানে না। মৃত্যু সেখানে শেষ কথা নয়, বরং স্মৃতির ভিতর দিয়ে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে ওঠা। শ্রীময়ী চট্টরাজের (Sreemoyee Chattoraj, Sreemoyee Chattoraj Mullick, Kanchan mullick ) জীবনে ‘দাদু’ ঠিক তেমনই এক নাম—যার চলে যাওয়া মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়, বরং শৈশব, নিরাপত্তা, নিঃশর্ত বিশ্বাস আর নিখাদ ভালোবাসার এক গোটা পৃথিবীকে বিদায় জানানো।
কিছুদিন আগেই জানা গিয়েছিল, জীবনের অন্যতম শক্ত স্তম্ভকে হারিয়েছেন শ্রীময়ী। মেয়ে কৃষভিকে কোলে নিয়ে দাদুর আশীর্বাদ পাওয়ার স্বপ্নটা অপূর্ণই থেকে গিয়েছে—এই আক্ষেপ নায়িকার মনে গভীর ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। আর সেই না-বলা কষ্ট, জমে থাকা আবেগই এবার শব্দ খুঁজে পেল সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুক্রবার দাদুর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের একগুচ্ছ ছবি ভাগ করে নিয়ে শ্রীময়ী যেন খুলে দিলেন হৃদয়ের গোপন দরজা।
দাদু ছিলেন তাঁর কাছে শুধু পরিবারের একজন নয়—একটা শিক্ষা, একটা দর্শন। দাদু-দিদার সম্পর্ক দেখেই শ্রীময়ী শিখেছিলেন জীবন মানে কীভাবে হাত ধরে একসঙ্গে বুড়িয়ে যাওয়া। খুব অল্প বয়সে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল—তখন হয়তো বিয়ের মানে, সংসারের গভীরতা কিছুই বোঝার মতো পরিণত ছিলেন না তাঁরা। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ, যৌবন, বাহ্যিক সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠে এসেছিল দু’টি আত্মার বন্ধন—ভরসা, নির্ভরতা আর বন্ধুত্বের কাঁধে ভর করে বেঁচে থাকার এক অনন্য গল্প।
নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে শ্রীময়ী যেন আবার ফিরে যান সেই ছোট্ট মেয়েটির কাছে। বিয়ে হয়েছে, মা হয়েছেন, অভিনয়ের দুনিয়ায় নিজের জায়গা তৈরি করেছেন—তবু দাদুর চোখে তিনি চিরকালই সেই আদরের ‘গুড়িয়া’। ভালোবেসে এই নামেই ডাকতেন দাদু। দুর্গাপুজো এলেই সবার আগে টাকা পাঠানো, নাতনির আনন্দে নিজে আনন্দ খুঁজে নেওয়া—এ ছিল তাঁর নিয়ম। গুড়িয়া নতুন জামা কিনেছে শুনে খুশিতে ভরে যেতেন তিনি। শ্রীময়ীর প্রতিটি অভিনয়ের কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আশীর্বাদের ফোন আসত দাদুর কাছ থেকে। আত্মীয়স্বজনের সামনে গর্ব করে বলতেন, গুড়িয়া শুধু তাঁর নাতনি নয়—সে তাঁদের নাতি, তাঁদের উত্তরাধিকার।
শ্রীময়ী ও কাঞ্চন মল্লিকের সম্পর্ক যখন চারদিকে বিতর্ক, কটু কথা আর শিরোনামের ভিড়ে বিদ্ধ, তখন দাদুই ছিলেন সেই নীরব ঢাল। সোশ্যাল মিডিয়া না দেখলেও মানুষের মুখে মুখে পৌঁছত নানা কথা। কিন্তু দাদুর বিশ্বাস ছিল অটল—তিনি বলেছিলেন, তাঁর নাতনি কখনও ভুল পথে হাঁটতে পারে না। শ্রীময়ীর বিয়ের সময় শরীরের অসুস্থতায় উপস্থিত থাকতে না পারলেও আশীর্বাদের কোনও ঘাটতি রাখেননি। কাঞ্চনকে ডেকে বলেছিলেন, তিনি খুশি—নাত জামাই পেয়েছেন। একটাই অনুরোধ ছিল, নাতনিটাকে যেন ভালো রাখা হয়। সেই আশীর্বাদ আজও শ্রীময়ীর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
দিদার অসুস্থতার সময় দাদুর উদ্বেগ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ফোন করে বারবার জানতে চাইতেন, দিদা কি সত্যিই সুস্থ হবে? ফিরবে তো? ফিরেছিল দিদা—নতুন করে সংসার করার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই সংসারের আরেক অর্ধেক, দাদুই যে হঠাৎ করে সব ছেড়ে চলে গেলেন।
দাদু প্রায়ই মজা করে বলতেন, দিদা যেন তাঁর আগেই চলে যায়—তিনি নাকি দিদাকে ছাড়া থাকতে পারবেন না। অথচ বাস্তবতা ঠিক উল্টো হল। দিদাকে রেখে চলে গেলেন দাদু। আর কোনও দিন ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠবে না ‘Dadu Calling’। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলেও, যাঁর ক্ষতিটা সবচেয়ে গভীর, তিনি দিদা—শৈশবের সঙ্গী, আজীবনের বন্ধু, একমাত্র নির্ভরতার মানুষটিকে হারিয়ে।
শ্রীময়ীর স্মৃতিতে দাদু আর দিদা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য। আলাদা করে কখনও দেখেননি তাঁদের। একমাথা সিঁদুর পরে দিদা বলতেন, দাদুর জন্যই তিনি বেঁচে আছেন। দাদুও বলতেন, দিদা ছাড়া তাঁর জীবন অসম্পূর্ণ। তাই আজ শ্রীময়ীর মনে একটাই আশঙ্কা—এই বিচ্ছেদ কতদিন সহ্য করতে পারবেন দিদা?
লেখার শেষদিকে শ্রীময়ীর কণ্ঠ আরও নরম, আরও প্রার্থনাময়। দাদুর শান্তির কামনা করে তিনি লেখেন—এই জীবনে যা যা অপূর্ণ থেকে গেল, যেন নতুন জন্মে তার সবটাই পূর্ণ হয়। আর নিজের জন্য রেখে দেন এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি—এই মানুষটিকে কোনও দিন ভুলতে পারবেন না তিনি।
দাদু চলে গিয়েছেন, কিন্তু ভালোবাসা যায়নি। স্মৃতির এক কোণে, হৃদয়ের গভীরে, শ্রীময়ীর জীবনের প্রতিটি ধাপে দাদু রয়ে যাবেন—চিরকাল, নিঃশর্ত, নীরব আলো হয়ে।