দেবের প্রেমিকা অবধি ছিলেন শুভশ্রী। কিন্তু দেবশ্রী ছিলেন প্রসেনজিতের স্ত্রী। প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে আর রিইউনিয়ন করতে চান না দেবশ্রী। ছবি তো দূর। যদি চুমকি আবার পর্দায় বুম্বার বুকে মাথা রাখতে রাজি হতেন তাহলে হয়তো দেব-শুভশ্রীর থেকেও বড় খবর হত।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 August 2025 15:03
'কোন মেয়েটা? সেই মেয়েটা?
সে তো কবেই সরে এসেছে!
বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি
অত কান্ড সামলাবে কে!
মেয়েটা যে গণ্ডগোলের
প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম
কে তাহলে সঙ্গে আছে?
দাদা বৌদি? মা ভাইবোন!
তিন কূলে তো কেউ ছিল না
এক্কেবারে একলা এখন।'
'প্রাক্তন' কথাটা চিরকালই বেদনার। বন্ধু থেকে প্রেম হয়। কিন্তু প্রেম ভেঙে যাবার প্রাক্তন কখনও বন্ধু হয় না। তবে সম্প্রতি এমন মিথ ভেঙে ফেলেছেন এই সময়ের সবথেকে আলোচিত জুটি দেব-শুভশ্রী ( Dev-Subhasree)। এক যুগ পেরিয়ে বহু প্রতীক্ষার পর কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'ধূমকেতু' ছবি মুক্তির আবহে আবার এক হলেন দেব অধিকারী ও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়। তবে এই জুটির মিল দেখে বাংলা ছবির অতীতের আর এক আইকনিক জুটির কথা মনে পড়ছে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও দেবশ্রী রায়ের জুটি।
যদি তাঁরা আবার একসঙ্গে হয়ে ছবি করতেন? কয়েক বছর আগে মাঝে গুঞ্জন উঠেছিল একসঙ্গে ছবি করছেন প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী (Prosenjit Chatterjee-Debasree Roy)। কিন্তু প্রসেনজিৎ রাজি থাকলেও, দেবশ্রী রায় রাজি হন না। তবে এই দেব-শুভশ্রী মিলের সফলতা আর উন্মাদনা দেখে কী প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী জুটি ফিরতে চাইবেন? আজও কী বুম্বার হৃদয়ে চুমকি জ্বলজ্বল করছেন। কেন ভেঙেছিল তাঁদের জুটি? ফিরে দেখা যাক স্বপ্নের জুটির ফেলে আসা সফর।
সে সময় দেবশ্রী রায় কিন্তু প্রসেনজিতের থেকে বড় স্টার। তাপস পাল বা চিরঞ্জিতের সঙ্গে জুটি বেঁধেও দেবশ্রী হিট। ততদিনে অজয় কর, অসিত সেন, অপর্ণা সেনের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করে ফেলেছেন দেবশ্রী। বম্বে-কলকাতায় একসঙ্গে ছবি করছেন। বি আর চোপড়ার 'মহাভারত' সিরিয়ালের সত্যবতী তিনি। অন্যদিকে হার্ডকোর বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা হিসেবে সবার প্রথম পছন্দ দেবশ্রী। তাঁর 'কলকাতার রসগোল্লা' নাচে তখন ফুটছে সারা বাংলা।
অন্যদিকে প্রসেনজিৎ তখন বম্বেতে সফল না হয়ে কলকাতা ফিরেছেন। যদিও বম্বের হিরোইনদের সঙ্গে 'অমর সঙ্গী' বা 'অমর প্রেম' ছবি করে প্রসেনজিৎ সুপারহিট। ১৯৯২ সালে প্রসেনজিৎ নায়ক পরিচালক রূপেও অবতীর্ণ হয়েছেন। ছবির নাম 'পুরুষোত্তম', নায়িকা দেবশ্রী রায়।

আর ডি বর্মণের সুরে অন্যধারার মেনস্ট্রিম ছবি প্রসেনজিৎ করলেও সে ছবি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
'আজ অন্ধকার যতই হোক দূর হবে
এই বন্ধ দ্বার কাঁটাতার চুড় হবে
তুমি আমি দু'জনাতে চলি সাথে ... কীসের ভয়?'
প্রসেনজিতের সব সংকট কেটে গেল দেবশ্রীর প্রেমের প্রলেপে। দুই পরিবারের সখ্যতা বহুদিনের। প্রসেনজিতের বাবা টলি-বলির সুপারস্টার নায়ক বিশ্বজিৎ। কিন্তু প্রথম সংসারকে বিদায় জানিয়ে তিনি বহুকাল দ্বিতীয় সংসার পেতেছেন বম্বেতে। প্রথম স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায় একা হাতে মানুষ করেছেন ছেলে প্রসেনজিৎ আর মেয়ে পল্লবীকে। তাই ছোটবেলা থেকেই বুম্বার স্ট্রাগল।
অন্যদিকে জীবন সংগ্রাম চালাতে হয়েছিল দেবশ্রীর মা আরতি রায়কেও । দেবশ্রীর মেজদি কৃষ্ণা রায় ( রানি মুখোপাধ্যায়ের মা) তখন মহঃ রফির সহগায়িকা প্রায় সব জলসায়। রুমকি-ঝুমকি নামে দেবশ্রী আর তনুশ্রী - দুই বোনের নাচ সব জলসায় হিট। তরুণ মজুমদার 'দাদার কীর্তি' ছবিতে চুমকির নতুন নাম দিলেন দেবশ্রী । ছোট্ট থেকেই বুম্বা-চুমকির বন্ধুত্ব।
তরুণ মজুমদারের 'কুহেলি' ছবিতে বিশ্বজিতের ছোট্ট মেয়ে রাণুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দেবশ্রী। অন্যদিকে 'ছোট্ট জিজ্ঞাসা' ছবিতে বিশ্বজিতের ছেলের রোলেই অভিনয় করেছিলেন ছোট্ট প্রসেনজিৎ। এরপর বড় হবার পর তরুণ মজুমদারের 'দাদার কীর্তি' ছবি দিয়ে দেবশ্রী আর 'পথ ভোলা' ছবি দিয়ে প্রসেনজিতের অভিনয়ের শুরু। পরবর্তীকালে দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ হয়ে ওঠেন আইকনিক জুটি। তখন হিট হতে থাকল দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ জুটির একের পর এক ছবি, 'ঝঙ্কার', 'ওরা চারজন', 'অহংকার'।
ছোটবেলায় সবার সামনেই দু'জনে বর বউ খেলতেন। বালিকা দেবশ্রীর দাবি ছিল-কেন তিনিই সবসময় বউ সাজবেন! বুম্বা কেন বউ সাজবে না?
দেবশ্রীর প্রসেনজিতের বিয়ের গুঞ্জন চলছিল ১৯৮৯ থেকে। বুম্বা মা রত্না চট্টোপাধ্যায়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন 'মা আমি চুমকিকে বিয়ে করতে চাই'! সহাস্যে অনুমতি দেন রত্না। বিশ্বজিতের কাছেও কিন্তু দেবশ্রী খুব পছন্দের ছিলেন। সেই থেকেই গুজব রটতে থাকে প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীর বিয়ের। কখনও বা রটে ওঁদের রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। একবার তো কলকাতার একটি দৈনিকে এই মর্মে খবরও বেরিয়েছিল। আরতি রায় আর রত্না চট্টোপাধ্যায় দুজনেই ফোন করেছিলেন সেই সংবাদপত্রের অফিসে। দেবশ্রী বলেছিলেন 'সব মিথ্যে কথা ,কেন এসব রটানো হচ্ছে?' তবে পাল্টা প্রশ্ন ছিল 'এটা না হয়রটনা! কিন্তু সত্যিকারের ঘটনা কবে ঘটছে?'
১লা মে ১৯৯৪ সালে শুধুমাত্র পরিবারের মধ্যে ছোট করে বিয়ে হয়ে যায় তাঁদের। মাত্র ৪৮ ঘন্টার প্রস্তুতিতে বিয়ে হয়ে গেল টালিগঞ্জের দুই চর্চিত তারকার। পয়লা মে সন্ধেতে বধূ বেশে লাল বেনারসি আর লাল ওড়নায় সেজেছিলেন দেবশ্রী। প্রসেনজিৎ তসরের ধুতি-পাঞ্জাবি। হিন্দু মতে আনুষ্ঠানিক বিয়ে। মালা বদল, সিঁদুর দান, যজ্ঞের আগুনে সাত পাক, আংটি পরানো। এতদিনের প্রেম পূর্ণতা পেয়েছিল বিয়েতে। প্রসেনজিতের পরানো লাল সিঁদুরে ভরল দেবশ্রীর সিঁথি। লজ্জাবস্ত্র মাথায় চুমকির লাজুক মুখ। নাকে সিঁদুর পড়লে নাকি কনে সুখী হয়! কিন্তু দেবশ্রী সুখী হলেন কই?
ঠিক এই বিয়ের পরপর ঋতুপর্ণ ঘোষের 'উনিশে এপ্রিল' একসঙ্গে করলেন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ। সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পেয়ে সাড়া ফেলে দিলেন দেবশ্রী। সবাই বলেছিল, প্রসেনজিতের সঙ্গে বিয়ে করে নাকি দেবশ্রীর ভাগ্য খুলে গেছে। কিন্তু ঘটল উল্টো ঘটনা। সংঘাতে ভেঙে গেল দু'জনের প্রেম।
প্রসেনজিৎ প্রকাশ্যে বলেছিলেন 'আমি সুস্থ জীবন চেয়েছিলাম। সেটা ও দেয়নি। তাই ওর জন্য অপেক্ষা করার পর, আরেক জনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যে আমাকে আবার স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছে। সবাইকে ছেড়েও চুমকির থেকে পেয়েছি অপমান। আমাদের সন্তান চাওয়া নিয়েও মনোমালিন্য ছিল।'
দেবশ্রীর পাল্টা জবাব আমি যখন 'উনিশে এপ্রিল' ছবির শ্যুটিং করছি তখন থেকে বুম্বার সঙ্গে আমার সম্পর্কে চিড় ধরে। শ্যুটিং থেকে ফিরে এসে দেখি বুম্বা আমার আগে চলে এসেছে। আমাকে দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল 'এই তোমার আসবার সময় হল! তুমি ভয়ংকর অ্যাম্বিশাস! তোমার দ্বারা সংসার হবে না।আমার মাথা গরম ছিল শুরু হয়ে গেল ঝগড়া।' হয়ে গেল ডিভোর্স।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-অর্পিতা পালের বিয়ে হল প্রসেনজিতের দ্বিতীয় স্ত্রী অপর্ণার সঙ্গে বিচ্ছেদের ঠিক দু'মাসের মাথায়। তখন অর্পিতার পরিবার মেনে নেয়নি এই বিয়ে। তাই তখন অর্পিতার গায়ে হলুদ হয় প্রসেনজিতের বোন পল্লবীর ড্রয়িংরুমে, পল্লবীর হাতেই। বরযাত্রী নিয়ে প্রসেনজিৎ চলে গেলেন পল্লবীর বাড়ি। সেখানেই হল শুভ পরিণয়। রাতের বেলায় অতিথিদের আনন্দোজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল সেখানেও।
কিছু বছর পরে বিয়ে করলেন অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। সেই বিয়ের বরকর্তা প্রসেনজিৎ আর সব দায়িত্ব নিলেন অর্পিতা চট্যোপাধ্যায়। অভিষেকের বিয়ের রিসেপশনে আমন্ত্রিত ছিলেন দেবশ্রী রায়। সেদিন ঘটে গেল বড় খবর। অর্পিতাই দেবশ্রী রায়ের হাত ধরে নিয়ে এলেন তাঁকে বর-কনের কাছে। অর্পিতা-দেবশ্রীর স্পিরিট দেখে চমকিত হল প্রেস মিডিয়া থেকে অতিথি অভ্যাগত।
মাঝে বড় খবর ছিল শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর নন্দিতা রায়ের হাত ধরে দেবশ্রী রায়-প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত একসঙ্গে ছবি করবেন। কিন্তু তখনও প্রকাশ্যে 'হ্যাঁ' বলেননি দেবশ্রী।
ছবির প্রমোশনের স্বার্থে দেবশ্রী কখনও প্রসেনজিতের মিল করবেন না বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই বলে থাকে দেবশ্রীর বুদ্ধিহীন অহংকার ওঁর কাল হল। কিন্তু 'সাত পাকে বাঁধা' র সুচিত্রা সেনের সেই সংলাপের মতো দেবশ্রী যেন বলছেন 'যা শেষ হয়ে গিয়েছে তাকে কি তোমরা কিছুতেই শেষ হতে দেবে না!'
আসলে দেবের প্রেমিকা অবধি ছিলেন শুভশ্রী। কিন্তু দেবশ্রী ছিলেন প্রসেনজিতের স্ত্রী। প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে আর রিইউনিয়ন করতে চান না দেবশ্রী। ছবি তো দূর। যদি চুমকি আবার পর্দায় বুম্বার বুকে মাথা রাখতে রাজি হতেন তাহলে হয়তো দেব-শুভশ্রীর থেকেও বড় খবর হত। কিন্তু ছবির বানিজ্যিক স্বার্থে কোনও অপেরা করতে আর চান না দেবশ্রী। আদৌ কী এভাবে নেচে গেয়ে প্রথম যৌবনের ক্ষত মেটে? বারবার তাঁর দিক থেকেই না এসেছে। তিনি তাঁর প্রিয় নায়ক তাপস পালকে বলেন। দেবশ্রীর কাছে আজও ইন্ডাস্ট্রি মানে উত্তমকুমার। অথচ প্রসেনজিৎ বলেছেন দেবশ্রী রায় তাঁর দেখা পরিপূর্ণ নায়িকা। যদি এমন হত প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী জুটির ছবি আবার এল শহরে! তবে কেমন হত!