
শেষ আপডেট: 4 November 2023 15:53
বাংলা ছবিতে ৮-এর দশকের পর থেকে আজ অবধি একমাত্র মাচো-লুকের হিরো তিনিই। যাঁর বাবা শৈল চক্রবর্তী হলেন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট, ইলাস্ট্রেটর তথা ইন্ডিয়ান পাপেট্রি'র জনক। তাঁর ছেলে দীপক থেকে হলেন চিরঞ্জিত। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করতেই চিরঞ্জিতের পর্দায় আবির্ভাব। তাঁর বসার ঘরে দেওয়ালে সাজানো তাঁরই আঁকা দারুণ সব ছবি। কিন্তু ছবিতে সই করা দীপক। একাধারে তাঁর দুই সত্ত্বা, দীপক আবার চিরঞ্জিত। জন্মদিনে নিজের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে কেক কাটার পর অকপট আড্ডায় ধরা দিলেন চিরঞ্জিত।। চিরঞ্জিতের সঙ্গে গল্প করলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুভদীপ- চিরঞ্জিত হবার আগেই আপনি তো দীপক চক্রবর্তী নামে বাঙালির অন্দরমহলে স্বপ্নের প্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন। বড়পর্দার আগে দূরদর্শন দিয়েই আপনার জয়যাত্রা শুরু? আরও যেটা চমকপ্রদ, অভিনেতা নয়, আপনি তখন জনপ্রিয় সংবাদ পাঠক। রোজ সন্ধ্যের খবরে মেয়েরা আপনাকে দেখে পাগল হয়ে যেত তো?
চিরঞ্জিত- নিউজ রিডার হিসেবেই ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে যাই কেরিয়ারের শুরুতে। সাতের দশকের শেষ সেটা। কলকাতা দূরদর্শন তখন এলিট ক্লাসের প্রথম পছন্দ। সবাই আমাকে দেখে বলত আমাকে নাকি তৎকালীন বম্বের নায়ক জিতেন্দ্র-র মতো দেখতে। আমি তো শুনেছি বহু বাড়িতেই আমাকে জামাই করতে চাইতেন লোকজন। আমাকে না পেলেও আমার মতো দেখতে কাউকে জামাই করতে চাওয়া হত।
শুভদীপ- দূরদর্শনে আপনার সুযোগ এসেছিল কীভাবে?
চিরঞ্জিত- আমার বাবা শৈল চক্রবর্তী দূরদর্শনে 'পাপেট শো' করতেন। বাবার সহকারী রূপে আমি যেতাম। হরেকরকম্বা, চিচিং ফাঁক এসব অনুষ্ঠানে টুকটাক ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছি। একদিন দূরদর্শন প্রযোজক যূথিকা দত্তর সঙ্গে প্রোগাম নিয়ে কথা বলতে গেছিলাম। কথা বলে বেরিয়ে আসছি, তখন আমাকে ডেপুটি স্টেশন মাস্টার শিপ্রাদি পাকড়াও করেছেন। উনি আমাকে বললেন "আজকে তুমি নিউজ পড়বে?" আমি বললাম "মানে? আমার তো আজ দাড়িও কামানো নেই!" শিপ্রাদি বললেন "তাতে কিছু হবে না, পাউডার লাগিয়ে নেবে।"
আমাকে দেখে স্মার্ট লেগেছিল ওঁদের। কোনও রকম অডিশন, পরীক্ষা ছাড়াই দূরদর্শনে খবর পড়ার সুযোগ পেলাম। আমার ভিতর এমন কিছু অন্যরকম ব্যাপার ছিল বলেই ওঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিলাম, ওঁরা ভেবেছিলেন একে দিলেই কাজটা করে দেবে।
শুভদীপ- বিখ্যাত কার্টুনিস্ট শৈল চক্রবর্তীর ছেলে হওয়াতে টালিগঞ্জ পাড়ায় সুবিধে কতটা হয়েছিল?
চিরঞ্জিত- বাবার হাত ধরেই সত্যজিৎ রায়ের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। মানিকদার ছবিতে অবজারভার হিসেবে পাঁচ-ছ বছর ছিলাম। শুরুতেই সিনেমার দেবতাকে কাছ থেকে পেলাম। আর তখনকার লোকেরাও শৈল চক্রবর্তীর ছেলে বলে জানতেন আমায়।
শুভদীপ- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র আপনি। সত্যজিৎ রায়ের ইউনিটে হাতেকলমে কাজ শিখেছেন। এমন জগৎ থেকে বাণিজ্যিক মশলাদার ছবি করতে এলেন কেন? যদিও আপনি এলেন-দেখলেন-জয় করলেন, কিন্তু সেটা তো কঠিন ছিল।
চিরঞ্জিত- মেনস্ট্রিম ছবির অফার এলেও প্রথমদিকে আমি এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। আমি কিন্তু শুরুতে নায়ক হতে চাইনি, পরিচালক হতেই চেয়েছিলাম। নিজের লেখা স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রযোজকদের কাছে ঘুরতাম। এমনকী মিঠুন চক্রবর্তী হিরো হবে আমার ডিরেকশনে, সেই নিয়ে মিঠুনের সঙ্গে কথাও হয়েছিল। প্রযোজক পাইনি।
নায়ক হওয়ার অফার আসার পর মনে হয়েছিল নিজের স্টারডম এলে সহজেই প্রযোজক পেয়ে যাব। তখন নিজের পরিচালনায় ছবি বানাতে পারব। মেনস্ট্রিম ছবিতে এসে নিজের নতুন নাম চিরঞ্জিত নিলাম। চিরঞ্জিত নাম আমারই দেওয়া। সমরেশ বসু যেমন কালকূট, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম নীললোহিত। উত্তমকুমারের পর আমিই একমাত্র হিরো যে নাম পাল্টে ইন্ডাস্ট্রিতে সুপারস্টার হয়েছি। আর কেউ নয়। পরে দীপক অধিকারী থেকে দেব হল।
শুভদীপ- দীপক মুছে গেল চিরঞ্জিতের জনপ্রিয়তায়?
চিরঞ্জিত- না, মোছেনি। কারণ আমি আজ যখন ছবি আঁকি তখন আঁকা শেষ হলে দীপক বলেই সই করি। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে আমি দীপক। রাজনীতিতে যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিরঞ্জিত নামটাই জনসাধারণের কথা ভেবে ব্যবহার করলেন। দীপক নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করে আর চিরঞ্জিত সবার ইচ্ছে মতো। তবে আমি ভেবেছিলাম দীপক চক্রবর্তী নামে ছবি পরিচালনা করব। সেটা হল না। যখন ছবি পরিচালনায় এলাম প্রযোজকরা চিরঞ্জিত নামই রাখতে চাইলেন। দীপক তো ওঁর স্বপ্নের ছবি বানাতে পারেনি। যে ধরনের ছবি করতে আমি শিখেছিলাম সেরকম ছবি করতে পারলাম না। আসলে সবাই ধরে নেয় চিরঞ্জিত মেনস্ট্রিম ছবিতে অভিনয় করে, সে মননশীল ছবি কী করে ডিরেক্ট করবে?
অপর্ণা (সেন) যখন ওঁর প্রথম ছবি 'থার্টিসিক্স চৌরঙ্গী লেন' বানালেন, সবাই বলতে লাগল সত্যজিৎ রায় বানিয়ে দিয়েছেন। আমি অন্যরকম ছবি 'ভয়' পরিচালনা করেছিলাম কিন্তু ছবিটা বাম্পার হিট হয়নি। দেবশ্রী-চিরঞ্জিতের ছবি বলে পয়সা উঠে এসেছিল, কিন্তু লাভের মুখ দেখিনি। 'ভয়' তো আমাকে নিজের প্রোডাকশনে করতে হয়েছিল। এখন শুনি ছবিটার প্রশংসা। 'ভয়' সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা ছবি ছিল। এখন করলে হয়তো বেশি দর্শক নিত। অথচ ভয় বাদে আমার পরিচালনায় সব কটি ছবি ব্লকবাস্টার হিট। মর্যাদা, সংসার সংগ্রাম, কেঁচো খুড়তে কেউটে এসব ছবি গোল্ডেন জুবিলি, সিলভার জুবিলি করেছে। এখন তো টলিউডে এসব কেউ ভাবতেও পারবে না।
শুভদীপ- আপনার 'ভয়' কি 'Sleeping With Enemy' ছবির থেকে প্রভাবিত?
চিরঞ্জিত- বহু পরিচালক ভাল লাগলে অনেক কিছুর থেকেই প্রভাবিত হন। আমিও তাই করেছিলাম। কিন্তু বাঙালি মোড়কে সেটা করেছিলাম।
শুভদীপ- 'ভয়' দেখেই তো ঋতুপর্ণ ঘোষ আপনাকে 'বাড়িওয়ালি' ছবিতে হিরো হওয়ার অফার দেন?
চিরঞ্জিত- ঋতুপর্ণ আমার পরিচালিত অভিনীত 'ভয়' ছবিটা সিনেমাহলে বসে দেখছিল। সিনেমাহল থেকেই আমায় ফোন করে বলল, "নিজে থেকেই ফোন করলাম। আপনার ছবিটা আমি দেখছি, অসম্ভব ভাল ছবি বানিয়েছেন 'ভয়'। তারপর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তবে বাড়িওয়ালির ডাবিং নিয়ে আমার সঙ্গে পলিটিক্স তো হয়েছিল।
শুভদীপ- আপনার জাতীয় পুরস্কার আটকে দিতেই কি ডাবিং করানো হল?
চিরঞ্জিত- সেটাই। আমি নাকি বেশি ভাল ডাবিং করে ফেলেছি। রোলটা তাতে রোম্যান্টিক হয়ে যাচ্ছে। ঋতুপর্ণ চেয়েছিল দীপঙ্কর বাবুর রোলটা রাফ করতে। আমার ডাবিং অ্যাপ্রুভ হয়ে যাবার পরেও বদলায়। সব্যসাচী চক্রবর্তীকে দিয়ে করায় ঋতু। এটা একটা ছক। কিরণ খেরের রীতা কয়রালের ডাবিং কিরণের নিজের বলে চালানোর চেষ্টা হয়েছিল। আমার রোলটাকে খোঁড়া করে দিতেই যেন ডাবিং হল, যাতে আমি জাতীয় পুরস্কারের বাইরে বেরিয়ে যাই। অনুপম খের ওই একটা বাংলা ছবি করতেই বউকে নিয়ে কলকাতা এলেন। আর এলেন না। জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার জন্য ছক কষে নিয়েছিলেন। তাতে আমার রোলটা খারাপ করে দিল।
তবে ঋতুপর্ণ পরে আমার অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। অপর্ণাও 'চতুষ্কোণ' এর সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন, "চতুষ্কোনে চিরঞ্জিতের অভিনয় তোমরা ভাল বলছ! কিন্তু চতুষ্কোনের থেকেও চিরঞ্জিতের 'বাড়িওয়ালি'তে অভিনয় আমার আরও আরও ভাল লেগেছে।" যাক গে, পাওয়ার মতো কাজ করেও জাতীয় পুরস্কার পেলাম না কী করা যাবে! সিনেমা করে তো আর নোবেল প্রাইজ পাওয়া যায় না।
শুভদীপ- 'শত্রু'র পর অঞ্জন চৌধুরী আপনাকে নিয়ে আর ছবি করলেন না কেন? ওই সময়ে অঞ্জন চৌধুরীর সব ছবিতেই রঞ্জিত মল্লিক, আর তরুণ মজুমদারের সব ছবিতেই তাপস পাল। আপনি তো কোন গডফাদার ছাড়াই একাই বরং বেশি স্টারডম পান?
চিরঞ্জিত- অঞ্জন চৌধুরীর 'শত্রু' খুব বড় একটা ফিল্ম আমার কেরিয়ারে, যা আমাকে সাঙ্ঘাতিক ব্রেক দেয়। তবে সেকেন্ড লিড।
না, আমি কোনও গডফাদার বা একই পরিচালকের ছবির হিরো হতে বারবার ডাক পাইনি। আমাকে ঈশ্বর যা দেন আমি সেটাই নিই। তাতেও আমি তখন নম্বর ওয়ান। 'শত্রু' হিট করলেও অঞ্জন চৌধুরী আমায় কখনও হিরোর রোল দিচ্ছিলেন না। সবসময় আমি সেকেন্ড লিড। হিরো একমাত্র রঞ্জিত মল্লিক। বাকি যারা অভিনয় করেছেন, প্রসেনজিৎ 'শত্রু'তে নেগেটিভ, তাপস 'মেজ বৌ'তে নেগেটিভ। অঞ্জন চৌধুরীরর মেয়েরা ছবিতে লিড হলে সঙ্গে প্রেমিকের রোলে অভিষেক। পজিটিভ হিরো রোল উনি রঞ্জিত মল্লিক ছাড়া কাউকে দিতেন না। আর তরুণ মজুমদার আমায় 'পরশমণি' ছবিতে তাপসের দাদার রোল করার অফার দিয়েছিলেন। দুর্বল রোল বলে করিনি।
শুভদীপ- অপর্ণা সেনের 'সতী' ছবিও তো আপনি ছেড়ে দিয়েছিলেন, যেখানে অপর্ণা সেনের ছবিতে সুযোগ পাওয়াই সবাই ভাগ্যের বলে মনে করে!
চিরঞ্জিত- অপর্ণা ওটাই ভেবেছিলেন, আমি করে নেব কিন্তু আমার ক্ষেত্রে খাটেনি। আমি তখন নায়কের চরিত্র করছি, সেখানে সতীর পুরুষ চরিত্রটা গৌণ চরিত্র। যেটা অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন। এর প্রভাব তপন সিনহার উপরেও পড়েছিল, তাই উনি আমায় নেননি। বুঝেছিলেন চিরঞ্জিত যে কোনও চরিত্র দিলেই করবে না। নামী পরিচালকদের নামে নয়, চিরঞ্জিতের ছবি দর্শক চিরঞ্জিতের জন্যই দেখতে আসে।
শুভদীপ- কিশোর কুমারের বাড়িতে তো আপনার শ্যুটিং করার সৌভাগ্য হয়েছিল এবং কিশোর কুমার ছিলেনও। সেই গল্পটা শুনি?
চিরঞ্জিত- কিশোর কুমার সেদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত এলপিটা রেকর্ড করে ফিরলেন। সেদিন ওঁর ছেলে অমিত কুমার আর আমি 'গায়ক' ছবির শ্যুটিং করছিলাম ওঁদের বাড়িতেই। অমিত অভিনয় করেছিলেন। আমাদের অভিনয়টা পুরো বসে দেখলেন কিশোর কুমার এবং শেষে প্রচন্ড হাততালি দিলেন কিশোরজি। তারপর খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে আমায় বললেন "তুমি বম্বে চলে আসছ না কেন? এত ভাল অভিনয় করো!' আমি বলেছিলাম, "ভাল রোল পেলে নিশ্চয়ই কাজ করব বম্বেতে।" আমি ততদিনে হিন্দি ছবির চারটে রোল রিজেক্ট করেছি।
শুভদীপ- কমার্শিয়াল হিন্দি ছবিতে কাজ করতে ইচ্ছে হয়নি?
চিরঞ্জিত- না। আমার পয়েন্ট একটাই, "Better to rule in Hell, than serve in Heaven" , স্বর্গের প্রজা হবার থেকে নরকের রাজা হওয়া শ্রেয়। টালিগঞ্জের ছোট ইন্ডাস্ট্রির রাজা হয়ে আছি সেটাতেই আমি খুশি। বম্বে থেকে প্রমোদ চক্রবর্তী,শক্তি সামন্ত,সেলিম ছবির অফার দিলেও আমি করিনি। ছোট বা সাইড রোল আমি করব না। অথচ টলিউডের অভিনেতারা তাই করতেই এখন বম্বে যায়। সেখান থেকে তামিল তেলেগু ছবিতে চলে যাচ্ছে। লিড নায়িকাদের পাশে নায়কের দুর্বল উপস্থিতি। তাই করছে যীশু, অনির্বাণরা। পরমকেও আমি বলেছি বম্বের অকিঞ্চিতকর রোল করিস না।
বম্বের থিওরি হল কেউ যদি ছোট রোল একবার করে ফেলে সে আর হিরোর রোল পাবে না। ছোট রোলে স্ট্যাম্প পড়ে যাবে। ফ্লপ নায়কদেরও বলিউড জায়গা দেয় না। বুম্বা (প্রসেনজিৎ) যত বড়ই স্টার হোক এখানে তাকে বলিউডে কিছুতেই মেন রোল দেবে না ছবিতে। কারণ ওঁর হিন্দি ছবি ফ্লপ হয়েছিল আগে। আমি সেলিমকে বলেছিলাম বুম্বাকে নিচ্ছ না কেন ছবিতে? সেলিম বলেছিল "আমরা জিরোকে ছবিতে নিতে পারি, কিন্তু মাইনাসকে নিতে পারি না।" তাপস পালের 'অবোধ', রঞ্জিত মল্লিকের হিন্দি ছবি 'পরিবর্তন'- সবই ফ্লপ। এরা কেউই থাকতে পারেনি, একটা ছবি করেই আউট। এই মাইনাসদের উপর বলিউড আর লগ্নি করে না,লিড রোল দেয় না। এইটা কিন্তু আমার নামে আর সৌমিত্রদার নামে বলা যাবে না। আমরা বম্বেতে সেকেন্ডারি রোল করিনি।
শুভদীপ - আপনি বলেছেন আপনি সরে গেলেন বলেই প্রসেনজিৎ এক নম্বর হতে পারলেন?
চিরঞ্জিত- এটা একদম ঠিক কথা। তবে আমি এটাও বলব বুম্বার ক্ষমতা আছে প্রচুর। আমি ২০০০ সাল থেকে সরে যাওয়ার পর তারপর এই ২৩ বছর ওঁর। আমি জানি না পারিশ্রমিকে দেব-জিৎ-প্রসেনজিৎ, কে এগিয়ে। কিন্তু নামে-ভারে বুম্বা ঠিক জায়গায় আছে।
শুভদীপ- ইন্ডাস্ট্রিতে চিরঞ্জিতের জীবনে তো কোন স্ক্যান্ডেলের দাগও নেই?
চিরঞ্জিত- কম বিয়ে করেছি আমি, ওই জন্যে (হাসি)। একটা বউ আছে থাক। আবার বউ এনে ঝামেলার কী দরকার! এতে ক্রেডিট দেবার খুব কিছু নেই। জীবনের আদর্শ শিক্ষা থেকে নড়তে পারিনি। রঞ্জিতদাও তাই।
শুভদীপ- আপনি বলেন এখন বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কোনও স্টার নেই?
চিরঞ্জিত- সুচিত্রা সেন ৬২ বছর আগে একটা ছবিতে ২ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। সেই পারিশ্রমিক এখন সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি হবে। এখন একজন হিরোইন পাঁচ লাখ পান। কোথায় সাড়ে তিন কোটি আর কোথায় পাঁচ লাখ। এখনকার দর্শক সেসব জিনিস দেখেনি। আমারই তো 'অন্তরালে' উজ্জ্বলাতে রিলিজ করেছে, শো দেখে যখন বেরোচ্ছি, আমি বেরোতে পারছি না। লোকের ভিড়ে ট্রাফিক জাম। পুলিশ এনে ভিড় সরাতে হল। সেই ভিড় কিন্তু এখনকার দেব জিৎদের ফেস করতে হয় না। এখন সবটাই প্রমোশানাল। আমাদের সময় ছবির এত প্রমোশন ব্যাপারটাই ছিল না। তবু সিঙ্গেল স্ক্রিন তিনটে শোয়ে একটা বাংলা ছবি হাউসফুল। স্টার নেই কারণ এখনকার হিরোরা নিজেরাই নিজেদের প্রোডাকশনের ছবিতে হিরো হন। এখন হিরোদের নিজেদের ফ্যানক্লাব থাকলেও মাস অডিয়েন্সের ভিড় নেই। আগে সিলভার জুবিলি কথা ছিল, এখন যেটা নেই।
শুভদীপ- আপনার সময়ে আপনি একমাত্র যিনি পাবলিক থিয়েটারেও সুপারহিট হিরো, যে ভাগ্য আর কারও হয়নি। আপনার কাছে আপনার সেরা নাটক কোনটা?
চিরঞ্জিত- নাগপাশ। ৭৫০ রজনী চলেছিল। সুপার সুপার হিট। ঘরজামাইও সুপারহিট ছিল। পুজোর সময় একদিন সকালবেলাতেই পুরো হাউজফুল হয়ে গেছিল। ভোর চারটে থেকে লোকে লাইন দিয়েছিল পুজোর দিনে। জমানাটাই অন্য ছিল।
শুভদীপ- বাংলা প্রবাদ তো পরিচালক চিত্রনাট্যকার পাল্টে দিয়েছেন। 'কেঁচো খুড়তে সাপ'কে করে দিলেন 'কেঁচো খুড়তে কেউটে'।
চিরঞ্জিত- সিনেমা বাংলা প্রবাদকেও বদলে দিল, সেরকম ছবি আমার ছবিই প্রথম আমার ছবিই শেষ। আর কেউ পারেনি। বাংলা ভাষার শব্দকোষে নতুন প্রবাদ এনে দিলাম 'কেঁচো খুড়তে কেউটে'। এগুলো অনুপ্রাশ। কে কে কে। লোকে যে ছন্দের মজাটা নেবে সেটা আমি বুঝেছিলাম।
শুধু তাই নয়, আট থেকে আশির ছবি কথাটাও আমি এনেছি। আমার বলা আমারই লেখা সংলাপ "বউ হারালে বউ পাওয়া যায়, কিন্তু মা হারালে মা পাওয়া যায় না'। প্রজন্মের পর প্রজন্ম হিট। যারা 'মর্যাদা' ছবিও দেখেনি সেই বিশাল সংখ্যক মানুষের আমার সংলাপ মুখস্থ। এরকম রেকর্ড প্রসেনজিতের কেন, উত্তমকুমারেরও নেই। বাংলাতে আর কারওর সংলাপ এমন হিট নয় যা সবার মুখস্থ। উত্তমকুমারের সংলাপ অবশ্যই আছে কিন্তু ভেবে বলতে হবে লোককে।
শুভদীপ- আপনার কয়েকজন নায়িকার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার মতামত কী? বেদের মেয়ে জোসনা অঞ্জু ঘোষ দীর্ঘ কুড়ি বছরের বেশি কাজ পান না, মাচা করতে হয় অসুস্থ শরীরে। কেন এই পরিণতি?
চিরঞ্জিত- যে উচ্চতায় অঞ্জু উঠেছিল সেটা ছাড়াতে পারল না বরং অনেক নীচে নেমে গেল। আমি বেদের মেয়ে জোসনার পরেও বহু সুপারহিট ছবি করে গেছি ছবি ডিরেক্ট করেছি। অঞ্জু ঘোষের সাফল্য ১০০ থেকে ২০তে চলে এল।
শুভদীপ- প্রসেনজিতের সঙ্গে দেবশ্রী রায়ের বৈবাহিক বিচ্ছেদ। দেবশ্রীর ইন্ডাস্ট্রি থেকে সরে যাওয়া কি উচিত হয়েছিল?
চিরঞ্জিত- সরে যায়নি। দেবশ্রী ভাল কাজের ডাক পায়নি। খেলাটা খেলতে হবে ভাল, কিন্তু খেলার মাঠটা তো পেতে হবে। দেবশ্রী রায় একটা ব্র্যান্ড ছিল, কিন্তু ছবি করতে দেওয়া হয়নি তাকে বেশি।
শুভদীপ- শতাব্দী রায় আর রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, আপনার দুই নায়িকা, হিরোইন হিসেবে না রাজনীতিবিদ হিসেবে বেশি এগিয়ে?
চিরঞ্জিত- আমার ধারণা একই রকম দুজনে দুক্ষেত্রে। খারাপ কিছু না। তবে নায়িকার সুপ্রিম জায়গাটা এরা কেউই পায়নি। যেটা দেবশ্রী পেয়েছিল। তারপর ঋতুপর্ণার আছে। ঋতুপর্ণার পরে যে ব্যাচটা আছে সেখানে কে সেরা এটা আর বলা যাচ্ছে না।
শুভদীপ- আপনার পরনের এই হাত কাটা লম্বা ঝুল পাঞ্জাবি, এ তো দারুণ বিরল স্টাইল!
চিরঞ্জিত- পাঞ্জাবি ফুল হাতা বা হাফ হাতা পরলে মনে হত বেশি গরম লাগে। তাই মনে হল পাঞ্জাবির হাতা দুটো ফেলে দিলে কেমন হয়। 'প্রতীক' ছবিতেও আমার হাতকাটা জ্যাকেট বিখ্যাত। তাই এমন পাঞ্জাবি পরতে ভালবাসি। কিন্তু এই স্টাইল কেউ নকল করল না। হাতকাটা পাঞ্জাবির ফ্যাশন ট্রেন্ড মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হল না। পুরুষরা পরেই দেখুন না। হয়তো সবাই সাহস পান না পরার।
শুভদীপ- এবারের জন্মদিনে নিজের জীবন সফর নিয়ে কী বলবেন?
চিরঞ্জিত- জীবনটা বেশ ভালোই কাটালাম। কেরিয়ারে সাফল্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনেও আমি খুশি। সংসার জীবন ভাল কাটালাম। আমি আমার মেয়ে হোক চেয়েছিলাম, তাই হল। মেয়ে বিজ্ঞানী। নাতনিও হয়েছে। মেয়ে ফিল্মে আসেনি, ভালই করেছে। ফ্লপ নায়িকা হলে সারা জীবন মন খারাপ করে থাকত। ফিল্ম জগতে সবাই এক নম্বর হয়ে টিকে থাকতে পারে না।
শুভদীপ- ডিরেক্টর চিরঞ্জিতকে আমরা আবার কি পাব?
চিরঞ্জিত- আমার কাছে একটা মজার গল্প ভাবা আছে। সেটা করতে চাই। এখন তো কমেডি ছবি দেখাই যায় না। ছবিতে মজাটা লোকে পাচ্ছে না। পুরো ছবিতেই একশো শতাংশ লোক হাসছে আর থামে না, সেটা দেখার মতো। যা আমার 'ঘর জামাই' থিয়েটারে হত। 'কেঁচো খুড়তে কেউটে'তে হত। সেরকম কিছু করতে চাই আজও।
কৃতজ্ঞতা - মৃন্ময় কঞ্জিলাল
চিরঞ্জিতের এক্সক্লুসিভ ছবি সৌজন্যে শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়