শঙ্খধ্বনি দিয়ে শুরু সেই আত্মশুদ্ধি। রবীন্দ্রসদন মঞ্চ থেকে সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ভেসে আসছে 'আশ্বিনের শারদ প্রাতে, বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত, জ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমন বার্তা৷'

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 14 September 2025 14:15
দ্য ওয়াল মিউজিক রিভিউ :
তব জয় গানে ২৫
নিবেদনে - সহায় ফাউন্ডেশন
'দেবী প্রপন্নার্ত্তিহরে প্রসীদ,
প্রসীদ মাতর্জ্জগতোহখিলস্য।
প্রসীদ বিশ্বেশ্বরী পাহি বিশ্বং,
ত্বমীশ্বরী দেবি চরাচরস্য।।'
শারদপূজার আচমন মহালয়ার দিন শুরু হয় আকাশবাণীর যে প্রভাতী অনুষ্ঠান দিয়ে ...
'মহিষাসুরমর্দিনী'। উৎসবের সূচনা হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত ও বাণীকুমারের লেখা কথা দিয়ে। তবে এবার মহালয়ার আগেই লাইভ মঞ্চস্থ হল 'মহিষাসুরমর্দিনী'। আধো ঘুম, আধো জাগা ভোরের সেই রেশ, সেই পুজোর আবেগ উঠে এল 'সহায় ফাউন্ডেশন' আয়োজিত 'তব জয় গানে ২৫' অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল 'তব জয়গানে ২৫' শীর্ষক অনুষ্ঠান। দেবীপক্ষের সূচনা হল মঞ্চ থেকেই। শুরুতেই ছিল শত কণ্ঠে আবাহনী ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আমার দুর্গা'র পরিবেশনা। সাদা লাল পাড় শাড়ি আর লাল পাঞ্জাবিতে নানা প্রান্তের বাচিকশিল্পীরা একত্র হয়ে শতকণ্ঠে আবৃত্তি করলেন যা অভিনব।
পুজো মানেই পুজোর বৈঠকী আড্ডা। এবার মঞ্চে সেই বৈঠকী আড্ডার সূচনা হল শ্রাবণী সেনের কণ্ঠে শারদোৎসবের রবিগান 'অমল ধবল পালে লেগেছে' গান দিয়ে। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'উৎসব' ছবিতে এই গান গেয়েই প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন শ্রাবণী সেন। ২৫ বছর পর সেই একই মুগ্ধতা তৈরি করলেন শ্রাবণী। পুজোর আধুনিক গান একসময় বাঙালির নস্টালজিয়া ছিল বললেন সূত্রধর অলোক রায়চৌধুরী। তিনি শোভন গঙ্গোপাধ্যায়কে বললেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় রতু মুখোপাধ্যায়ের সুরের একখানি গান গাইতে। শোভন অসাধারণ গাইলেন মুকেশের সেই গান 'ওগো আবার নতুন করে ভুলে যাওয়া নাম ধরে ডেকো না, হারানো স্বপন চোখে এঁকো না'। অলোক রায়চৌধুরী নিজের মৌলিক গান শোনালেন 'মাটির ওপর শিউলি ফুলের আলপনা'। বিদুষী হৈমন্তী শুক্লা-কে ছাড়া কী পুজোর গানের বৈঠকী আড্ডা জমে? রবীন্দ্র জৈনের সুরে হৈমন্তী গাইলেন 'মাগো ডাকি তোমায় সারা বছর ধরে, এসে চলে যাও তুমি ক্ষণিকের তরে'। শ্রাবণী সেনের গলায় আবার শারদীয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করল 'আমার রাত পোহাল, শারদপ্রাতে'। শচীন দেব বর্মণের সুরে অখিল বন্ধু ঘোষের 'যেন কিছু মনে কর না, কেউ যদি কিছু বলে' চমৎকার গেয়ে শোনালেন এ যুগের শোভন গঙ্গোপাধ্যায়।

এদিন আবার ছিল কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যর জন্মদিন। তাঁর সুযোগ্য শিষ্যা পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুকে স্মরণ করে গাইলেন জমাটি লোকগান। তবে পৌষালী কিন্তু আসলে শান্তিনিকেতনে পড়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। কালিকাপ্রসাদের হাত ধরে লোকগানে আসেন। এই প্রথম এই পুজো আড্ডায় লাইভ রবীন্দ্রসঙ্গীত 'সখী ভাবনা কাহারে বলে' গাইলেন পৌষালী। তবে অনুষ্ঠান সবথেকে জমাল অলোক রায়চৌধুরীর নিবেদনে প্যারোডি গান 'গুল সবই গুল'। 'অতল জলের আহ্বান' ছবির 'ভুল সবই ভুল' গানকে 'গুল সবই গুল' বলে প্যারোডি করে গেয়েছিলেন মিল্টু দাশগুপ্ত। সেই হারানো দিনের মজা এল অলোক কণ্ঠে। হৈমন্তী শুক্লার কণ্ঠে মন ভরিয়ে দিল 'অখিল বিমানে তব জয়গানে যে সামরব বাজে'। এই গানই তো 'তব জয়গানে ২৫' অনুষ্ঠানের শীর্ষগান।
অনুষ্ঠানের মধ্যভাগে আকর্ষণ ছিল মৌনিতা চট্টোপাধ্যায় ও সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের যৌথ নিবেদন 'দুর্গোৎসব'। ষষ্ঠী থেকে দশমী পুজোর অন্তরালের পৌরাণিক কাহিনিকে দুর্দান্ত ভাবে উপস্থাপনা করলেন সৃজন-মৌনিতা ও তাঁদের দল। ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীর রাবন বধের বিজয় উঠে এল সৃজনের অনবদ্য অভিনয়ে। মৌনিতা লাল ঢাকাই পরে উমা জননী মেনকার চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় ও পাঠ করলেন। তেমনই তাঁর সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত দিলেন দক্ষরাজের চরিত্রে সৃজন। সব প্রদেশে দুর্গাকে এসময় একা পূজিতা হন। কেবলমাত্র বাংলায় দুর্গা আসেন পরিবার সমেত। মেয়ের জন্য মা মেনকার উতল হওয়া ফুটিয়ে তুললেন মৌনিতা। শুধুমাত্র সঞ্চালিকা নয়, মৌনিতা যে অভিনেত্রী হিসেবেও এগিয়ে তা টের পাওয়া গেল। তেমনই পুজোর পাঁচ দিনের পৌরাণিক কাহিনি উপস্থাপনায় দুর্ধর্ষ সৃজন চট্টোপাধ্যায়।

তৃতীয় অঙ্কে ছিল সেই মূল আকর্ষণ 'মহিষাসুরমর্দিনী'।চিরকাল রেডিও থেকে ইথার তরঙ্গে ভেসে এসেছে এই প্রভাতী পূজা। এবার মঞ্চে হল তা লাইভ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর কণ্ঠ সেই রেশ সেই আবেগ সেই মায়া প্রস্ফুটিত হল সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। এমন কঠিন পরিচালনা কী চমৎকার ভাবে করেছেন সৃজন। একাধারে চণ্ডীপাঠ থেকে সংগীত পরিচালনা সবেতেই সৃজন অনবদ্য। পঙ্কজকুমার মল্লিকের পর সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের এই মহিষাসুরমর্দিনীর উপস্থাপনা বৈপ্লবিক।
শঙ্খধ্বনি দিয়ে শুরু সেই আকাশবাণীর আত্মশুদ্ধি।
রবীন্দ্রসদন মঞ্চ থেকে সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ভেসে আসছে 'আশ্বিনের শারদ প্রাতে, বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত, জ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমন বার্তা৷' শারদপূজার আচমন সৃজনের কণ্ঠে সার্থক রূপ পেল। দ্বিজেন, উৎপলা, সুপ্রীতি, শিপ্রা,শ্যামল, সন্ধ্যার সেইসব কাল্ট গান গাইলেন এখনকার শিল্পীরা।

দেবাদৃত চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে 'জাগো দুর্গা', তৃষ্ণা পাড়ুই-অরিত্র দাশগুপ্তর 'শুভ্র শঙ্খ রবে', অরিত্রর একক 'তব অচিন্ত্য' মন ছুঁয়ে গেল। 'অখিল বিমানে তব জয় গাঁথা', 'বিমানে বিমানে', 'মাগো তব বিনে সঙ্গীত' গানগুলি শিল্পীদের কণ্ঠে শাস্ত্রীয় রাগের ললিতকলা ছড়িয়ে গেল। নজর কাড়ল দুই যমজ ভাইয়ের সংগীত পরিবেশন। যা বেশ বিরল।
তবে সবথেকে প্রশংসাপ্রাপ্য কোরাস গায়ক-গায়িকাদের। 'মহিষাসুরমর্দিনী'-র বেশিরভাগ গান কোরাসেই করেছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। 'অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরাম্যহম্' থেকে '
জটাজূটসমাযুক্তামর্ধেন্দুকৃতশেখরাম্' প্রতিটি সমবেত গানে দেবী চণ্ডিকা যেন মঞ্চে আবিভূর্তা হলেন। রূপক নিয়োগীর প্রচার পোস্টার ডিজাইন নজরকাড়া।

তবে তবলা সঙ্গত ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ ক্লাসিক সঙ্গীতগুলোর তাল কাটছিল বারবার। শেষে যদিও দর্শকদের মহালয়ার গঙ্গাস্নাত হয়ে গেল
সৃজনের পাঠ ও সমবেত গানে ...
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ...
ছবি রানা বন্দ্যোপাধ্যায়