
শেষ আপডেট: 26 June 2022 17:21
অনেকদিন পর কথা হচ্ছে তোমার সঙ্গে। কোনও ফিল্ম বা সিরিজ না এলে আজকাল তোমাকে পাওয়া যায় না। কেন?
সত্যি অনেকদিন পর কথা হচ্ছে। কাজ না এলে বিশেষ কথা বলতে ইচ্ছে করে না আজকাল। আসলে যা বলি, তাই দেখি ঘুরিয়ে অন্য মানে করে পাবলিশ করছে মিডিয়া। ভুলভাল হেডলাইন দিয়ে ইচ্ছেমতো লিখছে। ঠিক করেছি কাজের বাইরে আর কথা বলব না। তাছাড়া কাজের চাপও আছে।

মুম্বইতে জমি পাকা করতে খুব স্ট্রাগল করছো?
জমি পাকা কিনা জানি না, তবে ওখানে কাজের ধারা বেশ আলাদা। আর কাজ পাওয়ার জন্য কম্পিটিশন তো আছেই। ভাল কাজ করার খিদে আছে। তাই খাটছি। হিন্দি ভাষা নিয়েও একটু চাপ আছে। স্ক্রিপ্ট খুব মন দিয়ে ফলো করতে হয়। হিন্দির জেন্ডার প্রবলেমটা এখনও চট করে সলভ করতে পারি না (হাসতে হাসতে)।

মুম্বইতে থাকলে বেশির ভাগ সময়ে তোমার ফোন আউট অফ রিচ থাকে, কেন?
আসলে এখন মুম্বইতে অ্যাড কনটেন্ট বলো বা সিরিজের কাজ বলো, সব একবারেই শ্যুট হয়। মানে ডাবিংযের কোনও ব্যাপার নেই। ফলে শ্যুটের সময় সাইলেন্স মানে সাইলেন্সই। খুব সতর্ক থাকতে হয় সবাইকে। কাজের সময় কেউ ফোন কাছে রাখে না। আমিও ভ্যানিটি ভ্যানে রেখে ফ্লোরে যাই। সারাদিন কাজের পরে ফোনে হাত দিই। দেখি গাদা হোয়াটসঅ্যাপ এসেছে। তখন আর খুলে পড়ার ধৈর্য থাকে না। পরে উত্তর করব বলে রেখে দিই। আর হয়ে ওঠে না। (হাসতে হাসতে) বন্ধুরা খুব রাগ করে। তুমিও রাগ করো।

না না আমি জানি তোমার ব্যস্ততা। একটা নতুন কথা জানলাম, এখন ডাবিং হয় না মুম্বইতে?
খুব বড়সড় ফিল্মে হয়, কিন্তু ছোট কাজে হয় না। কম বাজেটের ছবি, শর্ট ফিল্ম, সিরিজ শো, অ্যাড ফিল্ম-- সব সিঙ্ক সাউন্ড, একেবারে শ্যুট হয়ে যায়। তাই খুব চাপ থাকে। একবারে সঠিক ডায়ালগ আর ঠিকঠাক এক্সপ্রেশন চাই। কারেকশনের কোনও সুযোগ নেই। সেটে মোবাইল অ্যালাউডই নয়।

তোমার মেয়ে অন্বেষা তো মুম্বইতে পড়াশোনা করছে?
করছিল। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে গেছে। এখন হায়ার স্টাডির জন্য ইউকে যাবে। তার প্রস্তুতি চলছে। আমিও যাব, ওকে সেট্ল করে দিতে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যাওয়া। ভিসার জন্য দৌড়োদৌড়ি চলছে। তার মধ্যেই 'শ্রীমতি'র রিলিজ। প্রোমোশনের জন্য কলকাতায় কয়েকদিন আছি। পরের সপ্তাহে অসম যাব, শ্যুট আছে। বেসিক্যালি জানুয়ারি থেকেই খুব হেকটিক যাচ্ছে। শ্যুটের জন্য কাশ্মীর গেলাম, দিল্লি গেলাম, ব্যাঙ্গালোর গেলাম। আর মুম্বইতেও কাজ ছিল। সব মিলিয়ে বেশ ঘেঁটে আছি। তার মধ্যেই তো মেয়ের, আমার ভিসার জোগাড়যন্ত্র চলছে।

৮ জুলাই 'শ্রীমতী' রিলিজ তো?
হ্যাঁ। একেবারে অন্য ধরনের ছবি করেছে অর্জুন (পরিচালক অর্জুন দত্ত)। আমিই শ্রীমতী। ঘরকন্না করতে ভালবাসি। স্বামী, সন্তান, শাশুড়ি, ননদ নিয়ে জমজমাট সংসার। সক্কাল থেকে তাদের নিয়েই শ্রীমতীর ব্যস্ততা। যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সে কখনও চাকরি করার কথা ভাবেনি, সংসারই তার ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু সংসারের মানুষগুলো কি তার মতামতের আদৌ কোনও মূল্য দেয়? আর সমাজ?

আমাদের এই থার্ড ওয়ার্ল্ড কানট্রিতে মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে তাদের গুরুত্ব নেই, তাই না?
ঠিক তাই। টাকা রোজগার না করলে মেয়েদের বোকা, আনস্মার্ট, কোনও কম্মের নয়, বলে মনে করা হয়। তাঁদের মতামতের কোনও গুরুত্ব নেই। এই যে উইমেন লিবারেশন, উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট, ফেমিনিজম, জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি-- এই সব নিয়ে এত সেমিনার, এত ডিবেট, এত টক শো হচ্ছে, কোথাও কি বক্তা হিসেবে কোনও হোমমেকারকে ডাকা হয় এখানে? হয় না। যাঁর গৃহিণীপনায় গৃহকোণ সুখের হয়, তাঁকেই হেলাফেলা করা হয়। সেই জায়গা থেকেই 'শ্রীমতী'র গল্প শুরু। খুব নতুন ধরনের ভাবনা ও প্রেজেন্টেশন।

তোমার আশপাশে কি তুমি এই শ্রীমতীদের দেখেছো?
আমার বড় হয়ে ওঠাটাই তো শ্রীমতীদের কাছে। মা, মাসি, দিদা, ঠাকুমা-- সবাইকে দেখেছি কী নিপুণ হাতে সংসারের সব ঝড়-ঝাপটা সামলেছেন। রূপে-গুণে তাঁরা সবাই এক সে বড়কর এক শ্রীমতি। আমার মা তো ঘরে-বাইরে সব কাজ হাসিমুখে সামলাতেন। বাবার, আমার ফিনান্সিয়াল দিকটা মা-ই দেখতেন। আবার বোন যখন আমদাবাদে পড়তে গেল, তখন ওর সব ডকুমেন্টস গুছিয়ে নেওয়া, আমদাবাদের কলেজে ভর্তি করা, ওখানে ভাড়াবাড়ি জোগাড় করে বোনকে সব গুছিয়ে দিয়ে আসা, সব তো মা একাই করেছে। মা তো ফ্লুয়েন্টলি হিন্দি বা ইংরেজি বলতেও পারত না। তবু তো তার অসুবিধে হয়নি। সে করেছে। কাজেই হোমমেকারদের আনস্মার্ট বা বোকা ভাবার মানে হয় না।

,হোমমেকারদের বোকা ভাবাটা কি একেবারে এই সময়ের মানুষজনের ভাবনা বলে তোমার মনে হয়?
একেবারেই তাই। আমার মনে হয় 'এই সোশ্যাল মিডিয়া প্রজন্ম' এটা মনে করতে শুরু করেছে কিছু বছর আগে থেকে। আমরা কিন্তু মা-মাসিরা চাকরি করে না বলে তাদের গুরুত্বহীন মনে করিনি। বরং তাদের পরামর্শ মেনে চলেছি। সত্যি বলতে কী, আমাদের মায়েরাই তো আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, সভ্যতা-ভদ্রতা শিখিয়েছেন। আমরা তাঁদের সমীহ করতাম, শ্রদ্ধা করতাম। তাঁরা নিজেরা রোজগার করেন কিনা, ইংরেজি বলতে জানেন কিনা, স্মার্ট কিনা-- এই সব চিন্তা আমাদের মাথাতেই আসত না। মাকে নিয়ে আমাদের বেশ গর্ব ছিল।

এমনও তো অনেকে আছেন, যাঁরা চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিজের ইচ্ছেতেই শুধু সংসার করেন?
আমারই অনেক বন্ধু আছে যারা চাকরি করত, এখন ছেড়ে দিয়ে চুটিয়ে সংসার করছে, ছেলেমেয়ে মানুষ করছে। বিন্দাস আছে। যাকে বলে সুখী গৃহবধূ। এখানেও আমার একটা বক্তব্য আছে। অনেক সিনেমা, টেলিফিল্ম, নাটকে এক ধরনের মহিলা চরিত্র থাকে, যিনি সংসারের জন্য চাকরি ছেড়েছেন বা কখনও নিজে উপার্জন করেননি। তাঁদের সব সময় দুঃখী, অবসাদে ভুগছেন, তাঁর বেঁচে থাকাটাই বিড়ম্বনা-- এই ভাবে প্রোজেক্ট করা হয়। আবার কাউকে বিদ্রোহিনী দেখানো হয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এই রকম আর কী। যদি পরিবার পালনের জন্য চাকরির দরকার না থাকে তাহলে কোনও মেয়ে নিজের খুশিতে শুধু ঘরকন্না সামলে মনের আনন্দে থাকতেই পারে। তাতে তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবা ঠিক নয়।

এই মন্তব্যে তোমাকে অনেকে ভুল ভাবতে পারে। তুমি মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চাও না-- এমন ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে।
মানুষের ভুল ভাবার তো শেষ নেই। বিশেষ করে আমার ক্ষেত্রে। আমি সব সময় চাই মেয়েরা কাজ করুক। অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাধীন হোক। কিন্তু কেউ যদি নিজের ইচ্ছেতে বাইরের কাজ করতে না চায়, তাহলে তাকে জোর করাটাও তো একটা প্রেশার। ধরো পাঁচ বছর পর আমার মনে হল, অনেক কাজ করেছি, এবার বছরে একটা কাজ করব, আর বাকি সময়টা ঘুরব ফিরব নিজের মতো কাটাব। এমন ইচ্ছে তো মানুষের হতেই পারে। তাই না?

আর একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে, ইন্ডাস্ট্রিতে অবসাদ, আত্মহত্যা বাড়ছে। কেন?
প্রথম এবং একমাত্র কারণ সেল্ফ অ্যাসেসমেন্ট করতে না পারা। আমি কী কাজ করছি, সেটা কতটা ভাল করছি, সেটাই আসল। আমি একটা সিরিয়াল করতে এলাম, দর্শক আমার চরিত্রর নামটা জানে, সেই নামে ডাকে, আমি কে তাই জানে না, আমার ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের কোনও পরিচিতিই হয়নি, অথচ আমি ভাবছি আমি বিরাট স্টার। এখানেই বিপদ। কোনও পার্টিতে বা প্রিমিয়ারে দেখেছি, এই সব জুনিয়র আর্টিস্টদের হাতে আড়াই লাখ টাকার ব্র্যান্ডেড ব্যাগ বা পায়ে যে ব্র্যান্ডের শু, যার দাম তিন লক্ষ থেকে শুরু। কী করে সম্ভব!

তারপর ইএমআইয়ের বোঝাও তো কম নয়?
সিরিয়াল চার মাস ভাল রান করলেই দামি অ্যাপার্টমেন্ট, অডি গাড়ি-- কেন? কেউ তো এমন স্ট্রেস নিতে বলেনি। আজ সিরিয়াল চলছে, কাল তো শেষ হবে। তখন যাতে কোনও অসুবিধে না হয় তার জন্য জমাতে হবে। আমার তো এখনও কোনও ফ্ল্যাট নেই। বাবার বাড়িতে থাকি। তাতে কী এসে গেল? আমার কাজেই তো আমার পরিচয়। বাড়ি-গাড়িতে নয়। বাবা সব সময় বলতেন, 'এই কাজ যদি করতে চাও, দূরের দিনের কথা ভেবে চলবে। আজকের সাকসেসই সব নয়। মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে হবে।' বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলি।

জানি, তুমি তো বাবার (প্রয়াত অভিনেতা সন্তু মুখোপাধ্যায়) শেষ সময়েও শ্যুট শেষ করেছো।
বাবাও তাই করেছিলেন। দাদুর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরও শ্যুট শেষ করেছিলেন। বাবাই আমায় পথ দেখিয়েছেন। মূল্যবোধ তৈরি হওয়া খুব জরুরি। দেখানেপনা দিয়ে নিজের পরিচিতি তৈরি করা যায় না এটা বুঝতে হবে এ প্রজন্মকে।

আবার 'শ্রীমতি' প্রসঙ্গে আসি, এই ফিল্মের ইউএসপি কী? কেন দর্শকের ভাল লাগবে?
'শ্রীমতি' আমাদের খুব কাছের মানুষ, খুব চেনা চরিত্র। তার সোহাগে, আদরে সংসার সুখের হয়। প্রাণবন্ত এই ঘরোয়া মানুষটিকে কেন্দ্র করেই গল্প বুনেছেন পরিচালক। তার জীবনের ওঠাপড়া, হাসি মজা, মান অভিমান, ভালবাসা, ভাল লাগা-- সব কিছু নিয়েই এই ছবি। একজন সাধারণ মানুষও যে সবার অনুপ্রেরণা হতে পারে, সেটাই দেখানো হয়েছে। আমি আমার হান্ড্রেড পার্সেন্ট দিয়েছি। গানও খুব ভাল। আর যেটা বলার তা হল, সপরিবারে একসঙ্গে হলে গিয়ে এনজয় করার মতো ছবি। সব্বার ভাল লাগবে।

বম্বেতে হিন্দি ছবি করতে যাওয়াই মিঠুর কাল হল! কেমন আছেন স্বয়ংসিদ্ধা মর্জিনা