কেরিয়ারের শুরুতে তিনি সত্যিই ছিলেন সুলক্ষণা মেয়ে। কিন্তু ব্যর্থ প্রেমের আঘাতে হারিয়ে গেলেন 'সেভেন্টিজ ডিভা' সুলক্ষণা।

শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 12 July 2025 13:34
'মনে রং না লাগলে তবে
এই হোলি কেমন হোলি
না লাগলে রং ফোটে
কি আর যৌবনেরই কলি'
মনে রং লেগে ফুটেছিল যৌবনেরই কলি কিন্তু সেই প্রেমের কলি ঝরে গিয়েছিল অচিরেই। কারণ প্রেম ছিল এক তরফা। আর তাতেই শেষ হয়ে গেলেন সুলক্ষণা পণ্ডিত। সুন্দরী নায়িকার এক করুণ কাহিনি। আজ তাঁর জন্মদিন কেমন ভাবে কাটাচ্ছেন অভিনেত্রী?
কেরিয়ারের শুরুতে তিনি সত্যিই ছিলেন সুলক্ষণা মেয়ে। কিন্তু ব্যর্থ প্রেমের আঘাতে হারিয়ে গেলেন 'সেভেন্টিজ ডিভা' সুলক্ষণা। যার নামের আগে বম্বের সাংবাদিকরা 'হট' শব্দটি ব্যবহার করতেন, সেই নায়িকা আজ কার্যত অথর্ব। জড়ভরত অবস্থায় কোনও রকমে দিন কাটাচ্ছেন, অর্থকষ্টে ভুগছেন।

১৯৬৭ সালে ‘তকদির’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে 'সাত সমুন্দর পার সে' গান গেয়ে শিশু গায়িকা হিসেবে তাঁর গানের কর্মজীবন শুরু করেন সুলক্ষণা। সুলক্ষণা যখন বড় হয়ে নায়িকা হন, তখন তাঁর লিপে আবার লতা মঙ্গেশকর গান গেয়েছেন।
এর পর সুলক্ষণা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং কিশোর কুমারের মতো খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে গান রেকর্ড করেছিলেন। তিনি হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, ওড়িয়া এবং গুজরাতি ভাষায় গান গেয়েছেন। কিশোর কুমার ও রফির সঙ্গে কনসার্টে গাইতেন সুলক্ষণা। সংকল্প (১৯৭৫) ছবির 'তু হি সাগর হ্যায়, তু হি কিনারা' গানের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ গায়িকার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতেন তিনি।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের 'রাহগীর' ছবিতে গান গাইতে আসেন সুলক্ষণা। 'রাহগীর' ছবির পরিচালক ছিলেন তরুণ মজুমদার। 'পলাতক' ছবির হিন্দি রূপ ছিল 'রাহগীর'। এই ছবিতে গান গাওয়ার সময়ে হেমন্ত সুলক্ষণাকে পরামর্শ দেন, গায়িকা হওয়ার পাশাপাশি তাঁর নায়িকা হওয়ারও যোগ্যতা আছে। হেমন্তর কথায় প্রথমেই রাজি হননি সুলক্ষণা। কিন্তু পিতার মৃত্যু ও অভাবের সংসার চালাতে সুলক্ষণা ফিল্মে যোগদান করেন। এক সাক্ষাৎকারে সুলক্ষণা নিজেই জানান, হেমন্তর ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যায় তাঁর জীবনে।
১৯৭৫ সালে তাঁর অভিনয় জীবন সাসপেন্স থ্রিলার 'উলজাহন' ছবি দিয়ে শুরু হয়েছিল সঞ্জীব কুমারের বিপরীতে। প্রথম ছবিতেই প্রথম দেখায় সুলক্ষণা প্রেমে পড়ে যান সুপারস্টার সঞ্জীবকুমারের। তখন সঞ্জীবকুমার এক ব্যর্থ প্রেমিক। প্রথম ভালবাসা হেমা মালিনীর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। সেই সময় সঞ্জীবকুমারের আঘাতে মলম লাগাতে চেয়েছিলেন সুলক্ষণা। দু'জনের ছিল বয়সের তফাত।

কিন্তু সঞ্জীবকুমার তাঁকে কোনওদিন ভালবাসেননি। একসঙ্গে ছবি করলেও সঞ্জীব সুলক্ষণাকে হেমার জায়গায় বসাননি। হেমার বিরহে সঞ্জীব নেশায় ডুবে থাকতেন। ইতিমধ্যে তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। আমেরিকায় গিয়ে বাইপাস সার্জারি করান তিনি। সুস্থ হওয়ার সময়ে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সুলক্ষণাই। নিজের কেরিয়ার ভুলে সেবা করতেন মনের মানুষের।
একবার এক মন্দিরে ঘুরতে গিয়ে সুলক্ষণা সঞ্জীবকে বলেন, ঠাকুরের সামনে তাঁকে সিঁদুর পরিয়ে দিতে। সঞ্জীব স্পষ্ট জবাব দেন তাঁর স্ত্রীর জায়গায় একমাত্র রয়েছেন তাঁর প্রথম ভালবাসা হেমা। ততদিনে হেমা ধর্মেন্দ্রর ঘরণী। সঞ্জীবের থেকে প্রত্যাখাত হয়ে সুলক্ষণা আরও ভেঙে পড়েন। রাজেশ খান্না, জিতেন্দ্র, বিনোদ খান্না, ঋষি কাপুর, রাজ বব্বর এবং রাকেশ রোশনের সঙ্গে কাজ করেছেন সুলক্ষণা। কিন্তু তাঁর মনে শুধুই ছিলেন সঞ্জীব।
১৯৭৮ সালে উত্তমকুমারের নায়িকা হয়ে 'বন্দী' ছবিতে কাজ করেছিলেন সুলক্ষণা। ছবিটি বাংলা ও হিন্দি, ডবল ভার্সনের ছবি। বিগ বাজেট ছবি হলেও আলো সরকারের মোটা দাগের পরিচালনার কারণে বক্সঅফিসে ছবিটি মুখ থুবড়ে পরে। দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেন মহানায়ক। শ্যামল মিত্রর সঙ্গীত পরিচালনায় ছবির গান ছিল সুপারহিট। কিন্তু উত্তমকুমারকে এত মেলোড্রামাটিক রাজার চরিত্রে দর্শক নেয়নি। তবে উত্তমকুমারের নায়িকা রূপে বাংলা ছবিতে নাম লেখালেন সুলক্ষণা। মাল্টিস্টারার কালার ছবি তাই আকর্ষণীয় ছিল।

১৯৮৫ সালে অত্যধিক মদ্যপানের ফলে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে প্রয়াত হন সঞ্জীবকুমার, মাত্র ৪৭ বছর বয়সেই। তারপর থেকে নিজেকে ঘরবন্দি করে ফেলেন সুলক্ষণা। এর পর তাঁর মায়ের মৃত্যুতে আরও আঘাত পান তিনি। ফিল্মের অফার আসাও বন্ধ হয়ে যায়। সুলক্ষণা বলেন, 'তখন আমি জানতাম, লিড চরিত্রে নায়িকা হওয়ার অফার পাব না। কিন্তু আমার গানের গলা ভাল ছিল। প্লেব্যাকেও কেন আমায় ডাকল না!'
শেষবারের মতো সুলক্ষণা প্লে ব্যাক করেন যতীন-ললিত ভাইদের সুরে 'খামোশি' ছবিতে। বর্তমানে বলিউড ভুলে গেছে যতীন-ললিত, দুই সুরকার ভাইকেও।
সুলক্ষণার নিজের বোন বিজয়েতা পণ্ডিত বাংলা ছবি 'অমর সঙ্গী'তে প্রসেনজিতের হিরোইন রূপে আজও জনপ্রিয়। বিজয়েতা 'লাভ স্টোরি' ছবি দিয়ে বলিউডে খ্যাতি অর্জন করেন।
অনেক রটনা রটেছিল, ব্যর্থ প্রেমে সুলক্ষণা উন্মাদিনী হয়ে গিয়েছেন। আসলে তিনি ডিপ্রেশানে চলে গিয়েছিলেন। বোন বিজয়তা জানিয়েছেন, দিদি রেডিওয় নিজের গানের শো আর ভক্তিমূলক গান শোনেন আজকাল। সুলক্ষণাকে দিয়ে ভক্তিমূলক অ্যালবামে গাওয়াতে চেয়েছিলেন ভগ্নীপতি আদেশ শ্রীবাস্তব। কিন্তু আদেশ মারা যাওয়ায় সে ইচ্ছে আর পূর্ণ হয়নি। বিজয়েতা ও আদেশের দুই ছেলেকে মায়ের মতো ভালবাসেন সুলক্ষণা।
যে পরিবারের এতগুলি মানুষ একসময় বলিউড শাসন করতেন তাঁরা আজ প্রায় অর্থশূন্য হয়ে দিন কাটাচ্ছেন, ভাবলেই আশ্চর্য লাগে! আসলে মদ্যপান আর জীবনে হতাশার কারণে ডুবে যেতে থাকে সংসার। ৭১ বছরের নায়িকাকে দেখলে মেলানো মুশকিল তাঁর যৌবনসরসী রূপের সঙ্গে। জরা, অর্থসংকট, একাকীত্ব শিল্পীর জীবনের যেন আর এক পীঠ।
সঞ্জীব কুমারকে ভালবেসে সুলক্ষণা কখনও বিয়ে করেননি। এই ত্যাগ কম ত্যাগ নয়। পরে অর্থ কষ্টে বাড়ির সব আসবাব পত্র বিক্রি করে একা ফাঁকা ফ্ল্যাটে থাকতেন সুলক্ষণা। ফ্ল্যাট মেরামতের পয়সা ছিল না। ঋণের বোঝাও ছিল মাথার উপর। শেষ পর্যন্ত জিতেন্দ্র সুলক্ষণার মত নিয়ে সেই বাড়ি বেচে সুলক্ষণাকে ছোট ফ্ল্যাট কিনে দেন। যদিও সে ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে বোন বিজয়েতার কাছে থাকেন সুলক্ষণা।
রাজেন্দ্র কুমারের ছেলে কুমার গৌরবকে ভালবেসে বিজয়েতা পণ্ডিত পাননি। আবার দিদি সুলক্ষণা পণ্ডিতও সঞ্জীব কুমারকে ভালবেসে চিরতরে স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে ফেললেন। হয়তো আজ তাঁর নিজের জন্মদিনটাও মনে নেই।