বাড়ির মহিলারা দুপুরের রাঁধাবাড়া সেরে ম্যাটিনি শো হাউসফুল করে দেখত এসব ছবি। বাড়ির মহিলারাই তো বাংলা ছবির সবথেকে বৃহত্তর দর্শক। অথচ এই দুই ভাইয়ের অবদান মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে কজন?

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 28 July 2025 14:43
সাত আটের দশক জুড়ে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে (Bengali Film Industry) নিটোল পারিবারিক গল্প আর দরদী গানে ভরিয়ে তুলেছিল দুই ভাইয়ের জুটি। তাঁরা হলেন সুখেন দাস (Sukhen Das) আর অজয় দাস (Ajay Das)। সুখেনের মেলোড্রামাটিক সংলাপ আর সেইসব ছবিতে অজয়ের মেলোডি বেসড গান, বাংলা ছবির মরা গাঙে বক্সঅফিস হিট ছবির বান ডেকেছিল। আজ সুখেন দাসের জন্মদিনে ফিরে দেখা বাংলা ছবির দুই অমর জুটির সফর। পরিচালক আর সংগীত পরিচালক জুটি এরআগে শুরু হয় তরুণ মজুমদার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। তবে তাঁরা দুই ভাই ছিলেন না।
অভাব আর দারিদ্র্যের ভেতর থেকে উঠে এসেছিল দুই রত্ন। সুখেন দাস দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গাড়ি, বাড়ি, খ্যাতি পেয়েছিলেন। অভাব আর অনাথ হওয়ার কারণেই কম বয়সে মাস্টার সুখেন ফিল্ম জগতে চলে আসেন। শিশুশিল্পী রূপে অনেক বিখ্যাত ছবিতে লেজেন্ডারি অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি। সুনন্দা দেবীর 'দত্তা' ছবিতে শিশু অভিনেতা ছিলেন সুখেন দাস।

পরের দিকে কাজ করতেন স্পট বয় হিসেবে। কিন্তু তরুণ হতেই চরিত্রাভিনেতা ও কমেডিয়ান রূপে তাঁর পদার্পণ টালিগঞ্জ পাড়ায়। পরে তো নিজেই পরিচালক হন এবং তাঁর ছবিতে নিজে থাকতেন প্রায় নায়ক সুলভ রোলে। সুখেনের কেরামতি পর্দায় দেখতেই সিনেমাহলে ভিড় জমাত তখনকার দর্শকরা। হাসি-কান্নায় ভরা নিটোল পারিবারিক গল্প দেখে চোখের জল মুছতে মুছতে সিনেমাহল থেকে বেরত দর্শকরা।
প্রতিশোধ, জীবন মরণ, পাপ-পুণ্য, সিংহদুয়ার, পান্না হীরে চুনি, দাদামণি, মিলন তিথি-- একের পর পর হিট ছবি পরিচালনা করেছিলেন সুখেন দাস। আর সেইসব ছবি আরও সুপারহিট করত তাঁর দাদা অজয় দাসের মেলোডি বেসড গানে। সুখেনের বেশি ছবি সঙ্গীতমুখর হত তাঁর দাদার সংগীত পরিচালনায়। তবে অজয় দাস আধুনিক বাংলা গান থেকে অন্য পরিচালকদের ছবিতেও সুর করেছেন। কিন্তু তাঁর সিগনেচার সঙ সব ভাইয়ের ছবিতেই।
ভাইয়ের মতোই অজয় জীবন সংগ্রাম অভাবের মধ্যে থেকেই। কিন্তু পাঁকের ভিতর পদ্ম ছিলেন তিনি। অজয় দাস ছিলেন সুখেন দাসের দাদা। তাঁর প্রতিভা ছিল অনেক, কিন্তু তাঁর প্রতিভার কদর তিনি পাননি। সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্তর পর বাংলা ছবি হিট হত যাঁর গানে, তিনি অজয় দাস। তাঁর সুরে লতা মঙ্গেশকর গেয়েছেন, 'আমি যে কে তোমার', আশা ভোঁসলে গেয়েছেন 'বৃষ্টি থামার শেষে', 'কত না ভাগ্যে আমার', কিশোর কুমার গেয়েছেন, 'হয়তো আমাকে কারো মনে নেই', 'কী উপহার সাজিয়ে দেব', 'অনেক জমানো ব্যথা বেদনা', 'আজ মিলন তিথির পূর্ণিমা চাঁদ', 'সুখেও কেঁদে ওঠে মন'। আরতি মুখোপাধ্যায় গেয়েছেন, 'অন্তর যার অথৈ সাগর', 'আমার ময়ূরপঙ্খী', আর মান্না দে সেই আইকনিক স্বদেশী গান, 'ভারত আমার ভারতবর্ষ', সেটির সুরকারও অজয় দাস। কিন্তু এই সুরকার তাঁর ন্যূনতম প্রাপ্য সম্মান পাননি। না অর্থে না সম্মানে। না খেতে পেয়ে শেষ জীবন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। অথচ আজও পুজো প্যান্ডেলে অজয় দাসের গান সব থেকে বেশি বাজে। সুখেন দাসের থেকেও তাঁর দাদা বেশিই কষ্ট পান শেষ জীবনে।

উত্তমকুমার থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-- বিশিষ্ট অভিনেতারা কাজ করেছিলেন সুখেন দাসের পরিচালনায়। শকুন্তলা বড়ুয়া ইন্ডাস্ট্রিতে আসেন সুখেন দাসের 'সুনয়নী' ছবির হাত ধরেই। বনি সেনগুপ্তর বাবা অনুপ সেনগুপ্ত ছিলেন সুখেন দাসের সহকারী পরিচালক। অন্যদিকে সুখেন দাস তাঁর মেয়ে পিয়া দাসকে প্রথম ফিল্মে আনেন প্রসেনজিতের বিপরীতে 'দাদামণি' ছবিতে। দাদামণির লিড রোলে সুখেন নিজেই। সুখেন তাঁর ছেলে রজত দাসকেও অভিনয়ে ফিল্মে এনেছিলেন নিজের অনুকরণে, তবে একদমই চলেনি সুখেন পুত্র।
এরপর মেয়েকে নায়িকা করে সুখেন ছবি বানান 'মিলন তিথি'। সেই ছবিতে পিয়ার বিপরীতে ছিলেন জয় ব্যানার্জী। সুখেন প্রযোজনাতেও এসেছিলেন নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে করে। আর ছবির ডিরেকশন দিল পুত্র রজত দাস। ছবির নাম 'পাপ পুণ্য'। পাপ পুণ্য সিনেমায় পিয়ার বিপরীতে ছিলেন তাপস পাল। তবে নায়িকা হিসেবে বাবার ছবির বাইরে আর সুযোগ পাননি পিয়া। নায়িকার গ্ল্যামার তাঁর ছিল না। অথচ ছবি হিট। ছবি হিট করেছিল সুখেনের দাদা অজয় দাসের সংগীত পরিচালনার দৌলতে। গানের জন্যই ছবি হিট।
পিয়ার বিয়ে হয় সুখেনের সহকারী অনুপ সেনগুপ্তর সাথে। পিয়া সেনগুপ্ত অনুপের বহু ছবিতেই সহ-অভিনেত্রীর চরিত্রে বহুদিন অভিনয় করেছেন। সেই অনুপ ও পিয়ার ছেলেই বনি সেনগুপ্ত। তবে দাদুদের নিয়ে কখনও কোথাও বলতে শোনা যায়নি বনিকে।
উত্তমকুমারের ঢলতি সময় থেকেই ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল এই দুই ভাইয়ের জুটি। বাড়ির মহিলারা দুপুরের রাঁধাবাড়া সেরে ম্যাটিনি শো হাউসফুল করে দেখত এসব ছবি। বাড়ির মহিলারাই তো বাংলা ছবির সবথেকে বৃহত্তর দর্শক। ইন্ডাস্ট্রি এখন টালিগঞ্জ থেকে টলিউড হয়েছে, ব্র্যান্ডেড ফ্ল্যাট থেকে ব্র্যান্ডেড গাড়ি পান অভিনেতারা। অথচ সুখেন দাস বা অজয় দাসকে ভাড়া বাড়িতে চরম দারিদ্রে দিন কাটাতে হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁরা ইন্ডাস্ট্রির জন্য যা করে গেলেন সারা জীবন ধরে, সেই ঐতিহ্যই বহন করছে আজকের ইন্ডাস্ট্রি। অথচ এই দুই ভাইয়ের অবদান মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে কজন?