সুমিত্রাকে জড়িয়ে ধরে মাধবী বলেছিলেন 'হাসি তুই 'সুবর্ণলতা' আমার থেকেও ভাল করছিস!'

সুবর্ণলতা সুমিত্রা
শেষ আপডেট: 21 May 2025 18:42
'মেয়েমানুষ যতই মুখ্যু হোক তাকে ঠকানো বড় শক্ত। সে সব জেনেশুনেও চুপ করে থাকে, পাছে তার পাখির বাসাটি ভেঙে যায়।'
আশাপূর্ণা দেবীর 'সুবর্ণলতা', খুব সাধারণ ঘরের বউয়ের চরিত্র থেকে এক নারীবাদের আদর্শ চরিত্র হয়ে ওঠে। আজও প্রতিটি বাঙালি নারীর জীবনে 'সুবর্ণলতা' আইকনিক চরিত্র। বাংলা সিরিয়ালের ইতিহাসে আটের দশকে তৈরি হয়েছিল রাজা সেনের পরিচালনায় 'সুবর্ণলতা'। নামভূমিকায় সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। অথচ ইদানীং কালে 'সুবর্ণলতা' বললেই মানুষ বলে অনন্যা চট্টোপাধ্যায়ের নাম। জি বাংলার 'সুবর্ণলতা' নিঃসন্দেহে ভাল। কিন্তু আরও পোক্ত চিত্রনাট্য ও পরিচালনা ছিল কলকাতা দূরদর্শনে সম্প্রচারিত রাজা সেনের 'সুবর্ণলতা'। সপ্তাহে এক দিন করে রাত্রে এই ধারাবাহিক দেখতে উদগ্রীব হয়ে বসে থাকত প্রতিটি দর্শক। তখন তো সাদা-কালো টিভির যুগ, আবার সবার ঘরে টেলিভিশনও আসেনি, কিন্তু তখন রঙিন ধারাবাহিক বানান রাজা সেন। আজ সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিনে ফিরে দেখা যাক ১৯৮৭ সালের ধারাবাহিক 'সুবর্ণলতা' তৈরির গল্প।
দ্য ওয়ালে গল্প বললেন এই সিরিয়ালের পরিচালক রাজা সেন ও অভিনেত্রী পাপিয়া সেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনের ঘর সংসার তখন হয়ে গিয়েছিল এই সিরিয়ালের শ্যুটিং সেট।

রাজা সেনের 'সুবর্ণলতা', যেন এক টাইম ট্রাভেল। তখন তো মেগা সিরিয়ালের যুগ শুরু হয়নি। প্রতি সিরিয়াল সপ্তাহে একদিন করে সম্প্রচার হত। 'সুবর্ণলতা' ছিল ১৪ পর্বের ধারাবাহিক।
পরিচালক রাজা সেন বললেন 'দূরদর্শনে আমি প্রথম কাজ শুরু করি ছোট গল্প দিয়ে বানানো 'সম্পর্ক' সিরিয়াল। সেই ছোট গল্প গুলো এত জনপ্রিয় হয় যে আমাকে দূরদর্শন 'সুবর্ণলতা' সিরিয়াল করতে বলে। সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী তখন জীবিত ছিলেন। তাঁর থেকে সম্মতি নিয়ে 'সুবর্ণলতা' ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য তৈরি হয়। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়। ১৯৮৬ সালে শ্যুটিং শুরু হয়, ১৯৮৭ তে দূরদর্শনে টেলিকাস্ট হয় প্রথম। ১৯৮৮ সালে এই সিরিয়াল অনেক আঞ্চলিক পুরস্কারে সম্মানিত হয়। তখনকার আজকাল 'টেলিভিশন' অ্যাওয়ার্ড, উত্তমকুমার অ্যাওয়ার্ড, কিশোর কুমার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল এই সিরিয়াল। রাজা সেন অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এই 'সুবর্ণলতা' সিরিয়াল সবাই দেখতে পাবেন।

সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় সুবর্ণলতার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। আমি হাসিদিকে ভেবেই সিরিয়াল বানাবো ভেবেছিলাম। উনি এমন কালজয়ী চরিত্র পেয়ে লুফে নেন। ওঁর অভিনয় করার খিদেটা প্রচন্ড ছিল। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় তখন একেবারে চলচ্চিত্রের নেগেটিভ ভিলেন। বিপ্লবকে আমি সুবর্ণলতার স্বামীর পজিটিভ রোল দিয়েছিলাম। বিপ্লব এই লিড চরিত্র চিরকাল মনে রেখেছে। গীতা দে অসাধারণ করেছিলেন শাশুড়ির চরিত্র। মনোজ মিত্র ছিলেন একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে।
তখন কাজের এত তাড়া ছিল না। আমরা তিনদিন ধরে একটা পর্ব করতাম। একদম সিনেমার মতো করতাম। এমনকি বোলপুরে গিয়ে আউটডোর করেছিলাম। প্রত্যেকটি পর্বে প্রায় প্রত্যেকটি দৃশ্যে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় ছিলেন। প্রায় ৪৫ দিন উনি আমাদের সঙ্গে শ্যুটিং করেছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন কখনও কাজে পড়তে দেখিনি। হাসিদির (সুমিত্রার ডাক নাম) মুখের হাসি কখনও মেলায়নি। বোলপুরে একটা ঘটনা ঘটেছিল, সুবর্ণলতা সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় আর তাঁর ননদের রোলে অনসূয়া মজুমদারের একটা শট ছিল। একদম সিনেমার মতো করেছিলাম। দুজনে কথা বলতে বলতে আসছে আর সূর্য অস্ত যাচ্ছে। যখন ওঁদের কথা শেষ হচ্ছে তখনই সূর্যটা অস্ত যাবে। আমরা সিরিয়ালে সত্যিসত্যি সেই সূর্য অস্ত যাবার শটটা রেখেছিলাম। তবে সাউন্ডে কিছু অসুবিধে হয়। তাই পরদিন কয়েকটা শট নিতে হয়। এদিকে পরদিন আমাদের সবার ট্রেনের টিকিট কাটা। সুমিত্রাদি সবাইকে রাজি করান কাজটা করতে এবং ঐ শট বিনা পারিশ্রমিকে সবাই করেন। মানুষ সুমিত্রা কত বড় মনের, কতটা পারিবারিক ছিলেন এখান থেকে বোঝা যায়।'

এই সিরিয়ালে ছিল দুর্ধর্ষ ফিমেল লিড। গীতা দে সাদা থানে জাঁদরেল শাশুড়ি মা, আটপৌরে বড় বৌ চিত্রা সেন, মেজ বউ সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, সেজ বউ পাপিয়া সেন ও ছোট বউ ঋতা দত্ত চক্রবর্তী। ননদের ভূমিকায় অনসূয়া মজুমদার। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের থেকেও কিন্তু শাশুড়ি মায়ের রোলে অনেক এগিয়ে ছিলেন গীতা দে।
সেজ বউ অভিনেত্রী পাপিয়া সেন বললেন
'আমি তো ঐ বয়সে প্রথমে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। এত নামকরা সব অভিনেতা অভিনেত্রীর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারব কিনা! তার ওপর আশাপূর্ণা দেবীর কালজয়ী কাহিনি। কিন্তু সহজেই সকলে আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। তারমধ্যে একটি বিশেষ নাম হচ্ছে সুমিত্রাদি। আমার কাজ ছিল মাঝেমাঝেই সুমিত্রাদির বাড়ি থেকে ওঁকে তুলে আনা। উনি বেঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন। আমি ওঁনাকে সাজিয়ে গুছিয়ে স্টুডিওতে নিয়ে আসতাম। এটা ওঁর কিছুটা আমার উপর অধিকারবোধ বলতে পারো। আমার বড় মেয়ের বয়স তখন আড়াই বছর উনি ওঁকে ভীষনই আদর করতেন। বোলপুরের গোয়ালাপাড়ায় আউটডোর হয়েছিল। একটা শট ছিল ননদ অনসূয়া মজুমদার আর নন্দাই সুনীল মুখোপাধ্যায় সুমিত্রাদিকে বলছেন, বৌদি সকালবেলা, দেখে যাও বাইরে এসে হাঁস কেমন ডিম পাড়ে! সুমিত্রাদি হাত দিয়ে সেই ডিমটা ধরছেন। তখনকার সিরিয়ালে এসব শট রাখা হত। আর সুমিত্রাদির ডাক নাম ছিল হাসি। আমার মেয়ে বলত সুমিত্রাদিকে 'ও কী হাঁস! ওঁর নাম যে হাসি?' আর হাসিদি আমার বড় মেয়েকে হাসের ডিম বলেই ডাকতেন। আমার সেজ বউয়ের চরিত্রটা ছিল খুব দাম্ভিক। যে বড়লোক বাপের মেয়ে। কিন্তু কঠিন সংলাপ বলার সময় আমি সুমিত্রাদির সামনে হেসে ফেলতাম।

আশাপূর্ণা দেবী সেটে এসে দু হাত তুলে রাজাকে আশীর্বাদ করে গিয়েছিলেন। এত ভাল লেগেছিল ওঁর। সুমিত্রাদি যখন সংলাপ বলতেন আমাদের চোখ দিয়ে শুধু জল পড়ত। মনে হত এত হাসিখুশি মানুষটা কী ভাবে এমন সিরিয়াস অভিনয় করেন!
তখন ফ্লোরে একটা পারিবারিক পরিবেশ ছিল। গীতা মা আর হাসি দি একসঙ্গে বসে পান খেতেন। তখনকার এনটি ওয়ান স্টুডিও তো এখন 'ভারত সঙ্গীত অ্যাকাডেমি' হয়ে গেছে। তখন ঐ ফ্লোরে আমাদের বিশাল মজা হত। মজার মূল মন্ত্র ছিলেন গীতা দে আর চিত্রা সেন। স্টুডিওর দারোয়ানকে ওঁরা বলতেন লেক গার্ডেন্স বাজার থেকে চুনো মাছ, চিংড়ি মাছ, পুঁইশাক এসব কিনে আনতে। সুমিত্রাদি, গীতা মা আর চিত্রাদি তিনজনে মিলে রান্না করতেন। তখন তো এপিসোডের তাড়া থাকত না। আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম কতক্ষণে রান্নাটা হবে। আমি সবজি কাটাকুটি করে দিতাম আর ওঁরা তিনজনে মজা করে রান্না করতেন। রাজা এসে প্রচন্ড চেঁচাত এটা শ্যুটিং না পিকনিক? আর সবাই বলত, হোক হোক আমরা তাহলে ভাগ পাব। এই আন্তরিকতা তো এখন আর ভাবাই যায় না স্টুডিও ফ্লোরে।'

এরআগে ১৯৮১ সালে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় পরিচালক বিজয় বসু 'সুবর্ণলতা' বাংলা ছবি করেছিলেন। নামভূমিকায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ের অনবদ্য।

রাজা সেন বললেন 'আমাদের সিরিয়ালের শ্যুটিং ফ্লোরে একদিন হঠাৎ মাধবী মুখোপাধ্যায় এসে উপস্থিত। কোথায় শ্যুট হচ্ছে নিজে খবর নিয়ে চলে এসেছেন। তখন মোবাইল ফোনের যুগ ছিল না। মাধবীদি এসে বললেন 'তোমাদের সুবর্ণলতা সিরিয়াল অসাধারণ লাগছে। আমি তাই নিজেই তোমাদের কনগ্র্যাচুলেট করতে চলে এলাম। সুমিত্রাদিকে জড়িয়ে ধরে মাধবীদি বলেছিলেন 'হাসি তুই আমার থেকেও সুবর্ণলতা ভাল করছিস!'