
শেষ আপডেট: 16 June 2021 13:24
ছেলে মেয়েকে গানের তালিম হেমন্ত-বেলার।[/caption]
যদিও বাবা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে রাণু সেভাবে কোনও দিনই বসে গান শেখেননি নিয়মিত। তবু বাড়িতে তো গানের পরিবেশ ছিলই। কে না এসেছেম হেমন্তর বাড়ি। লতা মঙ্গেশকর, সলিল চৌধুরী থেকে বম্বে ও কলকাতার সমস্ত দিকপালদের আড্ডা বসত হেমন্তগৃহে। একটার পর একটা গানের সুর তৈরি চলছে, আর সেসবের মধ্যেই বড় হয়েছেন রাণু।
এরপর রাণুর কলকাতা সফর। অগ্রদূত পরিচালিত ছোটদের ছবি 'বাদশা'তে বাবার সুরে রাণুর গাওয়া তিনটি গান বিশাল জনপ্রিয় হয় মাস্টার শঙ্কর ঘোষের লিপে। 'লালঝুঁটি কাকাতুয়া', 'শোন শোন শোন মজার কথা ভাই' এবং 'পিয়ারিলালের খেলা দেখে যা'। 'লালঝুঁটি কাকাতুয়া' তো ঘুমপাড়ানি গানই হয়ে গেল ঘরে-ঘরে। আজও ছোটদের গান বললেই এক নম্বরে আসবে রাণুর গাওয়া 'লালঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে যে বায়না, চাই তাঁর লাল ফিতে চিরুনি আর আয়না।'
[caption id="attachment_2315051" align="alignnone" width="480"]
ছাদে গাছ লাগাচ্ছেন রাণু, বাবা দাদার সঙ্গে।[/caption]
রাণুর লাইভ অনুষ্ঠান থাকলে বাবা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হারমোনিয়াম বাজানো ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। দেশে-বিদেশে বাবার সঙ্গে বহু অনুষ্ঠান করেছেন রাণু। 'ইয়াদ কিয়া দিলনে কহাঁ হো তুম', 'তুমহে ইয়াদ হোগা', 'ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি', 'ছুপা লো ইঁয়ু দিল'-এর মতো সুপারহিট গান ডুয়েটে গাইতেন পিতা-পুত্রী।
https://youtu.be/-39e-5drO1A
শুধু বাংলাতেই নয়, আরব সাগরের তীর পার করে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ল রাণু মুখার্জী নাম।
রাণুর কণ্ঠে একটা বিদেশিনি ছাপ ছিল, যে ধরনের গলা চট করে শোনা যায়নি আগে বাংলা গানে। বিদেশিনি ছাঁচের কণ্ঠে বাংলা গান, হিন্দি গান সবই জনপ্রিয় হতে থাকল। তখন তো রেকর্ডের যুগ, রাণুর ছবি দেওয়া রের্কডও বেরোতে থাকল। পরের পর হিট।
শুধু কণ্ঠ নয়, স্নিগ্ধ সুন্দরী রাণুর রূপও মুগ্ধতা ছড়াল শ্রোতাদের মাঝে। হেমন্ত-কন্যা ছবিতে নায়িকা হওয়ারও অফার পেয়েছিলেন সেসবে আর এগোননি রাণু। ছোটবেলায় রাণু কিন্তু শিশুশিল্পী রূপে অভিনয়ও করেছেন হিন্দি ছবিতে, 'বন্ধন', 'অনুরাধা' এবং 'বিশ সাল বাদ'।
[caption id="attachment_2315054" align="alignnone" width="500"]
বিদেশে কর্পোরেট লুকে হেমন্ত. সঙ্গে মেয়ে রাণু।[/caption]
হেমন্ত অবশ্য তাঁর পুত্রবধূ ইন্দুর বেলাতেও কোনও রক্ষণশীলতার বেড়াজাল বসাননি। এই ইন্দুই তো আমাদের 'বালিকা বধূ' মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। বিয়ের পরে মুখোপাধ্যায়। যদিও চট্টোপাধ্যায় পদবীই ফিল্ম জগতে ব্যবহার করেছেন মৌসুমী। কারণ বিয়ের আগেই মৌসুমী সুপারহিট নায়িকা।
রাণু আর ইন্দুর মধ্যে কখনও তফাত করেননি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ইন্দুর বিয়ের আগেও ইন্দুকে বম্বের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গোটা শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো মস্ত ব্যস্ত শিল্পী। বম্বেতে মৌসুমী গেলে তখন তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলেন রাণু।
[caption id="attachment_2315046" align="alignnone" width="581"]
মৌসুমী-জয়ন্তর বিয়ের দিন।[/caption]
বাবা-মেয়ের এই যে স্নেহের সম্পর্ক, এই নিয়ে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় বলছেন, "আমি তখন হিন্দি সিনেমায় নায়িকার ভূমিকায় কাজ করতে শুরু করেছি। একদিন আমাকে পাশে ডেকে বসিয়ে কাঁধে হাত রেখে বাবা বললেন, 'এই যে আমি তাের কাঁধে হাত রাখলাম, এরকমভাবে অনেকেই কাঁধে হাত রাখতে চাইবে। কিন্তু তুই অ্যালাও করবি না । তুই নায়িকা। একটা দূরত্ব বজায় রাখবি। আর সকলের উদ্দেশ্যও যে ভাল, তা কিন্তু নয়। বুঝেশুনে লােকের সঙ্গে মিশবি।' এই কাঁধে হাত দেওয়া নিয়ে কম কথা হয়েছে! হেমন্ত মুখােপাধ্যায়কে নিয়ে গসিপ ছিল, উনি নাকি মেয়েদের কাঁধে হাত দেন। একজন মেয়ে বােঝে, কারও স্পর্শ ভাল না খারাপ। ওঁর স্পর্শ ছিল মায়ের মতো।"
[caption id="attachment_2315049" align="alignnone" width="375"]
হেমন্ত ও মৌসুমী।[/caption]
আশির দশকে হেমন্ত-অরুন্ধতীর ডুয়েট রবীন্দ্রসঙ্গীত 'তোমার হল শুরু, আমার হল সারা' খুব জনপ্রিয় হয়। অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর সঙ্গে এই ডুয়েটের অনেক আগেই হেমন্ত-রাণু বাবা-মেয়ের জুটির দ্বৈতকণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডও বেরিয়েছিল। 'অমল ধবল পালে লেগেছে' এবং 'এ পারে মুখর হল কেকা ওই'। অসম্ভব জনপ্রিয় হয় সে রেকর্ড।
রাণুর সমসাময়িক আরও এক যে গায়িকা তাঁর ছকভাঙা কণ্ঠে বাজিমাত করেছিলেন, তিনি শ্রাবন্তী মজুমদার। রাণু ও শ্রাবন্তী দুজনেই খুব ভাল বান্ধবী শুরু থেকেই। রাণু আর শ্রাবন্তী বাংলা মহিলাকণ্ঠে ফরেনের হাওয়া ঢুকিয়েছিলেন যেন। তাই ওঁদের গান আজও বড় আধুনিক।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে বললেই যে গানটা সবার আগে মনে পড়ে, তা হল 'আয় খুকু আয়'। পৃথিবীতে বোধহয় এমন কোনও বাঙালি বাবা-মেয়ে নেই যাঁদের প্রিয় নয় এই গানটা।আদতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উৎসাহেই ভি বালসারা যত্ন করে 'আয় খুকু আয়' গানটা বানিয়েছিলেন, রাণুর জন্যেই।
[caption id="attachment_2315043" align="aligncenter" width="406"]
মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে হেমন্ত-বেলা।[/caption]
'আয় খুকু আয়' গানটা ডুয়েট গাওয়ার কথাও পাকা ছিল হেমন্ত-রাণু পিতাপুত্রীর। রাণুকে ভেবেই গানের কথা লেখা, যা ছুঁয়ে যায় আজও শ্রোতাদের। গানের অর্থ ছিল, মেয়ে দূরে থাকে তাই বাবার কথা মনে করে গানটা গাইছে। কিন্তু পরবর্তীকালে শ্রোতারা গানের মানে করে বসল বাবা প্রয়াত তাই মেয়ে এই গান গাইছে।
https://www.youtube.com/watch?v=AvCjtGA6UiU
সে যাই হোক, শেষ অবধি রাণু মুখোপাধ্যায় 'আয় খুকু আয়' গাননি কোনও কারণে। রাণুর জায়গায় গাইলেন শ্রাবন্তী মজুমদার, তাঁর হেমন্তদার সঙ্গে। 'আয় খুকু আয়' শ্রাবন্তীর আইকনিক গান হয়ে গেল।
রাণুর বরও তো বাবা হেমন্তই খুঁজে দিয়েছিলেন। রাণু তাই মজা করে বলেন আজও, "আমার স্বামী গৌতমের সঙ্গে আমার বাবাই আমাকে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, 'রাণু এই ছেলেটার গান শোন, কী ভাল গায়, ওর সঙ্গে আলাপ কর।' ভাবা যায়? তখন কোন বাবা মেয়ের বয়ফ্রেন্ড খুঁজে দিতেন?"

আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে...[/caption]
রাণু বারবারই সরব হয়েছেন, যখনই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের শ্বেতশুভ্র ইমেজে কাদা ছেটানো হয়েছে। তবে রাণু যে শুধু বাবার গানই গেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। এ আর রহমান রাণুকে দিয়ে গাইয়ে ছিলেন রাম গোপাল ভার্মার 'দাউদ' ফিল্মে। আবার নব্বই দশকের জনপ্রিয় হিন্দি মেগা সিরিয়াল 'স্বাভিমান'-এর যে বাংলা ভার্সান 'আত্মসম্মান' নামে সম্প্রচারিত হত, তার টাইটেল সঙও বাংলাতে গেয়েছিলেন রাণু মুখোপাধ্যায়।
https://youtu.be/XdlBf1c_cbg
ভাল কাজের অফার পেলে রাণু সবসময় করেছেন। কিন্তু খারাপ কাজের সঙ্গে আপস করেননি বলেই তিনি হয়তো আজ প্রচারবিমুখ। নিজের জগতে নিজের সংসারেই আজও বাবার গানেগানে সুরেসুরে ভরে আছেন রাণু। আজও রাণু মুখোপাধ্যায় প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠেন, যখন শোনেন কলকাতা-সহ সমগ্র বাংলায় তাঁর বাবার জন্মশতবর্ষে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে। করোনা আবহে হেমন্ত শতবর্ষের বড় উদযাপন করা গেল না, এটাই রাণুর আফশোস।
রাণু মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভাময়ী শিল্পী খুব কম হয়। কিন্তু এই প্রজন্মের কাছে রাণু মুখোপাধ্যায় নামটাই অচেনা। কারণ রাণু প্রচারবিমুখ। তাই এত গুণী শিল্পী হয়েও বহু যুগ গানের জগতের বাইরে তিনি। এমন প্রতিভা যে হেমন্ত-পরবর্তী সুরকাররা কেন ব্যবহার করলেন না, সেটাই বিস্ময়।