
শেষ আপডেট: 3 September 2023 09:00
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও উত্তম কুমার ছিলেন একজন দক্ষ সুরকার। তিনি ছায়াছবির ভাবনা, মুড, দৃশ্য অনুযায়ী একের পর এক ছবিতে গানের ছন্দ ও সুরের বিস্তার ঘটিয়েছেন। উত্তমের ব্যক্তিগত জীবন থেকে উত্তম-সৌমিত্রর মধ্যে কে বড় অভিনেতা, এসব বালখিল্য আলোচনাতেই বাঙালি মেতে থেকেছে যুগের পর যুগ। আর অন্যদিকে আর্ট-ফিল্ম বোদ্ধাদের কাছে চিরকালই উত্তম কুমার ছিলেন কিছুটা আলোচনার অযোগ্য। আবার নায়ক উত্তমের স্টারডম নিয়েও মাতামাতি কিছু কম হয়নি। অথচ মহানায়কের গুণের মূল্যায়ন হয়নি। তাই অনালোচিতই রয়ে গেছেন সংগীত পরিচালক উত্তম কুমার।
সংগীতানুরাগ আর অভিনয়প্রীতি উত্তম কুমারের ছোটো থেকেই। তখন তাঁর নাম অরুণ। দক্ষিণ কলকাতার সাউথ সাবার্বান স্কুলের ছাত্র ছিলেন উত্তম। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। পাড়ার থিয়েটারেও অভিনয় করতেন। উত্তমদের পৈতৃক বাড়ি ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে নিয়মিত বসত গানের আসর৷ পরিচালক হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের বাবা শীতল মুখোপাধ্যায় সেখানে টপ্পা গাইতেন প্রায়ই৷ সেসব ঘরোয়া জলসায় গান শুনে শুনে গানে মন বসল অরুণের৷ গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স থেকে বি.কম স্ট্যাণ্ডার্ড পাশ করে চাকরি নেন কলকাতা পোর্টে। পোর্ট কমিশনার্সে চাকরির পাশাপাশি অরুণ তালিম নেন প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে৷ অনেকেরই অজ্ঞাত চক্রবেড়িয়া স্কুলের সংগীত শিক্ষক হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন উত্তম কুমার। আবার উত্তম কুমারের সঙ্গে গৌরী দেবীর প্রেম এই গানের সূত্রেই। উত্তমের বোন অন্নপূর্ণার গানের স্কুলের বান্ধবী ছিলেন গৌরী। সেই সূত্রে এমনই একদিন উত্তমদের বাড়ি আসা গৌরীর। গৌরীর গলা শুনেই উত্তম হারমোনিয়াম টেনে গলা সাধতে বসে যান। যাতে গৌরী তাঁর গান শুনতে তাঁর ঘরে আসেন। গৌরী সেদিন আসেননি উত্তমের ঘরে। তবে বোন অন্নপূর্ণা এসে দাদাকে খবর দিলেন "গৌরী বলেছে তোর দাদার গানের গলাটা বেশ সুন্দর তো!" ...জীবনের সেরা প্রশংসা সেদিন পেয়েছিলেন উত্তম। তারপর তো উত্তম-গৌরী চারহাত এক হয়।
অরুণ থেকে উত্তম কুমার হওয়ার পর উত্তম-লিপে গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র বা শেষদিকে কিশোর কুমারের মতো সংগীতের মহীরুহরা। উত্তম নিজ-কণ্ঠে নিজের লিপেই গেয়েছিলেন প্রথম ও শেষবারের মতো দেবকী কুমার বসুর 'নবজন্ম' ছবিতে। কিছু কিছু দৃশ্যে পাওয়া যায় উত্তম কণ্ঠে গান।
একটা সময় তো ঘরোয়া জলসা থেকে পয়লা বৈশাখে বসুশ্রী সিনেমার জলসাতে উত্তমের গান ছিল প্রধান আকর্ষণ। আরেকবার রবীন্দ্রসদনে উত্তম-সুচিত্রা ডুয়েট গেয়েছেন লাইভ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে'।
[caption id="attachment_2355606" align="aligncenter" width="600"]
রবীন্দ্র সদনে উত্তম-সুচিত্রার গানের লাইভ অনুষ্ঠানে[/caption]
'এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে' গান আমরা আরতি মুখোপাধ্যায়ের আইকনিক গান হিসেবেই জানি। অথচ এই গান বহু আগেই উত্তম কুমার নিজ কণ্ঠে গেয়েছিলেন ঘরোয়া জলসায়। সেটাই টেপ করে রাখেন মেগাফোনের কর্ণধার কমল ঘোষ। সেটাকেই পরে রেকর্ড রূপে প্রকাশ করেন। নচিকেতা ঘোষ প্রথমে উত্তমকে দিয়েই গাওয়ান এ কালজয়ী গান। আরতি যখন গাইলেন তখন গায়কিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছিলেন সুরকার নচিকেতা ঘোষের নির্দেশে। কিন্তু উত্তম-কণ্ঠে 'এই মোম জোছনায়' শুনলে বোঝা যায় গায়ক ও সংগীতপ্রেমী হিসেবে উত্তমকুমার কতটা প্রতিভাবান ছিলেন।
https://youtu.be/HVAZPNt0Yqo
১৯৬৬ সাল উত্তমকুমারের কেরিয়ারে উল্লেখযোগ্য। আবার দর্শক শ্রোতারাও পেল দুই রূপে নতুন উত্তমকে। পরিচালক উত্তম কুমার এবং সুরকার উত্তম কুমার। সঙ্গে নায়ক হিসেবে উত্তম তো ছিলেনই সেসব ছবিতে।
১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় উত্তম কুমার পরিচালিত উত্তম-সুপ্রিয়া জুটির ছবি 'শুধু একটি বছর'। আবার ১৯৬৬ সালেই মুক্তি পায় 'কাল তুমি আলেয়া'। যাতে নায়ক সহ সুরকার হলেন উত্তম কুমার।
শ্রীলোকনাথ চিত্রমের ব্যানারে মুক্তি পায় শচীন মুখার্জি পরিচালিত ‘কাল তুমি আলেয়া’৷ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘কাল তুমি আলেয়া’র চিত্রনাট্য লেখেন লেখক নিজেই৷ এতে ধীরাপদ চক্রবর্তীর ভূমিকায় অভিনয় করেন উত্তম৷ সঙ্গে ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় (সোনা বৌদি) এবং সুপ্রিয়া দেবী (ড. লাবণ্য সরকার)৷ নিজের অভিনীত এই ১১২তম ছবিতেই গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম জুটি গড়েন সুরকার উত্তম৷ উত্তমের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুকণ্ঠে 'আমি যাই চলে যাই' গানটি আজও মনকে নাড়িয়ে দেয়। যেটার সুর শুনে উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্বয়ং।
'কাল তুমি আলেয়া'তেই আশা ভোঁসলে গাইলেন দুটি গান- 'মনের মানুষ ফিরল ঘরে একটু বেশি রাতে’ এবং ‘পাতা কেটে চুল বেঁধে সে টায়রা পড়েছে’৷
'পাতা কেটে চুল বেঁধে' অনামী অভিনেত্রীর লিপে ছিল কিন্তু সে গান আজও হিট। কতটা সুরের জোর ছিল উত্তমকুমারের।
'মনের মানুষ ফিরল ঘরে' গানে দুর্দান্ত লিপ দেন মদালসা নীলিমা দাস।
https://youtu.be/XjNjonsZwx4
উত্তমকুমার এই ছবিতে আশাজিকে দিয়ে গান গাওয়াতে চান, এই মনোবাসনা জানান গীতিকার পুলকবাবুকে। পুলকবাবু যোগাযোগ করেন আশা ভোঁসলের সঙ্গে। নির্দিষ্ট দিনে মহানায়ক ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় বম্বেতে দেখা করলেন আশা ভোঁসলের বাড়িতে।
পুলকবাবুর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "আশা যদিও অভিনেতা উত্তমকুমারের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন, কিন্তু সুরকার হিসেবে তাঁর কথা জেনে যথেষ্ট সংশয়ে পড়েন। তাঁর হাবভাবে ছিল বিস্ময় ও নেতিবাচক মনোভাব। সেই কারণেই যখন উত্তমকুমারের সুরে বাংলা ছবিতে গান গাইতে হবে এই প্রস্তাব পান আশা তখন তিনি একটাই শর্ত রাখেন যে বম্বেতে তাঁর বাড়ি এসে গানগুলি তাঁকে শোনাতে হবে। আশা ভেবেছিলেন, না জানি কেমন সুরকার হবেন উত্তম!"
https://youtu.be/mj8rbkVQgtw
কিন্তু নির্দিষ্ট দিন শুরু থেকেই আশাজির বিস্মিত হবার পালা চলতে থাকে। প্রথম থেকেই একজন প্রফেশনাল সুরকার শিল্পীকে যেভাবে গান তোলান ঠিক সেইভাবেই আশা ভোঁসলেকে গান তোলাতে শুরু করেন উত্তম।
উত্তম একটার পর একটা গান গাইতে গাইতে গানের পিছনে পিকচারাইজেশনে যেভাবে নাটকীয়তা থাকবে তাও বোঝাতে থাকেন আশা ভোঁসলেকে। একসময় গান তোলানোর কাজ শেষ হয়। মুগ্ধ আশা ভোঁসলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন উত্তমকুমারের দিকে।
[caption id="attachment_2355616" align="alignnone" width="600"]
আশাকে গান তোলাচ্ছেন সুরকার উত্তম[/caption]
কিন্তু তখনও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বিস্ময়। আশাজির বাড়ি থেকে বেরনোর আগে হঠাৎই উত্তম বলে বসেন, আরে সবই যখন হল তখন আর নোটেশনটাই বা বাকি থাকে কেন? চলুন ওটাও একেবারে করে দিই। এরপর গীতিকার পুলকবাবুকে এবং গায়িকা আশা ভোঁসলেকে প্রবলভাবে বিস্মিত করে দিয়ে উত্তমকুমার গানের শব্দগুলোর তলায় লিখে দেন নোটেশন। অথচ আমরা যখন সিনেমা দেখি তখন এই গান তৈরির গল্পগুলো জানতেও পারিনা।
'কাল তুমি আলেয়া' ছবি সুপারহিট এবং প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল টানা ১৪ সপ্তাহ৷ ছবির প্রতিটা গান সুপার ডুপার হিট।
https://youtu.be/LwGrkWZO1Gg
প্রায় দশ বছর পার করে আবার সুরকার-রূপে অবতীর্ণ হন উত্তম কুমার।
১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় অসীম সরকার প্রযোজিত এবং পীযূষ বসু পরিচালিত উত্তম কুমারের ১৭৭তম ছবি ‘সব্যসাচী’৷ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবি’ অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় ছাড়াও সুরকারের দায়িত্বও পালন করেন উত্তম৷
স্বাধীনতা-আন্দোলনের পটভূমির ছবিতে উত্তম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দেশাত্মবোধক গানগুলো৷ কবিগুরুর ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, বিদ্রোহী কবির ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ আর ডিএল রায়ের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’৷ ছবি জুড়ে আবহ সংগীতে ফিরে ফিরে আসতে থাকে এসব দেশাত্মবোধক গানের সুর, সঙ্গে দুর্দান্ত সব সংলাপ।
এই ছবিতে সুরকার উত্তমকে সহায়তা করেন তার সংগীত শিক্ষক নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়৷ করমুক্ত ছবিটি দর্শক ও সমালোচক মহলে প্রশংসিত হয়৷ ছবির টাইটেল কার্ডেও স্বদেশী গানের সুরে আবহ সংগীত তৈরি করেন উত্তম। উত্তম এই ছবিতে অভিনেতা-রূপেও বিশাল মাপের পরিচয় রাখেন। বিভিন্ন ছদ্মবেশে মাত করেন উত্তমকুমার ও সুপ্রিয়া দেবী দুজনেই। এছাড়াও জয়শ্রী রায় বেশ বলিষ্ঠ অভিনয় করেছিলেন।
https://youtu.be/Y5FxswjxpR4
১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় উত্তম কুমারের স্বপ্নের ছবি শিল্পী সংসদ প্রযোজিত ‘বনপলাশীর পদাবলী’৷ উত্তম তখন শিল্পী সংসদের সভাপতি৷ এই ছবিতে রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস অবলম্বনে চিত্রনাট্য লেখেন উত্তম। ‘বনপলাশীর পদাবলী’র চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক উভয়ই উত্তম কুমার। ছবির দৈর্ঘ্য এত বড় হয়ে যায়, যে দুটো হাফটাইম ছিল ছবিতে। ‘বনপলাশীর পদাবলী’র আবহ সংগীতের দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং উত্তম কুমার এবং সঙ্গে পরম বন্ধু শ্যামল মিত্র। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছিল সেকালের মাল্টিস্টারার ছবি। ছবিতে কতজনকে যে উত্তম যুক্ত করেছিলেন তাঁর ইয়ত্তা নেই। যেমন সংগীত পরিচালনাতেও অভিনব ব্যাপার আনেন উত্তম। এই ছবিতে পাঁচজন সুরকারকে দিয়ে সুর করান উত্তম৷ নচিকেতা ঘোষ, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, অধীর বাগচী, শ্যামল মিত্র এবং সতীনাথ মুখোপাধ্যায়৷ এক ঝাঁক সুরকারের সংমিশ্রণ এর আগে অবশ্যি বিকাশ রায় অভিনীত 'দাদু' ছবিতে ঘটেছিল। তবু এ ঘটনা বাংলা ছবিতে বিরল ও ঐতিহাসিক।
[caption id="attachment_2355631" align="aligncenter" width="561"]
'বনপলাশীর পদাবলী'র রেকর্ডিং-এ (ছবি সৌজন্য - সূর্য সেন)[/caption]
'বনপলাশীর পদাবলী'তে একজন সুরকার রূপে যখন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে নির্বাচন করেন উত্তম কুমার তখন উত্তম জানতেন সতীনাথ ছায়াছবির গানে কোনওদিনই নিজ ইচ্ছায় সুর দেবেননা, কারণ সতীনাথ আধুনিক গানেই সুর দিতে বেশি পছন্দ করতেন। যদিও পঞ্চাশের দশকে বহু বাংলা সহ বম্বের ছবিতে সুর দিয়েছেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। তখন বম্বেতেও উৎপলা-সতীনাথ বড় নাম। কিন্তু একটা সময়ের পর থেকে বাংলা আধুনিক গানেই সুরসৃষ্টি করে সতীনাথ আইকনিক হয়ে যান।
কিন্তু উত্তমের প্রস্তাব ফেলতে পারবেননা সতীনাথ। সেই জোর থেকে তাঁর ছবিতে সুরকার হবার প্রস্তাবনা উত্তম দেন সতীনাথকে। সতীনাথ রাখেনও। উত্তমকুমারের অনুরোধে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় 'বনপলাশীর পদাবলী'তে দুটি গানের সুর দিয়েছিলেন।
https://youtu.be/_piRsaOM4W4
উৎপলা সেনের পৌত্র সূর্য সেন এ বিষয়ে চমকপ্রদ ঘটনা শোনালেন... "এক রবিবার সকালে উৎপলা সেন, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীরা সহ মহানায়ক উত্তম কুমার স্বয়ং সময়মতো পৌঁছে গেছেন টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে। সেদিন 'বনপলাশীর পদাবলী' ছায়াছবির দুটি গান রেকর্ডিং হবে। উৎপলার কণ্ঠে 'বহুদিন পরে ভ্রমর এসেছে পদ্মবনে' আর সতীনাথের কণ্ঠে 'এই তো ভবের খেলা'... দুটি সুরই সতীনাথের।
স্টুডিওতে সবাই যখন অপেক্ষা করছেন রেকর্ডিস্ট সত্যেন চ্যাটার্জির জন্য, ঠিক তখনই খবর এল যে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন সুতরাং সেদিনের রেকর্ডিং বাতিল করতে হবে। এই কথা শোনার পর যখন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় সমস্ত নোটেশন আবার তুলে রাখছেন তখন মহানায়ক বলে উঠলেন "সতীনাথদা, আপনি সব রেডি করুন আজ রেকর্ডিং হবে আমি ব্যবস্থা করছি"।
প্রথমে উৎপলা গাইবেন, তারপর সতীনাথ। উৎপলা মনে মনে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। নতুন রেকর্ডিস্টের হাত কেমন হবে কে জানে! তাঁর কণ্ঠস্বর কেমন আসবে! খানিকক্ষণ পর উত্তম কুমার বললেন "উৎপলাদি রেকর্ডিস্ট রেডি, তুমি নিশ্চিন্তে গান শুরু করে দাও"...
কোন রেকর্ডিস্ট এলেন দেখতে উৎপলা একরাশ চিন্তা নিয়ে তাকালেন।
তারপর ওঁর চক্ষুস্থির! এ তো অন্য কেউ নয়, তাঁর অত্যন্ত স্নেহের ভাই উত্তমকুমার নিজেই রেকর্ডিস্টের আসনে।"
গান সুপার ডুপার হিট। কত ভূমিকায় যে উত্তম কুমার অবতীর্ণ হয়েছেন তা বলে শেষ হবেনা। 'বনপলাশীর পদাবলী'র আবহ সংগীতও অপূর্ব করেছিলেন উত্তম।
https://youtu.be/BjePM_qRnrc
উত্তম কুমারের সংগীত পরিচালক হিসেবে খ্যাতি আরও হত, যদি না তাঁর অকাল প্রয়াণ ঘটত। যেসময় তিনি নিজেকে পরিচালক, প্রযোজক, সুরকার, চিত্রনাট্যকার বা অন্যধারার কঠিন চরিত্রে মেলে ধরতে চাইছিলেন, তখনই তাঁর শরীর ভাঙছিল। নানা টানাপোড়েনে আর শেষ রক্ষা হলনা। ১৯৮০ র ২৪ জুলাই মহাপ্রয়াণ ঘটল মহানায়কের। সেদিন মহানায়কের মহাশোকমিছিলে যে গান সবথেকে বেশি বেজেছিল সেটি ছিল উত্তমকুমারের নিজের সুরারোপ করা সেই অশেষ গান। যে গান শোকে বিহ্বল জনতার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিয়েছিল। উত্তম কুমার যেন আগে থেকেই জানতেন তাঁর ডাক এসে গেছে তাঁর কাজের পালা ফুরিয়েছে তাই এমন শেষ অশেষ গানে সুর দিয়েছিলেন।
নিজের জীবন কাহিনি যেন উত্তম এঁকে দিয়েছিলেন গানে গানে।
'যেটুকু সুরভি ছিলো, হৃদয় সবই তো দিল,
এবার খুঁজবে কাঁটা,তাই ছেড়ে যাই কূল,
আমি যাই চলে যাই
আমায় খুঁজোনা তুমি
বন্ধু বুঝোনা ভুল... '