
শেষ আপডেট: 12 February 2022 17:16

একাধারে বহু গুণের অধিকারী ছিলেন ভীষ্ম। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, ক্রিকেটার, ভালো পিয়ানো বাজানোর হাত, সঙ্গে লেখালেখি ও অভিনয়। প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'দক্ষিণী'র প্রতিষ্ঠাতা শুভ গুহঠাকুরতা ছিলেন ভীষ্মের বাবা। রাবীন্দ্রিক পরিমণ্ডল ঘিরেই গুহঠাকুরতা পরিবার। 'দক্ষিণী'র প্রযোজনায় 'নষ্টনীড়' নাটকে অভিনয়ের সুবাদে আচমকাই ক্রিকেটের ড্রেসিংরুম ছেড়ে মঞ্চে চলে আসেন ভীষ্ম। নাটকে ভীষ্মর অভিনয়ে মুগ্ধ হন তপন সিনহা। তপন সিনহার হাত ধরেই 'রাজা' ছবিতে ভীষ্মের চলচ্চিত্র অভিষেক। এরপর তপন সিনহার 'হারমোনিয়াম' ছবিতে নায়কের চরিত্র পান ভীষ্ম। সিনহার বহু ছবিতেই চেনা মুখ ছিলেন তিনি, 'আতঙ্ক', 'বৈদুর্য্য রহস্য', 'বাঞ্ছারামের বাগান','অন্তর্ধান'। সত্যজিৎ রায়ের 'গণশত্রু','শাখাপ্রশাখা'তেও অভিনয় করেছেন। সন্দীপ রায়ের 'ফটিকচাঁদ' ও বেশ কিছু ফেলুদা সিরিজে কাজ করেন ভীষ্ম। রাজেন তরফদারের 'নাগপাশ' ও গৌতম ঘোষের 'আবার অরণ্যে' ছবিতেও কাজ করেছিলেন। সত্যজিৎ পরিবারের সঙ্গে গুহঠাকুরতা পরিবারের পারিবারিক বন্ধন বেশ পুরোনো। সম্পর্কসূত্রে সন্দীপ রায় আর ভীষ্ম গুহঠাকুরতা ছিলেন দুই ভাই।
সব ছবিতে ছোট ছোট চরিত্র করলেও ভীষ্ম গুহঠাকুরতা নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন তপন সিনহার 'হারমোনিয়াম' ছবিতে। এই ছবিতে তাঁর নায়িকা হয়েছিলেন সোনালী গুপ্ত। ভীষ্ম-সোনালীর সবুজ প্রেমের গান 'এমনি করেই যদি চলতে পারি' আজও দোলা দেয় আমাদের মনে। ভীষ্ম গুহঠাকুরতার স্মৃতিচারণ করলেন তাঁরই নায়িকা সোনালী গুপ্ত বসু।
আপনাকে নায়িকা হিসাবে আপনার বাবা দীনেন গুপ্তর ছবিতেই বেশি দেখেছি সেভেন্টিজে। তপন সিনহার ছবির অফার এল কীভাবে?
সোনালী- বেশিরভাগ বাবা দীনেন গুপ্তর ছবি করলেও, অন্য পরিচালকদের ছবিও করেছি আমি কয়েকটা। আমার প্রথম ছবি ছিল 'প্রথম প্রতিশ্রুতি'। আশাপূর্ণা দেবীর সত্যবতী, ঐতিহাসিক চরিত্র। তারপরের সময়টা আর ছবি করিনি। চার বছরের বিরতি ছিল। পড়াশুনো, বোর্ডের পরীক্ষা চলছিল। স্কুল পাশ করে কলেজে ঢুকলুম। সেইসময় তপন সিনহার 'হারমোনিয়াম' ছবির অফার আসে। তপন সিনহা আমার বাবাকেই বলেছিলেন। উনি বোধহয় আমায় 'সত্যবতী'র ভূমিকায় দেখেছিলেন। 'হারমোনিয়াম' ছবির জন্য একদম নতুন জুটি খুঁজছিলেন তপন সিনহা। চার বছর পর আবার নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে গেলাম তপনবাবুর অফিসে। ওখানেই ভীষ্মদার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। শ্যুটিং শুরুর বেশ কিছুদিন আগে থেকে আমাদের দুজনকে রিহার্সাল করিয়ে নিয়েছিলেন তপনবাবু। ভীষ্মদার ডাকনাম মিঠু। তাই ওঁকে আমি সারাজীবন মিঠুদা বলেই ডেকে এসেছি।
'হারমোনিয়াম' ছবির কথা বললেই ভেসে ওঠে 'এমনি করেই যদি চলতে পারি' গানটা? কোথায় হয়েছিল আউটডোর শ্যুটিং?
সোনালী- শান্তিনিকেতন। 'হারমোনিয়াম' ছবির প্রথম শ্যুটিং হয় আমার আর ভীষ্মদার এই গানটাই। এই গানটা দিয়েই ছবির শ্যুটিং শুরু হয়। এক সপ্তাহের মতো আমরা শান্তিনিকেতনে ছিলাম। এই গানটার শ্যুটিং হয়েছিল ভোরবেলা। তপনবাবুর শ্যুটিং শিডিউল ভীষণ নিয়মমাফিক ছিল। ভোরবেলা থেকে সকাল নটা অবধি শ্যুট হত। আবার লাঞ্চের পর বিকেল তিনটে থেকে সাড়ে পাঁচটা অবধি। মাঝের সময়গুলো আমাদের গানবাজনা, খেলা, ঘোরা নানারকম সব চলত। আর ইউনিটে যেসব অভিনেতারা অভিনয় করেছিলেন শমিত ভঞ্জ, স্বরূপ দত্ত, ভীষ্ম, সন্তু মুখোপাধ্যায়- সব ছেলেরাই খুব ভালো গান গাইতে পারত। গানের আসরটা জমজমাট ছিল। সন্তুর গানের গলা ভীষণ সুন্দর ছিল। ভীষ্মদাই সন্তুকে তপন সিনহার কাছে এনেছিল। বাকি শ্যুটিং হয়েছিল স্টুডিওতে আর কলকাতার আনাচে-কানাচে।
ভীষ্মদা খুব খাদ্যরসিক ছিল। আমাদের বোলপুরে শ্যুটিং-এ বেশিরভাগ দিন পোস্তর পদ হত। তপন সিনহা ভাগলপুরের লোক, আমরাও এদেশি, আমাদের পোস্তর উপর ভীষণরকম দুর্বলতা। পোস্তর বড়া, আলুপোস্ত। আর ভীষ্মদা ছিল ইষ্টবেঙ্গলের সাপোর্টার। এটা নিয়ে আমাদের একটু লড়াইও হত।
https://youtu.be/QIbTFWs6sg0
'হারমোনিয়াম' ছবিতে আমরা নতুনরা সব বড় বড় অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছিলাম। ভীষ্মদার বাবা হয়েছিলেন সন্তোষ দত্ত। আমার বাবা হয়েছিলেন কালী ব্যানার্জি। ছায়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত বরণ, অনিল চ্যাটার্জি, আরতি ভট্টাচার্য সবাই ছিলেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার অরুন্ধতী দেবী যেমন এই ছবিতে অভিনয় করেন, তেমনই তপনবাবুর গোটা ইউনিটকে উনিই সামলাতেন। অরুন্ধতী দেবীর গানের গলা তো ভীষণ সুন্দর। আমরা গান গাইতে গাইতে শ্যুটিং-এ যেতুম, আবার ফিরতুম। তপন সিনহা নিজেও ভালো গান গাইতেন, গান লিখতেন, সুর করতেন। আমরা শান্তিনিকেতনে যেখানে শ্যুটিং করতাম তার সামনেই কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকতেন। ওঁকেও মিট করেছিলাম। অরুন্ধতী দেবী আমাকে নিয়ে গেছিলেন।
[caption id="attachment_2432391" align="aligncenter" width="1280"]
ভীষ্ম-সোনালী, দুজনের বাবার চরিত্র চিত্রণে সন্তোষ দত্ত ও কালী ব্যানার্জি[/caption]
অরুন্ধতী-কণিকা দুজনে তো ভীষণ বন্ধু ছিলেন? একসঙ্গে শান্তিনিকেতনে পড়াশুনো করেছেন...
সোনালী- ভীষণ বন্ধুত্ব। আমাকে অরুন্ধতী দেবী বলতেন, 'জানো তুমি কার সঙ্গে কথা বললে! কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড'।
এখন তাই ভাবি, অরুন্ধতী দেবী, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেজেন্ড শিল্পীদের কতটা সান্নিধ্য পেয়েছি। তখন না ছিল আইফোন, না ছিল ভালো ক্যামেরা। সেই ঘটনাগুলোই আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে থেকে গেছে।
আপনি 'হারমোনিয়াম'-এ অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রী বিভাগে বিদেশের পুরস্কার পেয়েছিলেন তো?
সোনালী- হ্যাঁ গোল্ডেন ক্রাউন এওয়ার্ড পেয়েছিলাম। সমস্ত এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে জিতেছিলাম। কোরিয়া থেকে পুরস্কারটা দেওয়া হয়েছিল।
'এমনি করেই যদি চলতে পারি' গানটার আর কোনও স্মৃতি আছে?
সোনালী- গানটা ভীষ্মদার লিপে গেয়েছিলেন তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর আমার লিপে হৈমন্তী শুক্লা। গানটা খুব হিট করেছিল। 'হারমোনিয়াম' ছবির প্রধান আকর্ষণ ছিল গান। আমাদের অভিনেতা অভিনেত্রীদেরও গান রেকর্ডিং-এ থাকতে হত। তপন সিনহা নিজেই গান লেখেন, সুর করেন। ছায়া দেবীর গলায় গান তো এ ছবিতে বিখ্যাত। অরুন্ধতী দেবীও গেয়েছিলেন।
সোনালী গুপ্ত মানেই শাড়িতে অভিজাত সুন্দরী। ছোট থেকেই কি সোনালী খুব শাড়িমনা মেয়ে ছিল?
সোনালী- কী সুন্দর প্রশ্ন! হ্যাঁ, ছোট্ট থেকেই শাড়ি পরতে ভালবাসতাম। পরিয়ে দিতেন মা (কাজল গুপ্ত)। বরাবরই শাড়িটা আমি আমার নিজের স্টাইলে পরেছি। নট টিপটপ, জাস্ট ক্যাজুয়াল। এখনও তাই।
ভীষ্ম গুহঠাকুরতার সঙ্গে কোনও ব্যক্তিগত স্মৃতি?
সোনালী- আমরা খুব ভালবন্ধু ছিলাম। সেটাই আজ ছিল বলতে হচ্ছে।
ভীষ্মদা আমাদের পরিবারের সঙ্গেও ভীষণ ক্লোজ ছিল। আমার বাবা মা-র স্নেহের পাত্র ছিল ভীষ্মদা। 'হারমোনিয়াম'-এর পর আমার বাবা দীনেন গুপ্ত তখন 'সানাই' ছবি করছিলেন। ভীষ্মদা ভেবেছিল বাবা ওকেই নায়ক করবেন। কিন্তু আমার বিপরীতে ছিল বুবুদা, শমিত ভঞ্জ। বাকি পুরুষ চরিত্রেও ভীষ্মদাকে নেননি বাবা। আসলে চরিত্রর সঙ্গে যাকে মানাবে তাঁকেই নিতেন বাবা। ভীষ্মদার খুব ইচ্ছে ছিল বাবার ছবিতে অভিনয় করার। তবে হয়নি বলে আমাদের সঙ্গে ভীষ্মদার মনান্তর কখনও হয়নি। ভীষ্মদার সঙ্গে চিরদিন আমার যোগাযোগ ছিল। প্রায়ই কথা হত আমাদের। এই তো কয়েক মাস আগেও ভীষ্মদার সঙ্গে আমার ফোনে শেষ কথা হয়েছিল।
আমাদের যোগাযোগটা চিরদিন ছিল। ওঁর স্ত্রী শাশ্বতী গুহঠাকুরতা, মেয়ে শ্রেয়া- সবাই আমার খুব কাছের। ভীষ্মদার মেয়ে শ্রেয়া তো ভীষণ ভালো গান করে। আমাদের আর মিঠুদাদের দুজনেরই শান্তিনিকেতনে বাড়ি আছে। শান্তিনিকেতনেও মিঠুদা গেলে দেখা হত। ওঁদের গুহঠাকুরতা বাড়িতে ভীষ্মদার মায়ের বড় বুটিক ছিল 'কুন্দহার'। এক কালে খুব নামকরা শাড়ির বুটিক ছিল সেটা।
https://youtu.be/X1IVpSbb4n0
'হারোমনিয়াম','বাঞ্ছারামের বাগান' বাদে সব ছবিতেই ছোট ছোট রোল পেয়েছেন উনি? বড় পরিচালকদের ছবিতে কাজ করলেও ছোট রোল। এই নিয়ে আজকাল উনি কিছু বলতেন আপনাকে? ওঁর গুণের কদর তো পাননি?
সোনালী- ভালো চরিত্র না পেলে সব শিল্পীরই তো ক্ষোভ থাকে। সিলেক্টিভ ছবিই ভীষ্মদা করত। চেষ্টা চালিয়ে গেছে ভালো ছবিতে অভিনয় করার। তবে সেই নিয়ে ওঁর আফশোস বা বলার কিছু ছিল না। হিরো হিসেবে একমাত্র 'হারমোনিয়াম'-ই করেছিল। পরে চরিত্রাভিনেতার রোল করেছে। সন্দীপ রায়ের অনেক ছবি করেছে।
ভীষ্ম গুহঠাকুরতা বহুদিন নিজেকে অন্তরালে রাখতেন, সেটা কেন?
সোনালী- অন্তরালে থাকেনি। প্রচারের আলো পাইনি। হয়তো শেষের দিকে কাজ সেরকম করেনি বলে। তপন সিনহাও তো শেষের দিকে ছবি করা কমিয়ে দেন। এখনকার পরিচালকরা ভীষ্মকে সে ভাবে অফার দেননি। ভীষ্ম নিজের জগতে থাকতে ভালবাসত। ওর এই নিয়ে কোন হতাশা ছিল না।
ছবি সৌজন্য - সোনালী বসুর ব্যক্তিগত অ্যালবাম।