সত্যিজিৎ রায়ের সান্নিধ্যে এসে তিনি শুধু বাংলা সিনেমা নয়, বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত এবং একটি গোটা সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গেও পরিচিত হন। তাঁর কথা, ‘রায় আমার মধ্যে এক সম্পূর্ণ সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেন। আমি এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম যে, সেসব আজও আমার সঙ্গে বেঁচে আছে।’

অরণ্যের দিনরাত্রি। সত্যজিৎ রায় ও সিমি গারেওয়াল।
শেষ আপডেট: 20 May 2025 17:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ নতুনভাবে ফিরে এসেছে সাম্প্রতিক কান চলচ্চিত্র উৎসবে। ১৯৬৯ সালের এই বাংলা ক্লাসিক স্থান পেয়েছে ৭৮তম কান উৎসবের ‘ক্লাসিকস’ বিভাগে। বিশ্বের বিখ্যাত পুরনো চলচ্চিত্রগুলোকে রিস্টোর বা পুনঃসংরক্ষিত করে দেখানো হয় সেখানে। এই ঐতিহাসিক প্রদর্শনীর মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন ছবির অন্যতম মুখ শর্মিলা ঠাকুর, সিমি গারেওয়াল, প্রযোজক পূর্ণিমা দত্ত, এবং সত্যজিতের বড় ভক্ত, মার্কিন পরিচালক ওয়েস অ্যান্ডারসন।
তবে কানের লাল কার্পেটে সবচেয়ে স্মরণীয় উপস্থিতি সিমি গারেওয়ালের। ৫৬ বছর আগে যে সিনেমার মাধ্যমে তিনি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম কাজ করেছিলেন, সেই সিনেমার হাত ধরেই প্রথমবার পা রেখেছেন কানের লাল গালিচায়। অনন্য সাদা পোশাকে, আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে সকলকে মুগ্ধ করে দিয়েছেন দুলি। কে বলবে, তাঁর বয়স হয়েছে ৭৬! কে-ই বা বলবে, সেদিন পর্দায় দেখা যাওয়া সেই ‘কালো’ মেয়েরই আজ এমন গ্ল্যামার!

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রোল’-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সিমি বলেন, ‘আমি এই সিনেমাটা করেছিলাম ১৯৬৯ সালে। ভাবতেই পারিনি, ৫৬ বছর পরে আমি এই সিনেমার হাত ধরে কানের রেড কার্পেটে উঠব। একজন বড় পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার এটাই মজা, তিনি তোমার জন্য একটা নতুন জগৎ খুলে দেন।’
সত্যজিৎ রায় গুপি গাইন বাঘা বাইন -এর পরে তৈরি করেন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে চার বন্ধুর ছুটি কাটাতে গিয়ে আত্মবিশ্লেষণের জার্নি উঠে আসে এই ছবিতে। মূল চরিত্রে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় ও সমিত ভঞ্জ। এই গল্পে সিমি গারেওয়াল অভিনয় করেন দুলি নামের এক আদিবাসী মহিলার চরিত্রে। তাঁর সঙ্গে সমিত ভঞ্জের চরিত্র হরির একটি যৌন সম্পর্কও তৈরি হয়।

সিমি বলেন, তিনি লন্ডনে থাকার সময় থেকেই সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত ছিলেন। এরপর রাজ কাপুরের বাড়িতে প্রথমবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয় সিমির। সেখানেই সত্যজিৎ তাঁর ‘মেরা নাম জোকার’-এ সিমির অভিনয়ের প্রশংসা করেন। একমাসের মধ্যেই তিনি নিজে সিমিকে চিঠি লিখে কলকাতায় স্ক্রিন টেস্টের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তখনও সিমি জানতেন না, তিনি আদিবাসী চরিত্রে অভিনয় করবেন।
সিমি বলেন, ‘আমি সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলায় কথা বলতে হবে নাকি? তিনি বলেছিলেন, না। খুব সাধারণ ভাঙা ভাঙা বাংলা। বাকিটা আমরা ম্যানেজ করে নেব।’
এই চরিত্রের জন্য প্রতিদিন তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যেত সিমির স্কিন কালার ডার্ক করতে। যদিও আজকের বিনোদনের দুনিয়ায় এই বিষয়টা বিতর্কিত, তবে সে সময়ে তা ছিল না। সিমি বলেন, ‘এই চরিত্রে আসলে একজন অভিজ্ঞ অভিনেতার দরকার ছিল। যিনি ক্যামেরার সামনে পারফর্ম করতে পারবেন।’
তিনি আরও জানান, শুটিংয়ের আগে এক সপ্তাহ ধরে আদিবাসী মহিলাদের পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। সত্যজিৎ রায় তাঁকে স্থানীয় এক দোকানেও পাঠান, যেখানে আদিবাসী মহিলারা মদ কিনতে আসতেন। তাঁদের কথা বলার ভঙ্গি, শরীরী ভাষা, হাঁটাচলার ধরন— সবটাই তিনি পর্যবেক্ষণ করে নিজের চরিত্রে ফুটিয়ে তোলেন।

‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির শুটিং হয়েছিল ঝাড়খণ্ডের পালামৌ জেলায়। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বলতে প্রায় কিছুই ছিল না সেখানে। তবু সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার আনন্দে সে সব অভাব-অভিযোগই তুচ্ছ বলে মনে হতো।
সিমি আরও জানান, সত্যিজিৎ রায়ের সান্নিধ্যে এসে তিনি শুধু বাংলা সিনেমা নয়, বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত এবং একটি গোটা সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গেও পরিচিত হন। তাঁর কথা, ‘রায় আমার মধ্যে এক সম্পূর্ণ সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেন। আমি এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম যে, সেসব আজও আমার সঙ্গে বেঁচে আছে।’
সিনেমার বিখ্যাত সিকোয়েন্স ‘মেমরি গেম’-এর কথাও মনে পড়ে সিমির। সেখানে ছ’জন চরিত্র একটি খেলা খেলে। রায় নিজেও পাজল, শব্দ খেলা ও ধাঁধার খুব বড় ভক্ত ছিলেন। শুটিংয়ের সময়েও তিনি সিমি ও অন্যদের সঙ্গে এসব নিয়ে খেলতেন।

সিমি তাঁর পরবর্তী বাংলা ছবি মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’-এর শুটিংয়ের সময় আবার সত্যজিৎ রায়কে ফোন করেছিলেন। সত্যজিৎ খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি এখানে? আমার কাছে তোমার জন্য নতুন একটা গেম আছে।’ এর পরেও সিমি ও সত্যজিৎ রায় নিয়মিত চিঠিপত্র চালাতেন, যা আজও সিমি সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো এসব চিঠি সত্যজিৎ রায় ফাউন্ডেশন-এ দান করে দেব।’
তবে সিমির আক্ষেপ একটাই। এত দিনের এত গভীর সম্পর্কের পরেও তিনি তাঁর শো ‘Rendezvous with Simi Garewal’ অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায়কে কখনও আনতে পারেননি।
৫৬ বছর পর এইসব পুরনো অভিজ্ঞতা নিয়ে কানের রেড কার্পেটে এভাবেই ধরা দিলেন সিমি গারেওয়াল। সত্যজিৎ রায়ের মতো একজন মহীরুহ পরিচালকের ছায়ায় সিমি জীবনের যে অনন্য পাঠ পেয়েছিলেন, তারই খানিকটা যেন ধরা পড়ল তাঁর স্মৃতিতে। শুধুই ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ নয়, এক বিশুদ্ধ শিল্পীসত্তার গভীর রোমন্থনের সাক্ষী হলেন অনেকে।