
শেষ আপডেট: 4 March 2024 15:08
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত হল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানেগানে 'শ্রদ্ধাঞ্জলি' অনুষ্ঠান। সমগ্র অনুষ্ঠানের সাক্ষী থেকে কলম ধরলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
গানেগানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হল কিংবদন্তী শিল্পী গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে। এক ঝাঁক তারকা শিল্পীর সুরের ঝরনা ধারায় ভেসে গেল রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহ। হাউসফুল রবীন্দ্রসদন আবার প্রমাণ করল বাংলা গানের শ্রোতা এখনও ফুরোয়নি। স্বর্ণযুগের গানের আবেদন এতটুকু কমেনি। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানের টাইমমেশিনে চড়ে আমরা ফিরে গেলাম সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে।
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের দিদি-বোনের সম্পর্ক ছিল। সন্ধ্যার সেই গানের ধারা প্রতি বছর অব্যাহত রাখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সন্ধ্যা জলসায় রবীন্দ্রসদনে যেন আবার ফিরে এলেন গীতশ্রী।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে পুষ্পার্ঘ্য প্রদান করে মাননীয় মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করলেন। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের শুরু হল ইন্দ্রনীল দত্তর গান দিয়ে। নবীন যুগের শিল্পী ইন্দ্রনীল গাইলেন 'হারজিৎ' ছবির 'মধুমালতী ডাকে আয়'। তারকাখচিত অনুষ্ঠানে প্রথম গানটি করা বেশ কঠিন। দর্শকের অনুভূতি বুঝে গাইতে হয়। সেই পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে পাশ করলেন ইন্দ্রনীল দত্ত। বিভবেন্দু ভট্টাচার্য গাইলেন যাত্রিক গোষ্ঠীর 'স্মৃতিটুকু থাক' ছবির 'কিছু খুশি কিছু নেশা ভরায়ে'। সন্ধ্যা কন্ঠে সুচিত্রা সেনের পিয়ানো বাজিয়ে সেই গান। বিভবেন্দুর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। দেবজিৎ দত্ত-তুসিমা ভট্টাচার্য 'রাগ যে তোমার মিষ্টি' গানে মন ভরালেন। সায়ন্তন অধিকারী ও অমৃতা সিনহার ডুয়েট 'চম্পা চামেলী গোলাপেরই বাগে' ফুল ফোটাল অনুষ্ঠানে। আরফিন রানা বেশ জমিয়ে গাইলেন 'ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা'। তবে সুর চড়িয়ে নিজের ঢংয়ে বেশি দ্রুতলয়ে গেয়ে ফেললেন উদীয়মান শিল্পী। বিশেষ ভাবে নজর কাড়লেন তৃষা পারুই। দুটি গানেই অনবদ্য তৃষা। দর্শকদের থেকে আরো গান গাইবার অনুরোধ এল তৃষার কাছে কিন্তু সময় যে বাঁধা। সেই ২০০৭ এর সারেগামাপার দ্বিতীয় স্থান বিজয়নী তৃষাকে লেজেন্ড সুরকার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ' এ মেয়ে সাধিকা'। তা অক্ষরে অক্ষরে আজও মিলে যায় তৃষার গানে।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্নেহাধন্যা আরো এক শিল্পী মধুরিমা দত্তচৌধুরী। মধুরিমার গানে আমরা পেলাম সেই সন্ধ্যা কন্ঠের ছায়া। মুগ্ধ করে দিলেন মধুরিমা। চেনা নামের মাঝেও এক উদীয়মান তরুণ মন ভরালেন অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও। চোখের আলো না থাকলেও গানেতে আলো জ্বাললেন বিল্বমঙ্গল সর্দার। সমবেত করতালিতে দর্শকরা বুঝিয়ে দিল বিল্বপত্রের মতোই তাঁর কন্ঠ পবিত্র। অরিত্র দাশগুপ্ত জমিয়ে দিলেন দুটি সন্ধ্যা-গানে।
সবার মাঝে নজর কাড়লেন অনিমেষ সিকদার। এক বেঁটেখাটো প্রৌঢ় মঞ্চে উঠে মাইকে গলা ফেলতে চমকে গেলেন সবাই। অনিমেষ সিকদারের কন্ঠ দিয়ে বেরল অবিকল সন্ধ্যা কন্ঠে 'ঝরা পাতা ঝড় কে ডাকে, বলে তুমি নাও আমাকে, আমায় কেনো একটি বার ও ডাকলে না। শরীরে পুরুষ কন্ঠে সন্ধ্যা, শুনে আপ্লুত দর্শকরা আরো একটিবার গান গাইতে ডাকলেন শিল্পীকে। অনেক শিল্পী থাকায় কথা রাখা সম্ভব হল না। তবে অনিমেষ সিকদার ছিলেন অনুষ্ঠানের ম্যাজিক।
সুতপা ভট্টাচার্যের কন্ঠটি বেশ আনকোরা তবু আরো যেন কিছু দেবার ছিল তাঁর গানের সন্ধ্যা তর্পণে। মান্না কন্ঠী পল্লব ঘোষ সেই মান্না ঘরানাতেই থাকলেন 'আমি যে জলসাঘরে' গেয়ে। এই গানটি যে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিতে সন্ধ্যাও গেয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী তুষার দত্ত অসাধারণ। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আদতে তো একজন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। সেইদিকটা তুষার দত্তের 'পথ ছাড়ো ওগো শ্যাম' গানে আমরা টের পেলাম। বাংলাদেশের 'সূর্যকন্যা' ছবিতে 'আমি যে আঁধারে বন্দিনী' সন্ধ্যার বিরল গা ছমছমে গানটিও শোনালেন তুষার দত্ত। এরকমই গা ছমছমে গান 'আমি আঁধার আমি ছায়া' সন্ধ্যা 'জিঘাংসা' ছবিতেও গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে পঞ্চাশের দশকে।
সন্ধ্যা শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানকে স্বর্গীয় পর্যায়ে নিয়ে গেলেন ইন্দ্রাণী সেন, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শম্পা কুণ্ডু। অনেকদিন পর ইন্দ্রাণী সেন লাইভ অনুষ্ঠানে ধরা দিলেন। কন্ঠে একেবারে সেই নাইন্টিজের ছোঁয়া। তবু সুমিত্রা কন্যা বললেন "আজ আমার গলা খারাপ, ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন"। কিন্তু ইন্দ্রাণীর কন্ঠে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল শ্রোতারা। কী দুর্দান্ত গাইলেন ইন্দ্রাণী সেন, 'মায়াবতী মেঘেরও তন্দ্রা' , যা মনে করিয়ে দিল রাধাকান্ত নন্দী-সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের যুগলবন্দী। 'ওগো সিঁদুর রাঙা মেঘ' দ্বিতীয় গানেও অনবদ্য ইন্দ্রাণী। কালো শাড়িতে বাংলা গানের রাধিকা শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চেএলেন। শ্রীরাধা সুচিত্রা-সন্ধ্যা যুগলবন্দী দুটি গানে সত্যি মধু ঢেলে দিলেন প্রতিটি দর্শকের কানে। তৃতীয় গান গাইবার অনুরোধ এলে শ্রীরাধা আবার সন্ধ্যা-সুচিত্রা জুটির 'এই যে কাছে ডাকা ... খেলা নয়' গেয়ে দর্শকের চাওয়া-পাওয়া ভরিয়ে দিলেন। শম্পা কুণ্ডু বললেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান গেয়ে তিনি আজ অগ্নিপরীক্ষা দিতে এসেছেন। যে গান গাইবেন খুব কঠিন গান। 'গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু' শম্পার কন্ঠে হয়ে থাকল সন্ধ্যা শ্রদ্ধাঞ্জলির সেরা উপস্থাপন। দর্শকের উচ্ছসিত করতালি বুঝিয়ে দিল শম্পা অগ্নিপরীক্ষায় সফল। তিন গায়িকার পারফরমেন্স অনুষ্ঠানের সেরা প্রাপ্তি।
জয়তী চক্রবর্তী শোনালেন সন্ধ্যার অশ্রুত একটি গান 'আমি শুনি ওগো শুধু শুনি আমি'। যেন সন্ধ্যা সাধনা করলেন জয়তী। যে গানটির প্রশংসা স্বয়ং সন্ধ্যা কন্যা সৌমি সেনগুপ্ত করেছেন সামাজিক মাধ্যমে। জয়তী গান শেষে গীতশ্রীর একটি স্মৃতি ভাগ করে নিয়ে বললেন," একবার একটি বেসরকারি চ্যানেলের প্রভাতী সঙ্গীতানুষ্ঠানে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটি গান গেয়েছিলাম। কিন্তু ওঁর গান আমার বিষয় নয়। তবু আজকের মতোই সকলের অনুরোধে গেয়েছিলাম। গানটি শুনে তুলেছিলাম। শিখে গাওয়া আর শুনে গাওয়ার মধ্যে তো তফাত থাকেই। একটু ভুলচুক হয়েছিল। সেদিন বিকেলবেলা আমার কাছে এক নারী কন্ঠে অপ্রত্যাশিত ফোন এল। তিনি আর কেউ নন কিংবদন্তী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। উনি আমার গানের প্রশংসা করলেন সেগুলো আমার জীবনের সঞ্চয় আশীর্বাদ। কিন্তু তার সঙ্গে একটা ভারী দামি কথা বললেন " তুমি তো শিল্পী! কখনও নিজের অজানা কোনও জায়গায় বিচরণ করার চেষ্টা কর না। সেটা শ্রোতাদের কাছে ভাল বার্তা পৌঁছে দেয়না। " সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এই কথা আজীবন মনে রেখেছি।"
এমন অকপট স্বীকারোক্তি ক'জন এ যুগের শিল্পী করতে পারেন দর্শকভরা রবীন্দ্রসদনে! জয়তী চক্রবর্তীর এই কথা তাঁর খামতি নয়, তাঁর সততার নজির গড়ল।
মানসী মুখোপাধ্যায়ের কাছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় হলেন সন্ধ্যা কাকিমা। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ছিলেন শ্যামল গুপ্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। মানসী শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুরে সন্ধ্যার দুটি গান শোনালেন। শিল্পীরা প্রতিটি গানের সুরকার গীতিকারদের নাম উল্লেখ করে গাইছিলেন যা প্রশংসনীয়। সেই সূত্রেই দর্শকরা চিনল সুরকার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কেও। অনুষ্ঠানের শেষ গান শুভঙ্কর ভাস্করের 'দু চোখের বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফোটে যে স্মৃতির রজনীগন্ধা তখনি তো আসে গো শ্রাবণ-সন্ধ্যা ...' রেশ রেখে গেল।
শিল্পী তালিকায় মনোময় ভট্টাচার্যর নাম থাকলেও তিনি না আসায় 'শেষ হয়েও হইলনা শেষ' চিত্তে দর্শকরা বাড়ি ফিরল। তবু এমন সন্ধ্যা খুবই কম আসে। এত সেরা শিল্পী সমন্বয়ে বাংলা গানের জলসা দেখে যেন সুরের ঝরনায় স্নান করে উঠলাম।