সময়টা যেন একটা পুরনো ক্যাসেট, যার এক পিঠে নয়ের দশকের মিষ্টি প্রেম আর অন্য পিঠে আজকের ঝলমলে ইন্টারনেট দুনিয়া। মাঝখানে দু'হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। যাঁর একটা হাসি আজও আমাদের মন ছুঁয়ে যায়।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 2 November 2025 08:08
ঠিক রাত বারোটা। কোটি কোটি মোবাইল স্ক্রিনে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। নোটিফিকেশনের টুংটাং শব্দ। সোশ্যাল মিডিয়ায় টাইমলাইনে ভেসে উঠল একটি পোস্ট, "হ্যাপি বার্থ ডে কিং খান!" নিমেষে স্ক্রল থামিয়ে দিল অসংখ্য তরুণ-তরুণী। কেউ হয়তো তখনও কলকাতার কফি শপে, কেউ লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় প্রেমিক-প্রেমিকার হাত ধরে হাঁটছে, আবার কেউ নিউ ইয়র্কের ঘরে একলা বসে আছে। চোখের সামনে মুহূর্তে ভেসে এল সেই চেনা মুখ, 'বাজিগর' থেকে 'পাঠান' পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ যাত্রার ঝলক। সেই চেনা হাসি, দু'হাত প্রসারিত করা সেই 'আইকনিক' স্টেপ। আর কমেন্ট বক্সে উপচে পড়ল আবেগ। কেউ লিখে ফেলছেন, "কিং ইজ হেয়ার!"। তো কেউ কেবল একটি 'লাভ ইমোজি' দিয়েই বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর প্রেমে বারবার পড়া যায়। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে...
'তুঝ মেঁ রব দিখতা হ্যায়'
প্রজন্ম বদলে যায়, কিন্তু এই মুহূর্তেরা বদলায় না। সময়টা যেন একটা পুরনো ক্যাসেট, যার এক পিঠে নয়ের দশকের মিষ্টি প্রেম আর অন্য পিঠে আজকের ঝলমলে ইন্টারনেট দুনিয়া। মাঝখানে দু'হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। যাঁর একটা হাসি আজও আমাদের মন ছুঁয়ে যায়।
ভাবলে অবাক লাগে, এই 'ব্যস্ত' দুনিয়ায়, যেখানে ট্রেন্ড বদলায় ঘন্টায় ঘন্টায়, যেখানে তারকারা আসে আর হারিয়ে যায় ইনস্টাগ্রামের রিলের ভিড়ে, সেখানে এই মানুষটি আজও অটুট। যেন সময়ের নিয়ম তাঁর কাছে এসেই থেমে যায়। কী এমন জাদু আছে এই মানুষটির? কেন 'আজকের' প্রজন্মও (Gen Z) তাঁর প্রেমে পড়ে। তাঁকে দেখেই ভালবাসতে শেখে। তাঁকে দেখেই প্রেমিকার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে—
'তেরি আঁখোঁ কি নমকিন মাস্তিয়াঁ,
তেরি হাসি কি বেপারওয়াহ গুস্তাখিয়াঁ,
তেরি জুলফোন কি লেহরতি আংড়াইয়াঁ,
নেহি ভুলুঙ্গা ম্যায়, জব তক হ্যায় জান, জব তক হ্যায় জান...'
'লার্জার দ্যান লাইফ' কিং খান
Gen Z, যাঁরা 'রিয়েল' আর 'রিলেটেবল' তারকার খোঁজে থাকে, তাঁরা বারবার ফিরে আসে এই 'লার্জার দ্যান লাইফ' কিং খানের কাছে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে খুব গভীরে।
Gen Z-কে প্রায়ই বলা হয় তাঁরা সবকিছুতে একটা দূরত্ব বা 'আইরনি' বজায় রেখে চলতেই পছন্দ করে। কিন্তু শাহরুখের কাছে সেই দূরত্ব নেই। তাঁর প্রেম বরাবরই ছিল খোলা আকাশের মতো। গ্র্যান্ড, ড্রামাটিক। আর সেটারই প্রেমে পড়েছে আজকের প্রজন্ম।
যখন তিনি বলেন, “প্যায়ার করো, ডরো মৎ”, তখন সেটা শুধু সংলাপ নয়। সেটা সাহস জোগায় সেই সব প্রেমিক-প্রেমিকাদের মনে, যাঁরা ভয়ে সম্পর্ক থেকে পিছিয়ে এসেছে। সেই সব অন্ধ প্রেমিকদের মনে আশা জাগায়, যাঁরা কখনও মনের কথা বলতেই পারেনি পছন্দের মানুষটিকে। তিনি শিখিয়েছেন, নিজের অনুভূতি পুরোপুরি প্রকাশ করাটা মোটেও দুর্বলতা নয়। তাই বলেছেন—
"প্যায়ার দোস্তি হ্যায়। আগর ওহ মেরি সবসে অচ্ছি দোস্ত নেহি বন সকতি, তো ম্যায় উসে কভি প্যায়ার কর হি নেহি সকতা। কিউঙ্কি দোস্তি বিনা তো প্যায়ার হোতা হি নেহি।"
'কুছ কুছ হোতা হ্যায়, তুম নেহি সামঝোগে'
শাহরুখ কখনও কাঠখোট্টা নায়ক ছিলেনই না। 'কাভি হ্যাঁ কাভি না'-এর সুনীল ছিল প্রেমে বারবার ব্যর্থ, কিন্তু হার না মানা। 'কাল হো না হো'-এর আমান মৃত্যু ভয় জয় করে হাসিমুখে অন্যের জীবনে আলো ছড়িয়েছিল। এই চরিত্রগুলো Gen Z-এর খুব কাছের। আজকের প্রজন্ম বড্ড নিখুঁত, তাও তাঁরা সেই আমানকেই খোঁজে। আজকের দুনিয়ায় “সুপারস্টার” ধারণাটাই প্রায় বিলুপ্ত। ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটকের অ্যালগরিদমে ভেসে আসে একের পর এক ইনফ্লুয়েন্সার। তারপরেও কখনও টাইমলাইনে 'কিং খান' এলেই, কেউ ঢুকে পড়েন কমেন্ট সেকশনে, কেউ আবার শেয়ার বাটনে। যতই হোক, তিনি শুধু অভিনেতা নন, তিনি একরাশ ভরসা। ব্যর্থতা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উঠে আসার নামই তো শাহরুখ খান। কারণ- 'দিল তো হার কিসিকে পাস হোতা হ্যায়ঁ, লেকিন সব দিলওয়ালে নেহি হোতে...'
'কুল' দুনিয়ায় শাহরুখ 'ম্যাজিক'
আমরা বড় হয়েছি এমন এক সময়ে, যখন বলিউড বদলাচ্ছিল। আবেগ কমে যাচ্ছিল, যুক্তি বাড়ছিল। নায়কেরা অল্প সংলাপেই নজর কাড়ছিল। কিন্তু শাহরুখ? তিনি কোনওদিন চুপ ছিলেন না। তাঁর প্রেম মানেই দু'হাত বাড়িয়ে প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে একের পর এক সংলাপ বলে যাওয়া। আর সেই নাটকেই যেন আমরা নিজেদের অনুভূতিগুলোকে খুঁজে পেতাম। আজকের ‘কুল’ দুনিয়ায় তাঁর এই অকৃত্রিম আবেগই তো ছিল আসল রোম্যান্স।
পর্দার বাইরে, শাহরুখ অন্যরকম মানুষ। যিনি নিজেকে নিয়েও খোলাখুলি হাসতে জানেন। বয়স তাঁর গায়ে লাগে না, বরং তাকে আরও পরিণত করে। তিনি উপদেশ দেন না। তিনি ভাবতে শেখান। তাই আজও সেই ভাবনাতেই ভাবে 'জেনারেশন জেড' প্রজন্মটা।
“কিং খান! কিং খান...”
২০২৩ সালে যখন 'পাঠান', 'জওয়ান' আর 'ডানকি' মুক্তি পেল, আমরা জানতাম পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। তবুও হলে ঢুকে দেখলাম, প্রচুর মানুষ চেঁচিয়ে উঠেছিল “কিং খান! কিং খান...”, তখন মনে হয়েছিল, এ যেন এক যৌথ উল্লাস। এটা শুধু এক তারকার কামব্যাক নয়, এক প্রজন্মের ঘরে ফেরা। এই আবেগ থেকে যাবে, এটা হারানোর নয়...
'লাস্ট অফ দ্য স্টার'
যাঁরা তাঁর সোনালি যুগের পর জন্মেছেন, তাঁরাও তাঁকে ভালবাসেন। কারণ শাহরুখ মানে শুধু সাফল্য নয়, অধ্যাবসয়ও। যে মানুষ মুম্বইয়ে এসেছিলেন সামান্য ক'টা টাকা নিয়ে, তিনিই নিজেকে গড়ে তুলেছেন 'লেজেন্ড' হিসেবে।
আর এখন, বয়স ষাট। যত দ্রুতই এগোক পৃথিবী, আমরা এখনও তাঁর জন্য অপেক্ষা করি। তাঁর ধীরে বলা সংলাপের জন্য, তাঁর চোখের সেই অবিচল বিশ্বাসের জন্য। যা আমাদের শেখায় ভালবাসা এখনও বেঁচে আছে। বাঁচিয়ে রেখেছেন 'বাদশা'।
এই কারণেই, সমস্ত হিসেব-নিকেশ আর অ্যালগরিদমের বাইরেও, Gen Z আজও 'কিং খান'-এর ম্যাজিককে বিশ্বাস করে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ... শাহরুখ থেকে যাবেন। বহু বছর পরেও কেউ দু'হাত বাড়িয়ে 'আইকনিক স্টেপ'টা করে বলবে-
'জিয়ো! খুশ রহো! মুসকুরাও! কয়া পতা কাল হো না হো!'