ভূতেদের এই ছন্দময় মিছিল বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অমোঘ সৃষ্টি।

শেষ আপডেট: 26 February 2026 14:05
“আহা ভূত, বাহা ভূত, কিবা ভূত, কিম্ভূত
বাবা ভূত, ছানা ভূত, খোঁড়া ভূত, কানা ভূত
কাঁচা ভূত, পাকা ভূত, সোজা ভূত, বাঁকা ভূত
রোগা ভূত, মোটা ভূত, আধা ভূত, গোটা ভূত—”
ভূতেদের এই ছন্দময় মিছিল বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অমোঘ সৃষ্টি। এই পঙ্ক্তিগুলি লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর কল্পনায় ভূতেরা ছিল ভয়ের নয়, বরং এক আশ্চর্য, রসিক এবং অদ্ভুত জগতের বাসিন্দা। আর সেই জগতই পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’-এ, বিশেষ করে সেই বিখ্যাত গান ‘ভূতের রাজা দিল বর’-এ।
বহু বছর পর, আবার যেন সেই একই ছায়া ফিরে এল বলিউডের এক নতুন গানে। আজই মুক্তি পেয়েছে রামজি আকে ভালা করেঙ্গে— আসন্ন হিন্দি ছবি ‘ভূত বাংলা’-র একটি গান। গানটির লিরিক্সে শোনা যায়—
‘কালা ভূত, গোরা ভূত
লম্বা ভূত, ছোটা ভূত
নর ভূত, মাদা ভূত
সিধা ভূত, সাধা ভূত!’
এই শব্দবন্ধ শুনলেই বাংলা দর্শকের মনে অনায়াসেই ভেসে ওঠে সেই চেনা ছন্দ— “আহা ভূত, বাহা ভূত…”। কেবল বিষয় নয়, তাল, ছন্দ এবং শব্দের বিন্যাসেও মিল এতটাই স্পষ্ট যে তুলনাটা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এই নতুন গানের সুরকার প্রীতম। আর গানটির কথা লিখেছেন কুমার। কণ্ঠ দিয়েছেন আরমান মালিক এবং আরভান। বলিউডের বাণিজ্যিক ছবির জন্য তৈরি এই গানটি নিঃসন্দেহে মজার, কিন্তু বাংলা দর্শকের কাছে এটি কেবল একটি নতুন গান নয়— বরং এক পুরনো স্মৃতির পুনরাগমন। (Satyajit Ray, Goopy Gyne Bagha Byne, Bhooter Raja Dilo Bor, Bhoot Bangla, Ram Ji Aake Bhala Karenge, Pritam)
এখানেই প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়। কারণ প্রীতম চক্রবর্তী বাঙালি এবং এমন একজন সুরকার, যিনি সংগীতের ইতিহাস এবং নানা ধারার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত। ফলে তিনি সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি দেখেননি বা শোনেননি— এমনটা ভাবা প্রায় অসম্ভব। এই মিল নিছক কাকতালীয়, না কি সচেতন বা অবচেতন প্রভাব— তা জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ফোনে তিনি সাড়া দেননি। মেসেজ পাঠানো হয়েছে। তাঁর উত্তর পাওয়া গেলে, সেই বক্তব্য অবশ্যই এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এই ঘটনাই প্রথম নয়। এর আগেও প্রীতমের সুর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলা ব্যান্ড মহীনের ঘোড়াগুলি-র বিখ্যাত গান “পৃথিবীটা নাকি” অনেকের মতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল গ্যাংস্টার ছবির জনপ্রিয় গান “ভিগি ভিগি রাত”–এর সুর বিন্যাসে। অন্যদিকে ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’ ছবির বলিউডের জনপ্রিয় পার্টি গান ‘বদতমিজ দিল’ গানটির সুরকার প্রীতম। তবে বাংলা
সংগীতপ্রেমীদের একাংশের মতে, এই গানের সুর ও মেজাজে স্পষ্ট মিল রয়েছে অঞ্জন দত্ত-র বিখ্যাত গান র‘ঞ্জনা আমি আর আসব না’-র সঙ্গে। গিটার-নির্ভর কম্পোজিশন এবং ছন্দের ধরণে সেই পরিচিত আবহ অনেকেরই মনে করিয়ে দেয় অঞ্জনের কালজয়ী সৃষ্টি।
‘ভূত বাংলা’ ছবিটি নিজেই একটি হরর-কমেডি ঘরানার ছবি, যেখানে ভয়ের সঙ্গে হাস্যরসের মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। এই ধারার ছবিতে সংগীত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা গল্পের পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু যখন সেই সংগীতের ভেতরে অন্য এক কিংবদন্তির প্রতিধ্বনি শোনা যায়, তখন বিষয়টি আর শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না— তা হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।
সত্যজিৎ রায়ের ভূতেরা ছিল একেবারে তাঁর নিজের সৃষ্টি— কল্পনার, ছন্দের এবং বুদ্ধির এক অনন্য সমন্বয়। সেই ভূতেরা আজও বেঁচে আছে, নতুন প্রজন্মের মনে। কিন্তু যখন অন্য ভাষার, অন্য সময়ের একটি গানে সেই একই ছন্দের প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে, তখন প্রশ্নটা অনিবার্য হয়ে ওঠে— এ কি নিছকই কাকতালীয়, না কি অতীতের প্রতিধ্বনি, যা আবার ফিরে এসেছে অন্য এক নামে?