Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্লসামনে কাজল শেখ, মমতা কথা শুরু করতেই হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ অনুব্রতর! সিউড়িতে কী ঘটলEPL: নায়ক ওকাফর! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৪৫ বছরের অভিশাপ মুছল লিডস, রক্ষণের ভুলে ডুবল ম্যান ইউAsha Bhosle: 'এত ভালবাসার সবটাই তোমার...,' ঠাকুমার স্মৃতি আঁকড়ে আবেগঘন পোস্ট নাতনি জানাইয়েরSupreme Court DA: ডিএ নিয়ে সময়সীমা বৃদ্ধির আর্জি, বুধবার রাজ্যের মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্টনির্বাচকদের শর্টলিস্টে বৈভব! আয়ারল্যান্ড সফরে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা, ভাঙতে পারেন সচিনের রেকর্ডIPL 2026: ‘কাছের অনেককে বলেছিলাম, বৈভবকে প্রথম বলে আউট করব!’ কথা দিয়ে কথা রাখলেন প্রফুল্ল

নাচের স্টেপ দিয়েই মাধুরীদের শরীরী আবেদন ফুটিয়ে তুলতে শিখিয়েছিলেন মাস্টারজি, তাতে অশ্লীলতা ছিল না কিন্তু

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বেটা ছবির শ্যুটিং চলছে। 'ধক ধক করনে লাগা' গানের সঙ্গে নাচ তুলিয়েছেন সরোজ খান। প্রথম দৃশ্য দেখেই ছেঁটে ফেলে দিতে বলেছিল সেন্সর বোর্ড। সেন্সর বোর্ডের এক জুরি মহিলা অভিযোগ তুলেছিলেন, গানের সঙ্গে নায়িকার 'বুক ধকধক' করা রীত

নাচের স্টেপ দিয়েই মাধুরীদের শরীরী আবেদন ফুটিয়ে তুলতে শিখিয়েছিলেন মাস্টারজি, তাতে অশ্লীলতা ছিল না কিন্তু

শেষ আপডেট: 3 July 2020 12:25

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বেটা ছবির শ্যুটিং চলছে। 'ধক ধক করনে লাগা' গানের সঙ্গে নাচ তুলিয়েছেন সরোজ খান। প্রথম দৃশ্য দেখেই ছেঁটে ফেলে দিতে বলেছিল সেন্সর বোর্ড। সেন্সর বোর্ডের এক জুরি মহিলা অভিযোগ তুলেছিলেন, গানের সঙ্গে নায়িকার 'বুক ধকধক' করা রীতিমতো অশ্লীল। অথচ পোশাকে এতটুকু ঝুঁকি নেই, নেই শরীরকে আলাদা করে উন্মুক্ত দেখানোর কোনও চেষ্টা। শুধুই নাচের স্টেপ, যার মাধ্যমে যৌবনের আবেদন যেন চলকে পড়ছিল মাধুরীর প্রতিটি হিন্দোল থেকে। তাই দেখেই বুঝি উঠল প্রশ্ন। সরোজ পাল্টা তর্ক করেছিলেন, নায়িকার বুক তো ধকধকই করছে। বুকের ভেতরে ধকধক করছে, সেই অবস্থায় নাচলে কি বাইরেটা স্থির থাকবে? শেষ অবধি 'ধকধক করনে লাগা' নাচটা পুরোটাই অনুমোদন পেয়ে যায়। তার পরে তো ইতিহাস। আগুনবসনা মাধুরীর সেই ধকধক নাচ আজও তামাম ভারতের মাথা ঘুরিয়ে দেয়। তার পরে ধরা যাক, তাল ছবিতে ঐশ্বর্যা রাইয়ের নাচ 'রমতা যোগী'। শ্বেতশুভ্রবসনা ঐশ্বর্যার নাচে এতটুকু যৌনতা প্রদর্শন নেই, অথচ প্রতিটি স্টেপ যেন পাগল করে দেওয়ার মতো ইঙ্গিতবাহী।

ঢাকার মধ্যেও না-ঢাকার গল্প বলতে জানতেন সরোজ খান। কোরিওগ্রাফিকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন। চোখের ইশারায় ঝড় তোলা হোক, বা কোমরের সামান্য হিন্দোলে নিষিদ্ধের প্রতি আহ্বান ঘোষণা করা-- সহজে সুন্দর নাচ তোলার জুড়ি ছিল না তাঁর।
আজ চলে গেলেন সরোজ খান। ৭১ বছর বয়সে হৃদরোগ কেড়ে নিল বলিউডের অন্যতম গুণী শিল্পীকে।

সরোজ নয়, নির্মলা নাম ছিল তাঁর

ছোট্ট নির্মলার বাবা-মা পাকিস্তান থেকে ভারতের মহারাষ্ট্রে চলে আসেন দেশভাগের পরপর। বাবা ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। কিন্তু দেশভাগের ট্র্যাজেডিতে ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে তাঁরা। সেই সময়েই নির্মলার জন্ম, ২২ নভেম্বর ১৯৪৮। নির্মলা নাগপাল তাঁর আসল নাম। পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু শরণার্থী হয়ে মহারাষ্ট্রের মাহিমে ছোট্ট ঘুপচি ঘরে এসে দিনাতিপাত করতে থাকে নির্মলার পরিবার। এমন সময়ে তিন বছরের নির্মলার অদ্ভুত এক অসুখ হল। আলো আঁধারিতে নিজের ছায়া দেখে বিভিন্ন ভাবে হাত-পা নাড়াত সে! অভাবের মধ্যেও বাবা-মা মেয়েকে নিয়ে ছুটলেন চিকিৎসকের কাছে। ডাক্তারবাবু মেয়েকে দেখে বললেন "আরে আপনাদের মেয়ে তো নাচতে চায়। নাচেই ওর মন। ওকে বরং নাচ শেখান, মুম্বইয়ের ফিল্মি জগতে ঢোকান। আপনাদেরও অভাব মিটবে।" পরে সেই চিকিৎসকই নির্মলাকে নিয়ে গেছিলেন ফিল্মের দুনিয়ায়। খুব ছোট্টবেলা থেকেই নেশা আর পেশা এক হয়ে গেল ছোট্ট মেয়েটির। যদিও রুপোলি জগতে আসা মূলত অভাবেই, তবু এত ছোট বয়সে নাচের প্রতি এমন সহজাত ভালবাসা তাঁর সুযোগের সব দরজা খুলে দিল। নির্মলা থেকে রুপোলী পর্দায় তাঁর নতুন নাম হল বেবি সরোজ। অভিনেত্রী শ্যামার ছোটবেলার রোলে শিশুশিল্পী হয়ে হিন্দি ছবিতে প্রথম অভিনয় ও নাচ সরোজের। এরপরের ১৯৫৩ সালের ছবি 'আগোস'-এ বেবি নাজ আর বেবি সরোজ ছিল শিশুশিল্পী ডান্সার রাধা কৃষ্ণর রোলে। এই নাচের গান গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর আর সুধা মালহোত্রা। https://twitter.com/BAGWATl/status/1278866537408090112

মধুবালার সহশিল্পী সরোজ

বছর দশেক বয়স তখন সরোজের। শিশুশিল্পী হওয়ার দিন ফুরিয়েছে, আবার অভিনেত্রী হওয়ারও বয়স হয়নি। তখনই ইন্ডাস্ট্রির কিছু মানুষের পরামর্শে গ্রুপ ডান্সার হিসেবে ফিল্মে কাজ করতে শুরু করল সে। যদিও নাচ সে কখনওই শেখেনি। প্রথম গ্রুপ ডান্সার হিসেবে সরোজের কাজ মধুবালার গানে। শক্তি সামন্তর 'হাওড়া ব্রিজ' ছবি। মধুবালার লিপে গান 'আইয়ে মেহেরবান'। ওই ক্যাবারে গানেই গ্রুপ ডান্সার হিসেবে টুপি পরে একটি ছেলের ভূমিকায় নাচ করেন সরোজ। 'আইয়ে মেহেরবান' মধুবালার আইকনিক গান, কিন্তু ওই গানে যে সরোজ খানও পুরুষবেশে ছিলেন, তা অনেকেই জানেন না।

What is it like to be a background dancer in Bollywood? - Quora

গুরু ও স্বামী সোহানলালের সঙ্গে পরিচয়

আচমকা বাবার মৃত্যুতে অথৈ জলে পড়ে সরোজদের সংসার। সরোজ ছাড়াও চার মেয়ে আর এক শিশু পুত্রকে নিয়ে সরোজের মা দিশাহারা। কী খাবে এতগুলো মুখ! সরোজ তখন চেষ্টা করছেন টুকটাক কাজের। পাচ্ছেন না। খুব অভাবে একদিন দেওয়ালির সময়ে সরোজ সাহায্য চেয়েছিলেন শশী কাপুরের থেকে। গ্রুপের ডান্সার হিসেবেই চেয়ে নেওয়া পেমেন্ট। শশী কাপুর সরোজকে দুশো টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, যা তাঁর পেমেন্টের থেকে অনেক বেশি। অতদিন আগে ২০০ টাকার দামও ছিল অনেক। সে সাহায্য সরোজ আজীবন মনে রেখেছেন। এর পরেই সরোজ সহযোগী কোরিওগ্রাফার হিসেবে বলিউড কোরিগ্রাফার বি সোহানলালের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান নিজের প্রতিভার জোরে। যেখানে সব মেয়েরা বি সোহানলালের কাছে শাড়ি, বিন্দি, বিনুনীতে আসত, সরোজ একা আসতেন শার্ট প্যান্ট পরে, বয়েজ কাটে। তাঁর প্রতিভা দেখে গুরুজী সরোজকে সহকারী বানিয়ে নেন। সেখান থেকেই বৈজয়ন্তীমালা থেকে হেলেন সবাইকে ডান্স শিখিয়েছেন সরোজ এবং নিজেও ভরতনাট্যম, মণিপুরী, পশ্চিমী হিপহপে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। এইসময়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই শিক্ষাগুরু বি সোহানলালকে বিয়ে করেন সরোজ। চোদ্দো বছরেই সরোজ প্রথম মা হলেন। এই সময়ে রাজকুমার সন্তোষীর পিতা বি.এল.সন্তোষী একটি ছবি পরিচালনা করছিলেন। কোরিওগ্রাফার ছিলেন সরোজের গুরু সোহানলাল। কিন্তু তিনি তখন রাজকাপুর-বৈজয়ন্তীমালার 'সঙ্গম' ছবির কোরিওগ্রাফ করতে ব্যস্ত বিদেশে। সন্তোষীর ছবিতে নাচ শেখাতে গুরুর প্রতিনিধি হয়ে গেছিলেন সরোজ। মাত্র চোদ্দো বয়স বছরে সরোজ কোরিওগ্রাফ কিভাবে করতে হয় শিখে গেল।

দ্বিতীয় বিয়ে করে ধর্মান্তর

সরোজের জীবনে নতুন বিপর্যয়। যে গুরু ও স্বামী তাঁর নাচকে ভালোবেসেই তাঁকে বিয়ে করেছেন, সেই মানুষটিই দাবি করে বসলেন সন্তান মানুষ করার জন্য নাচ ছাড়তে হবে। ডান্সার বৌ তাঁর চায় না! কিশোরী সরোজ স্বামী সংসার ছেড়ে সন্তান নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে এলেন নাচকে ভালোবেসে। নাচই যার জীবন, সে নাচ ছাড়া কী করে বাঁচবে! সিঙ্গেল মাদার হিসেবে নতুন লড়াই শুরু সরোজের। এমন সময়ে সরোজ খানকে সুযোগ দিলেন নায়িকা সাধনা। সাধনার প্রোডাকশনের ছবি "গীতা মেরা নাম" চলচ্চিত্রে সরোজ নিজে কোরিগ্রাফার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেন ১৯৭৪ সালে। এর পরে সরোজ এক জন পাঠান ব্যক্তিকে বিয়ে করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন। সেদিন থেকেই সরোজ হলেন সরোজ খান।

Saroj Khan: Masterji to the stars

এবার সংসার, স্বামী, সন্তান সবকিছু গুছিয়ে নতুন উদ্যমে কাজে নামলেন। রাজশ্রী ফিল্মস সরোজকে ব্রেক দিল 'জাসবাত' ছবিতে। যেটা ছিল রাজ বব্বরের প্রথম ছবি। প্রতিভার স্বাক্ষর আরও গাঢ় হয়ে খোদাই হল বলিউডের দেওয়ালে।

পুরুষতান্ত্রিক দুনিয়ায় নারী কোরিওগ্রাফার

তখনও পর্যন্ত বলিউডে কোরিওগ্রাফার হিসেবে পুরুষরাই পরিচিত ছিল। মহিলা কোরিওগ্রাফার কেউ ছিল না। তাই সরোজ যেন একঘরে হয়ে যাচ্ছিলেন। তার উপর তাঁকে কাজে কেউ হারাতে পারে না। এমন দাপুটে মহিলাকে কে মেনে নেবে! ফলে প্রতিভা থাকা সত্বেও একের পর এক ভাল ছবি ফস্কে যাচ্ছিল। ফের বড় ব্রেক এল হেমা মালিনী-ধর্মেন্দ্র অভিনীত 'প্রতিজ্ঞা' ছবিতে। কোরিওগ্রাফার হিসেবে ফের মাতিয়ে দিলেন সরোজ। এর পরে সরোজকে সুযোগ দিলেন সুভাষ ঘাই।  'তেজাব' ছবিতে মাধুরী দীক্ষিতের 'এক দো তিন' কোরিওগ্রাফার করলেন সরোজ। যা সুপারহিট বললেও কম বলা হয়। এই নাচে যেমন বলিউড কাঁপালেন মাধুরী, তেমনই নিজেকেও নতুন করে প্রতিষ্ঠা করলেন সরোজ খান। সেই সঙ্গে মাধুরী আর সরোজের এক দারুণ বন্ধুত্ব জন্ম নিল।

যে সরোজ খান এক একটি ছবিতে কোরিওগ্রাফি করার জন্য তখন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পেতেন, তেজাবের পর সেই সরোজের পারিশ্রমিক প্রতি ছবিতে এক লাখ টাকা হয়ে গেল। রাতারাতি সরোজ খান বিখ্যাত কোরিওগ্রাফার। আর তাকাতে হয়নি পেছন ফিরে। এই সময় থেকেই ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে কোরিওগ্রাফার হিসেবে সরোজ খানের নাম উঠে এল বিজয়ী হিসেবে। এর আগে ফিল্মফেয়ারে কোরিওগ্রাফে কোনও পুরস্কার বিভাগই ছিল না বলিউডে। এক দো তিনের সাফল্য দেখে কোরিওগ্রাফিতে পুরস্কার চালু করে বলিউড। সরোজ খানই হলেন প্রথম ফিল্মফেয়ার কোরিওগ্রাফার পুরস্কার বিজয়িনী।

Wanted crowd to go wild with excitement': The story behind Madhuri ...

ফিল্মফেয়ার বিজয়িনী রূপে সরোজ খান তিন বছর পর পর হ্যাট্রিক করেন কোরিওগ্রাফার রূপে। ১৯৮৯ সালে তেজাব, ১৯৯০ সালে শ্রীদেবী অভিনীত চালবাজ, ১৯৯১ সালে মাধুরীর সেই জেলেদের সঙ্গে 'হাম কো আজকাল হ্যায় ইনতেজার' গানের সঙ্গে নাচ 'সায়লাব' ছবিতে, পরপর তিন বছর তিনটি নাচে সরোজ ফিল্মফেয়ার পান। এর পরেও মোট আট বার ফিল্মফেয়ার পাওয়ার রেকর্ড গড়েন বিজয়িনী সরোজ। 'বেটা' ছবির 'ধকধক'-এ মাধুরীর স্রষ্টা সরোজ খান, খলনায়কের 'চোলি কে পিছে'র নিষিদ্ধ রোমাচঞ্চকর ডান্স নাম্বার থেকে ঐশ্বর্যা রাই অভিনীত 'হাম দিল দে চুকে সনম'-এর নিমুড়া নাচ হয়ে 'দেবদাস'-এর 'ডোলা রে ডোলা' বা মণিরত্নমের 'গুরু' ছবিতে ঐশ্বর্যার বৃষ্টিনৃত্য 'বরষা রে মেঘা মেঘা'-- তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ ও সুন্দর হয়েছে।

Top Bollywood choreographer Saroj Khan dies at 71 - ABC News

শুধু তাই নয় পরবর্তীকালে সরোজ খান কোরিওগ্রাফার হিসেবে প্রথম জাতীয় পুরস্কারও পান। দেবদাস, শ্রীঙ্গারাম, জব উই মেট-- এই তিনটি ছবিতেই জাতীয় পুরস্কার পান সরোজ খান। শ্রীদেবীর 'হাওয়া হাওয়াই', মাধুরীর 'এক দো তিন', আর ঐশ্বর্যার 'নিমুড়া'-- এই তিনটি নাচই তিন নায়িকাকে সাফল্য দেয় অনেকটা। আর তিনটি নাচই সরোজ খানের কোরিওগ্রাফি। তাই এই তিন নায়িকার কেরিয়ারে সরোজ খান না এলে তাঁরাও সাফল্যের এত আলো পেতেন না, ডান্সার কাম হিরোইন হিসেবে পরিপূর্ণ নায়িকা হতে পারতেন না।

যৌন আবেদন কখনও গ্রাস করেনি আভিজাত্যকে

এক দো তিন গানের নাচ তো এত হিট, কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, মাধুরীর নগ্ন পা কখনও ক্লোজ-আপে দেখাননি সরোজ। যেন একটা ডান্সের স্টেজ শো চলছে মাত্র। আবার খলনায়ক ছবিতেও মাধুরী নাচছেন, চোলিকে পিছে গানে। যেমনি সাহসী গানের কথা তেমনই নাচের মুদ্রা। অথচ কেউ বলতে পারবে না, কোনওখানে কোনও অশ্লীলতা প্রশ্রয় পেয়েছে। এমনকি ওই নাচ খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, পায়ের স্টেপ খুবই সংযত, যাতে একটুও উঠে না যায় কমলা লেহেঙ্গা।

alka yagnik and ila arun – choli ke peeche kya hai (english ...

আবার কৃষ্ণকলি কাজলের কালো হরিণ চোখ তো কাল্ট হয়ে গেল 'ইয়ে কালি কালি আঁখে' গানের নাচে। সরোজের কোরিওগ্রাফিতে মাত করলেন কাজলও। ফর্সা নায়িকার মিথ ভেঙে কাজলকে অনন্যা করে তোলেন সরোজ খান। আবার সাথিয়া ছবির রানি মুখার্জী কিংবা বীরজারার প্রীতি জিন্টা-- দুই নায়িকাকেই তাঁদের কেরিয়ারে সবচেয়ে সুন্দর লাগে এই দু'টি ছবিতেই। কোরিওগ্রাফার সরোজ খান। 'জব উই মেট'এর করিনা কাপুরের 'ইয়ে ইশক হ্যায়' কিংবা 'মৌজা হি মৌজা' নাচ দুটোও ভোলা যায় না। এই দুই নাচ করিনার বড় ব্রেকও বটে। এই নাচ সরোজ খানকেও জাতীয় পুরস্কার এনে দিয়েছিল।

VIDEO: This Love (Ye Ishq Hai, Jab We Met) | Bollywood, Bollywood ...

শুধু নায়িকা নয়, মিঠুন চক্রবর্তী, সঞ্জয় দত্ত, গোবিন্দা থেকে বরুণ ধবনের মতো নায়কদেরও নাচের তালিম দিয়েছেন সরোজ খান। গোবিন্দা যখন ছোট ছিলেন, তখন প্রতিদিন ১৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে সরোজ খানের ডান্স ক্লাসে নাচ শিখতে আসতেন। কারণ গাড়ি করে আসার মতো টাকা ছিল না তাঁর, ছিল শুধু নাচের প্রতি ভালবাসা। এই গভীর ভালোবাসা দেখে গুরু সরোজ খান গোবিন্দার থেকে একটি পয়সাও নিতেন না নাচ শেখাতে। তার পরে তো গোবিন্দা বলিউডে পুরুষ নায়কদের নাচে সুপারস্টার।

মাধুরী সরোজ বিবাদ

মাধুরী তখন পূর্ণগর্ভা কিন্তু দেবদাসে ডোলা রে ডোলা নেচেছিলেন খানিক ঝুঁকি নিয়েই। মাধুরীর সরোজের প্রতি অভিযোগ ছিল, সরোজ তাঁকে ক্যামেরায় বেশিক্ষণ না রেথে ঐশ্বর্যাকে রেখেছেন। এই নিয়ে দুজনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। সরোজ পরে বলেন, তখন মাধুরী গর্ভবতী থাকায় ক্যামেরায় ওঁকে আড়াল করতে হয়েছে কিছু জায়গায়। এই অভিমান বহুদিন মেটেনি। তাই আমেরিকা ফেরত মাধুরীর যে কামব্যাক মুভি 'আজা নাচলে', তার কোরিওগ্রাফি মাধুরী সরোজ খানকে না দিয়ে বৈভবী মার্চেন্টকে দেন। ছবি ফ্লপ করে।

এর পরে আবার মাধুরী-সরোজ জুটি ফেরে সৌমিক সেনের 'গুলাব গ্যাং' এবং মাল্টিস্টারার 'কলঙ্ক' ছবিতে।

টলিউডে সরোজ খান

কলকাতার ডান্স রিয়েলিটি শো 'ডান্স পে চান্স টলি ভার্সেস বলি'তে বিচারক হয়ে আসেন সরোজ খান। যে শো ছিল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর প্রোডাকশান। যেটা হত রূপসী বাংলায় চ্যানেলে। শোয়ের সঞ্চালক ছিলেন পরিচালক অভিনেতা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও জুন মাল্য। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত সরোজ খানের প্রয়াণে দ্য ওয়ালকে জানালেন এই রিয়্যালিটি শোয়ের কিছু স্মৃতি। তাঁর কথায় "সরোজ খান নাচকে ক্লাস এবং মাস দুইয়েই মেলবন্ধন ঘটান। প্রত্যেক নায়িকার যেন নবজন্ম দেন সরোজজি, তাঁর কোরিওগ্রাফি করা নাচে। একটা ডান্স নাম্বার যে কী উচ্চতায় কাউকে সুপারস্টার বানাতে পারে, সেটা করে দেখান সরোজ খান। আমার একটা সুযোগ হয়েছিল সরোজজির সঙ্গে কাজ করার। নাচের উপর শো ছিল 'ডান্স পে চান্স'। বলিউড টলিউডকে মিলিয়ে আমার প্রোডাকশনে। সেটায় উনি ৪৫ পর্ব অবধি বিচারক ছিলেন। ফিনালে রাউন্ডে আমার একটা গেস্ট ডান্স পারফরমেন্স ছিল 'ডোলা রে ডোলা', সরোজজির সামনে। আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু উনি বলেছিলেন আমি কীভাবে নাচটা করেছি সেটা উনি দেখতে চান। আমার পারফরমেন্স দেখে উনি খুশি হন। ওঁর সেই সান্নিধ্য দারুন প্রাপ্তি ছিল। ওঁর চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি।"

এছাড়াও বাংলা ছবিতে কোরিওগ্রাফি করেন সরোজ খান। ২০১৬ সালে অরিন্দম শীল পরিচালিত বাংলা ছবি ‘ব্যোমকেশ পর্ব’-র গোলাপবাঈ-এর মেহেফিলের জন্য আনা হয় সরোজ খানকে। সায়ন্তিকা ব্যানার্জী অর্থাৎ গোলাপবাঈকে নাচ শেখান সরোজ খান।

সরোজ-রেখার ইকুয়েশন

গৌতম ঘোষের 'যাত্রা' ছবির শ্যুটিং চলছে। সে ছবিতে রেখা একজন বাঈজী, নাম তার লাজবন্তী। কিন্তু সময়ের স্রোতে লাজবন্তী হয়ে যায় মিস লাজো। সে ছবির শ্যুট হয়েছিল কলকাতায়। রেখা সরোজ খানকে কোরিওগ্রাফার হিসেবে নেবে বলেন। কিন্তু সরোজকে না নিয়ে গৌতম ঘোষ শাশ্বতী সেনকে নেন। একটা গান শাশ্বতী করেন, 'দারে যা দারে যা'। কিন্তু রেখার ভাল লাগেনি। শ্যুটিং বন্ধ করে দেন তিনি। তাই ফের সরোজকে নিতে বাধ্য হন গৌতম ঘোষ।

আশাজীর গাওয়া 'জামে মোহব্বত' আর মিস জোজোর গাওয়া 'কাভি আর কাভি পার'-- এই দুটো নাচেই রেখার কোরিওগ্রাফি করেন সরোজ খান। আজ বম্বে থেকে কলকাতা যেন সরোজ খানের জন্য অশ্রুসিক্ত। কিন্তু কান্না নয়, সবার উপরে থেকে যাবে এক পৃথুলা মেয়ের নাচার লড়াই। তথাকথিত 'লালিত্যময়ী' ও 'সুন্দর' না হয়েও, 'ছিপছিপে' শরীরি গড়ন ছাড়াও যে নাচা যায়, তা ছক ভেঙে শিখিয়েছিলেন অদ্বিতীয়া সরোজ খান। একের পর এক পুরস্কার ছিনিয়ে নেওয়া সরোজ খান। একাত্তরে বিদায় নেওয়া সরোজ খান।

```