পেশায় আইনজীবী, নেশায় অভিনেতা। আর সেই নেশা যে কতটা গভীর, তা বুঝিয়ে দেয় তাঁর অভিনয়ের রসায়ন। এখন যখন কমেডির নামে চটুলতা ভেসে বেড়ায়, তখন সন্তোষ দত্ত এক ভিন্ন মঞ্চ।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 December 2025 16:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যুদ্ধের শব্দ স্তিমিত, শহর জুড়ে হাঁড়ি হাঁড়ি মিষ্টির গন্ধ। তারই মাঝে যেন এক অমোঘ দৃশ্য— দু’হাত তুলে আনন্দে চিৎকার করে উঠছেন কেউ, “ছুটি! ছুটি!” কে জানত, এই ‘ছুটি’র মানুষটিকেই বাঙালি কোনও দিন মন থেকে ছাড়তে পারবে না! তিনি জটায়ু তথা লালমোহন গাঙ্গুলি (Lal Mohan Ganguly)। বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় সন্তোষ দত্ত (Santosh Dutta Birthday)।
১৯২৫ সালের ২ ডিসেম্বর, ঢাকায় জন্ম। পরে কলকাতায় (Kolkata) আসা। আমহার্স্ট স্ট্রিটের কাছে ‘সুরধ্বনি কুটির’ নামে দোতলা বাড়িটাই ছিল তাঁর আদি ঠিকানা। পাড়ার মানুষ আজও দিনের হিসেব ভোলে না। কারণ এই দিনেই জন্মেছিলেন সেই চিরসবুজ রসিক।
পেশায় আইনজীবী, নেশায় অভিনেতা। আর সেই নেশা যে কতটা গভীর, তা বুঝিয়ে দেয় তাঁর অভিনয়ের রসায়ন। এখন যখন কমেডির নামে চটুলতা ভেসে বেড়ায়, তখন সন্তোষ দত্ত এক ভিন্ন মঞ্চ। যিনি সৌজন্য, সংযম, স্বতঃস্ফূর্ত হাসির প্রতিনিধি। লঘু কথায় নয়, নিখাদ অভিনয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘লাফিং বোমা’। যার ভিতরে রয়েছে শুধুই আনন্দের বিস্ফোরণ।
“হাইলি সাসপিশাস!”, “রাজকন্যা কি কম পড়িয়াছে?”, “এক মিনিট”— আজও এই সংলাপগুলোতে হাসে সব প্রজন্ম। কারণ অভিনেতার প্রতিটি ছায়াই লেজেন্ডারি।
শুধুই সত্যজিৎই নন, আরও অনেক পরিচালকই পেয়েছেন তাঁর যাদু
সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) ‘পরশ পাথর’, ‘তিন কন্যা’, ‘সোনার কেল্লা’ (Sonar Kella), ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ (Joy Baba Felunath), ‘হীরক রাজার দেশে’ (Hirak Rajar Deshe)— এই তালিকা উল্লেখ করলেই সন্তোষ দত্তর নাম ঢুকে যায় অটোম্যাটিক। কিন্তু তাঁর প্রতিভা যে কেবল রায়ের সীমায় আটকে ছিল না! পূর্ণেন্দু পত্রীর মালঞ্চ, অমল শূরের গোপাল ভাঁড়, পীযূষ বসুর সিস্টার, ব্রজবুলি, তরুণ মজুমদারের গণদেবতা, সলিল দত্তের ওগো বধূ সুন্দরী, উমানাথ ভট্টাচার্যের নবীন মাস্টার, চারমূর্তি, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, ঘটকালি, হুলস্থুলু, বা সুবর্ণলতা— প্রত্যেকটি ছবিতে তিনি যেভাবে চরিত্র হয়ে উঠেছেন, তা আজ পুনরাবিষ্কারের দাবি রাখে।
ব্যাঙ্ক থেকে কোর্ট আর কোর্ট থেকে সিনেমা
প্রথম জীবনে ১৪ বছরের ব্যাঙ্ক চাকরি। উড়িষ্যায় বদলির নির্দেশ এলেই হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিলেন। কারণ তাঁর পড়াশোনাই ওকালতি। তাই ফিরলেন কোর্টে। পাশাপাশি নাটক, অভিনয় চলে অবিরত।
নাট্যদল ‘রূপকার’-এ সবিতাব্রত দত্তের ‘চলচ্চিত্রচঞ্চরী’-তে ‘ভবদুলাল’ হয়ে যে দিন মঞ্চে এলেন, সেই দিনই তাঁকে চোখে রাখলেন সত্যজিৎ রায়।
কিন্তু সত্যজিৎকে খুশি রাখতে গিয়ে কম ঝক্কি হয়নি। কারণ শ্যুটিংয়ের দিনই পড়ত কোর্টের শুনানি। আদালতের ডেট পিছনো সহজ নয়, কিন্তু মানুষ সন্তোষ দত্তকে এমনই ভালবাসতেন যে বাদী-বিবাদী— সকলেই তাঁর জন্য শিডিউল অ্যাডজাস্ট করতেন!
বাস-ট্রাম থেকে নিজের ‘জটায়ুর অ্যামবাসাডার’
১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি বাস-ট্রামেই যাতায়াত করেছেন। পরে কিনেছিলেন নেভি ব্লু অ্যামবাসাডার— নম্বর WBF 688। লালমোহন বাবুর সরলতা, অবলাকান্তের অবোধ স্বভাব, সবই দ্যাখা গিয়েছে তাঁর বাস্তব জীবনের মৃদু হাসিতে।
বন্ধুত্ত্ব, সংলাপ, আর বাংলা সিনেমার চিরকাল
‘শুধু তুমি নও অবলাকান্ত…’, উত্তম কুমার ও সন্তোষ দত্তের সেই পরম বন্ধুত্ব, বা ‘ম্যা ম্যা ম্যাডাম’ বলে সুমিত্রাকে দেখা—সবই আজ কিংবদন্তি। আশা ভোঁসলের গাওয়া ‘তুই যত ফুল দিস না কেনে’ গানেও যেন তিনি নিজের এক টুকরো হাসি রেখে গিয়েছিলেন।
নাটকের মানুষ, ফুটবলের পাগল
জাত মোহনবাগান সমর্থক। ফুটবল আর নাটক তাঁর নেশা। স্ত্রীর হাতে পাওয়া হাতখরচের টাকা দিয়ে নাটক দেখতে যেতেন, এমনই টান ছিল মঞ্চের প্রতি। আর সেই ভালবাসাই তাঁকে নিয়ে আসে সত্যজিৎ রায়ের কাছে।
সত্যজিতের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর হাল্লার রাজা তিনি। আবার শুণ্ডির রাজাও তিনিই। ওদিকে ‘জটায়ু’র প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ হিসাবেও উচ্চারিত হয় তাঁর নাম। তিনি সন্তোষ দত্ত। বেঁচে থাকলে এ দিন সন্তোষ দত্তের বয়স পেরোত ১০০।