যন্ত্রণার প্রেম নয়, নিরাময়ের গল্প বলে ‘সাইয়ারা’। বলিউডের টক্সিক রোম্যান্সের ট্রেন্ড যেন ঘুরে দাঁড়াল সুস্থ ভালবাসায়।

সাইয়ারা।
শেষ আপডেট: 23 July 2025 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রেম কি শুধু কান্না, মান-অভিমান আর আত্মবিসর্জনের গল্প? বলিউড এতদিন ধরে আমাদের যা শিখিয়েছে, তা যেন এভাবেই প্রেমকে ব্যাখ্যা করে। একদিকে ‘ড্যামেজড জিনিয়াস’ ধরনের পুরুষ চরিত্র, অন্যদিকে নীরব, সহনশীল, কাঁদতে থাকা প্রেমিকা। কিন্তু সেই একঘেয়ে, ট্রমা-মাখানো রোমান্সের ফ্রেম ভেঙে নতুন আলো নিয়ে হাজির হয়েছে ‘সাইয়ারা’। মোহিত সুরির পরিচালনায়, আহান পাণ্ডে ও অনীত পাড্ডা অভিনীত এই ছবি যেন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলার মতো শান্তি এনে দেয়।
এই ছবির প্রেমের সংজ্ঞা আলাদা। এখানে কেউ কাউকে ভাঙা অবস্থায় ভালবাসতে আসে না, বরং নিজেদের জোড়া লাগিয়ে, আত্মমর্যাদায় ভর করে দু’জন মানুষ একে অপরকে বেছে নেয়। সাইয়ারা প্রেমের নামে হিংসা, নিয়ন্ত্রণ বা আবেগের নাটক দেখায় না, এখানে প্রেম আসে সম্মান, দূরত্ব এবং ব্যক্তিগত পরিপক্বতার মাধ্যমে।
বলিউডের সুপরিচিত পরিবারের সন্তান আহান পাণ্ডে এখানে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি শুধু পরিচয়ের ভরসায় আসেননি। তাঁর অভিনীত ‘কৃষ’ চরিত্রে রয়েছে বাস্তব, আঘাত, এবং আবেগ। অন্যদিকে অনীত পাড্ডার ‘বাণী’ও কোনও ফাঁপা প্রেমিকা নন, তিনি এক পূর্ণাঙ্গ নারী চরিত্র, যাঁর নিজস্ব অতীত, সীমা এবং মতামত রয়েছে।
কবীর সিং-এ প্রেমিক তার সঙ্গিনীর গালে থাপ্পড় মেরে, মদ খেয়ে, অন্য মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এবং তাও ‘সহানুভূতি’ পায়। অ্যানিম্যাল-এ ‘আলফা মেল’ রণবীর স্ত্রীকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে এবং স্ত্রী তবু থেকে যায়। প্রেম যদি এমনই হয়, তবে তা আসলে ট্রমা-বন্ডিং— বলিউডের ফিল্টার লাগানো মানসিক নির্যাতন। 'সাইয়ারা' সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দেয়।
এই ছবিতে কৃষ তার মদ্যপ, বিষাক্ত বাবার সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বিদ্রোহ করে নয়, বাঁচার জন্য। তিনি কিছু করতে চান জীবনে, নিজের পরিচয় তৈরি করতে চান। আর বানী? বিয়ের আগে জঘন্যভাবে প্রতারিত হওয়ার পর, ভয় বা সহানুভূতির কারণে আরেকটা বিয়েতে হ্যাঁ বলেন না। এমনকি হাসপাতালে কৃষ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পরেও তিনি বলেন, 'বিয়ে হোক বা না হোক আফশোস হবে না, তোমায় যদি নিজের স্বপ্ন ছাড়তে হয়, তাহলে আক্ষেপ থেকে যাবে।
এই একটি সংলাপেই যেন গোটা ছবির দর্শন। সত্যিকারের প্রেম মানে অন্যকে থামিয়ে নিজের কাছে টেনে আনা নয়, বরং নিজেকে খুঁজে নিয়ে, অন্যকে পাশে চলতে দেওয়া।
কিছুদিন পর বানীর অ্যালঝাইমার ধরা পড়ে। কিন্তু তিনি কৃষের কাঁধে ভর না দিয়ে নিজেই সরে দাঁড়ান। কারণ তিনি জানেন, তিনি কারও আবেগী খেলনা হয়ে উঠতে চান না। আবার যখন তাঁরা এক হন, সেটা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য নয়, বরং কারণ তাঁরা নিজেরাই পূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
এই ছবির শ্রেষ্ঠ দিক এটাই। সাইয়ারা কখনওই ‘নিজেকে বেছে নেওয়ার’ জন্য দোষ দিতে শেখায় না। বরং বলে, যদি কোনও সম্পর্ক শান্তি, স্বপ্ন বা পরিচয় কেড়ে নেয়— তাহলে সেটা প্রেম নয়, সেটা কেবল ‘প্রেমের মতো শুনতে’।
আজকের দিনে যেখানে ট্রমা-বেসড পুরুষ চরিত্র (যেমন কবীর সিং, রণবিজয়) প্রেমের আদর্শ হিসেবে সামনে আসছে, সেখানে সাইয়ারা বলছে, প্রেম মানে নিজেকে সম্পূর্ণ জেনে, অপরের সঙ্গে সমতা রেখে, একসঙ্গে হাঁটা। ভাঙা মানুষকে জোড়া লাগানো নয়, বরং সুস্থ দুই মানুষের মধ্যে এক সম্মিলিত যাত্রা গড়ে তোলাই প্রেম।
এই ছবি যন্ত্রণাকে মহিমান্বিত করে না, বরং নিরাময়কে উদ্যাপন করে। বলে, সময় লাগুক, থেমে যাও, আবার ফিরে এসো, তবু নিজেকে হারিও না। যে প্রেম তোমাকে ছোট করে দেয় না, বরং সম্পূর্ণ করে তোলে— সেটাই সত্যিকারের প্রেম। হয়তো, এটাই সেই রোমান্টিক ড্রামা, যার জন্য এতদিন দর্শকরা অপেক্ষা করে ছিলেন!