সদ্যোজাত অ্যালবাম ফসিল্স ৭ বেশি করে সেলিব্রেট করার মতো, যেহেতু সেটি রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হলি-বলি এমন কী টলিউডের গানকে ছাপিয়ে মিউজিক প্ল্যাটফর্মে শীর্ষে। শুধু তাই নয়, পিওর ইন্ডিয়ান রক এক্সেলেন্স খেতাব পেয়েছে। যিনি বাংলায় রক ব্যান্ড তৈরি করেছেন, এমনও দিনে তারে কিছু প্রশ্ন না করলেই নয়।

রূপম ইসলাম, ছবি: প্রশান্তকুমার শূর
শেষ আপডেট: 21 February 2026 15:02
প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ যাত্রা। এই সময়ের মধ্যে ফসিল্স (Fossils) শুধু ব্যান্ড নয়, বাংলা রকের 'ব্র্যান্ড'ও (Bangla Rock Band Fossils)। এক্ষেত্রে বাংলা শব্দটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ তো বটেই, আরও বেশি করে আলোচনাসাপেক্ষ 'ভাষা দিবসে' (International Mother Tongue Day)। তাদের সদ্যোজাত অ্যালবাম ফসিল্স ৭ (Fossils 7) বেশি করে সেলিব্রেট করার মতো, যেহেতু সেটি রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হলি-বলি এমন কী টলিউডের গানকে ছাপিয়ে মিউজিক প্ল্যাটফর্মে শীর্ষে। শুধু তাই নয়, পিওর ইন্ডিয়ান রক এক্সেলেন্স খেতাব পেয়েছে। যিনি বাংলায় রক ব্যান্ড তৈরি করেছেন, এমনও দিনে তারে কিছু প্রশ্ন না করলেই নয়। ফোনে যোগাযোগ করা হল রকস্টার, থুড়ি, রকার হিসেবেই যিনি নিজেকে পরিচয় দিতে চান, সেই রূপম ইসলামের (Rupam Islam) সঙ্গে।
ফসিল্সের শ্রোতাদের প্রসঙ্গে, বিশেষ করে যদি ‘ফসিল্স ৭’-এর কথা বলা হয় - এই অ্যালবামের মূল শ্রোতা কারা?
আমি মনে করি আমাদের শ্রোতা হচ্ছেন এই মুহূর্তে যাঁরা আমাদের কনসার্টে আসেন, তাঁরা। তাঁরাই প্রধান শ্রোতা। তাঁদের পাশাপাশি আরও বৃহত্তর শ্রোতা যাঁরা আমাদের কনসার্টে আসেন না, তাঁদেরও যদি পেয়ে যাই, তাহলে তো পোয়াবারো। আমরা বরাবরই, আজকে বলে নয়, প্রথম থেকে শুরু করে আজকে পর্যন্ত এই ২৮+ বছরের যে জার্নি, তাতে এটাই সবসময় মনে করে এসেছি যে আমাদের কনসার্টে যাঁরা আসেন, তাঁরাই আমাদের শ্রোতা, তাঁদের জন্যই আমরা গান করি। কিন্তু আমরা পেয়েছি তাঁদের থেকে অনেক বেশি। যাঁরা কাজের চাপে বা দূরে থাকার কারণে কনসার্টে আসতে পারেন না, তাঁদেরও শ্রোতা হিসেবে পেয়ে আমরা অভিভূত, আনন্দিত। এবং মনে করি, এটা প্রকৃতির একটা বড় আশীর্বাদ, যা আমাদের উপরে রয়েছে।
ফসিল্স কি নিশ্চিন্তে তাদের ব্যাটন পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পারে? 'উত্তরাধিকারি' হিসেবে আপনাদের ব্যান্ডের মানদণ্ডে কি সত্যিই কেউ পৌঁছতে পেরেছে?
আমি নিজেকে একজন তরুণ শিল্পী বলে মনে করি। আমার ব্যান্ডমেটদের চেহারা যা দেখি, তাঁদের তো আমার থেকেও তরুণ বলে মনে হয়। বব ডিলান যেমন বলেছিলেন, I was so much older then, I am younger than that now! কাজেই আমি আমার অতীতের উত্তরাধিকার বহন করতে চাই, অতীতের ভুল সংশোধনও করতে চাই, বর্তমানের জরুরি সংযোজন, যা করা বাকি, করতে চাই। অন্যরা আমাদের উত্তরাধিকারি হবেন, এরকমভাবে ভাববার অবকাশ তাই নেই। বরং ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমার পরবর্তী কাজটি যেন ফসিল্স ৭-এর উত্তরাধিকারি হতে পারে। আবার সেই কাজ করে ফেলার পরে তার পরের কাজটা মনে করব যেন সেই কাজটি পরবর্তী কাজটির উত্তরাধিকারি হতে পারে। যদি শুধু ফসিল্সের কথাই বলি, তাহলে ফসিল্স ৭ এর উত্তরাধিকারি হবে ফসিল্স ৮, ফসিল্স ৮-এর উত্তরাধিকারি হবে ফসিল্স ৯। অন্য কেউ যদি এই উত্তরাধিকার নিজের দায়িত্বে বহন করতে চান, তাঁদের অবশ্যই স্বাগত জানাই। শুভেচ্ছা জানাই। তাঁদের জন্য ভালবাসা ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু তাঁরা যেন স্বচিহ্নিত হন।
এমন অনেক গান রয়েছে, যেগুলো সহজে ধরা দেয় না। ভাষা-যন্ত্রানুষঙ্গের সঙ্গে এই দীর্ঘ পথচলায় ফসিল্স কি কখনও সচেতনভাবে সহজ হওয়ার কথা ভেবেছে? নাকি সেই জটিলতাই পরিচয়? এটাই তাদের ভাষাশক্তি?
প্রত্যেকবার অ্যালবাম বেরোনোর পরেই দেখেছি, বিশেষ করে ফসিল্সের অ্যালবামের ক্ষেত্রে দেখেছি, নিন্দে-মন্দের ঝড় বয়ে আসে। প্রত্যেকবারই শ্রোতারা প্রথমে বর্জন করেন, বহুদিন পরে আবার গ্রহণও করেন। প্রতিটি অ্যালবাম বেরোনোর পর শুনেছি, আগেরটি নাকি বেজায় ভাল ছিল। এটা চলে আসছে সেই ‘ফসিলস টু’ থেকে। প্রথম প্রথম অবাক হতাম, তারপর বুঝলাম, আমাদের কাজ বুঝতে সময় লাগে। তবে এবারের অ্যালবাম তো দেখছি, অধিকাংশেরই বুঝতে সময় লাগেনি। অবশ্য যদি গানের মধ্যে কোনও জটিল ভাবনা থাকে, সেটা থাকতেই পারে। যেমন এবারে 'যদি তুমি' গানের ভাবনা জটিল। সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। ‘তোমায় ভালবাসব বলে দেখতে চাই না তোমায়’— এই দর্শন তো কঠিনই! কোনও প্রেমের গান তো এমন করে বলে না— ‘যদি তুমি কাছে আসতেই চাও/ দূরে থাকবার পরীক্ষা দাও’! বলে কি? তাহলে এটা অন্য ভাবনা, যা সচরাচর চরাচরে নেই। সেটুকু বুঝিয়ে দিতেই পারি।
আর, রক সঙ্গীতের যন্ত্রানুষঙ্গটাও বোঝবার বিষয়। সেটা কান তৈরির ব্যাপার। যাঁদের কান তৈরি নেই তাঁদের সময় লাগবে। যাঁদের ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে তাঁদের সেই সময় লাগবে না। এর বাইরে কোনও বোঝাবুঝির গল্প নেই। যাঁদের বুঝতে দেরি হয়, তাঁদের জন্যেই বলেছি, বুঝতে দেরি হয়। আমাদের নিজেদের বুঝতে দেরি হয় না।
সদ্যোজাত একটা অ্যালবাম রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিউজিক প্ল্যাটফর্মে শীর্ষে। ‘পিওর ইন্ডিয়ান রক এক্সেলেন্স’ খেতাব। এক্ষেত্রে কি ভাষার গুরুত্ব সর্বাগ্রে রাখবেন নাকি গোটা অ্যারেঞ্জমেন্ট?
অবশ্যই আমরা সবাই মিলে যে সঙ্গীতায়োজন করছি, মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস এবং প্রেজেন্টেশন, প্রোডাকশন— এগুলোকেই আমি সর্বাগ্রে রাখব। তার কারণ ভাষা তো কেউ বুঝবেন, কেউ বুঝবেন না। কিন্তু আমাদের গান ভাষাগণ্ডিকে পেরিয়ে গিয়েছে। আমাদের কনসার্টে গেলেও দেখা যায় অনেক ভিন্নভাষী মানুষ তা দেখতে/শুনতে আসেন। যেখানেই আমরা প্রোগ্রাম করি না কেন, শুধু বাঙালিরা আসেন, সেটা আর বলা যাবে না। এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। আমরা সেটা খানিকটা অ্যাচিভ করতে পেরেছি, ভবিষ্যতে আরও অ্যাচিভ করার ইচ্ছে আছে। তার কারণ এরকম অনেক ভাষার গান বাজনা রয়েছে যা ভিন্নভাষার মানুষকেও স্পর্শ করেছে। এবং ইংরেজিকেও আমি ভিন্নভাষা বলেই মনে করি, বিদেশিদের ভাষা বলেই মনে করি। বাংলাও অনেকের কাছেই বিদেশিদের ভাষা। তাঁদের কাছেও এই গান পৌঁছে যাওয়া উচিত। আর এই পৌঁছে যাওয়ার অবলম্বন হল যন্ত্রানুষঙ্গ, প্রেজেন্টেশন। যন্ত্রশিল্পীরা গানগুলিকে কতটা প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক বানাচ্ছেন, পরিণত করছেন সেই পুরো বিষয়টা। এটাই আমার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
আর শুধু লিরিককে গুরুত্ব দেব না, তাঁর কারণ শুধু লিরিকের ভিত্তিতে তো কিছু নির্বাচন হয় না! নির্বাচন হয় লিরিক্স এবং কম্পোজিশনের ভিত্তিতে। এরকম অনেক গানই তো আমি লিখে রেখেছি, যার সুর এখনও চূড়ান্ত নয়। কাজেই লেখার ভিত্তিতে কেবল নয়, সুর এবং কথা, যেখানে সুর বাহিত হয়ে লেখা সবাইকে স্পর্শ করে, সেখানে সুরকেই বৃহত্তর অবলম্বন বলে মনে করি। দারুণ লিখলাম তার ভিত্তিতে গান নির্বাচিত হয় না। দারুণ সুর করলে হয়।
এই সাফল্যের পরও কি বলবেন বাংলা ভাষা 'বন্দিনী'?
'বন্দিনী বাংলা ভাষা' একটা বিশেষ সময়ে রচিত হয়েছিল। সেই সময়ের গল্প আমি বহুবার বলেছি। নতুন করে বলবার দরকার নেই। সেই সময়কে আমরা সবাই মিলে পেরিয়ে এসেছি, এটা তো মানতেই হবে।