'আনন্দলোক' পুরস্কারে সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার নিতে কলকাতা এসেছিলেন অভিষেক-ঐশ্বর্যা। দু'জনেই তখন সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন 'ঋতুদার সঙ্গে আমাদের টেলিফোনে কথা হয়েছে এই ছবি নিয়ে। কোনও কাগজে কলমে ছবির চুক্তি হয়নি।'

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 16 July 2025 13:51
দেবী চৌধুরাণী বললেই বাঙালিদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজনের মুখ। তিনি সুচিত্রা সেন। কিন্তু বাংলা ছবির 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে মধ্যবয়সের সুচিত্রাকে বেমানান লেগেছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের। আর ঋতুপর্ণ চিরকালই বম্বের থেকে আর্টিস্ট এনে বড় মাপের বাংলা ছবি করতে চাইতেন। সেভাবেই 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে ঋতুপর্ণর প্রথম পছন্দ ছিলেন ক্যাটরিনা কাইফ।
সেটা ২০০৭ সাল। ঋতুপর্ণ ঘোষ নিয়েছিলেন এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। 'দেবী চৌধুরাণী' ছবি করতে চেয়েছিলেন তিনি এবং দেবীর নামভূমিকায় ক্যাটরিনা কাইফ ছিলেন তাঁর পছন্দ। ছবির প্রথম কিস্তির পাকা কথাও হয়ে যায়। ঋতুপর্ণ ক্যাটরিনাকে 'দেবী চৌধুরাণী' ভেবেছিলেন একদম অন্য লুকে। যার সঙ্গে হয়তো কোনও মিলই থাকত না বাঙালির দেখা সুচিত্রা সেনের সাজপোশাকের।

সমাজে লাঞ্ছিতা কোমল সরল মেয়ে প্রফুল্লর ডাকাতরানিতে উত্তরণ একদম অন্য আঙ্গিকে দেখাতেন ঋতুপর্ণ। যে মেয়ে কিনা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে মাথা মুড়িয়ে ভিড়ে যায় ডাকাতদের দলে। লাঠিখেলা থেকে ছোরাখেলা, বা ঘোড়সওয়ার- সবেতেই যে মেয়ে পারদর্শী। যেন সে 'লৌহমানবী'। ইংরেজদের বন্দুকের নল পদানত হয় দেবী চৌধুরাণীর জয়ধ্বনির কাছে। লন্ডন ফ্যাশন উইকের মডেল ক্যাটরিনা কাইফ তখন সদ্য কয়েক বছর বলিউডে এসেছেন। ক্যাটরিনাকে বলিউডে নিয়ে এসেছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা কাঈজাদ গুস্তাদ ২০০৩ সালে তাঁর 'বুম' ছবিতে। 'বুম' ছবিতে অমিতাভ বচ্চন, জিনাত আমনের মতো নামের কাছেও ম্লান হননি ক্যাটরিনা। বরং প্রথম ছবিতেই নিজের আবেদনে মাত করেন কাইফ সুন্দরী। যদিও 'বুম' সুপার ফ্লপ করে, তবু ছবির উপস্থাপনা ছিল সাহসী। এরপরই অমিতাভ-পুত্র অভিষেক বচ্চনের গার্লফ্রেণ্ড রূপে 'সরকার' ছবিতে শিরোনামে উঠে আসেন ক্যাটরিনা। আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ঐশ্বর্যার সঙ্গে প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর সলমন খান তখন জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছিলেন ব্রিটিশসুন্দরী ক্যাটরিনার কাছেই। সলমন-ক্যাটরিনা প্রেমের জল্পনা-কল্পনায় ভেসে গিয়েছিল আপামর ভারতবাসী। সেসময় সলমন খানের বাহুলগ্না হয়ে এই মেয়েই বলেছিল তামাম ভারতকে 'জাস্ট চিল'। রুপোলি পর্দায় একদিকে অক্ষয় কুমার, অন্যদিকে গোবিন্দা সবার সাথেই ডান্স ফ্লোর মাতিয়েছেন ক্যাটরিনা। ক্যাটরিনার জন্যই যেন সলমন খান আজও রয়ে যেতে পারেন চিরকুমার। আবার বয়সে ছোট ভিকি কৌশলকে সাত পাকের আঁচলে বাঁধতে পারেন ক্যাটরিনাই।
ঋতুপর্ণ ঘোষ তখন সদ্য শেষ করেছেন তাঁর ইংরাজি ছবি 'দ্য লাস্ট লিয়ার'। অভিনয়ে অমিতাভ বচ্চন, প্রীতি জিন্টা, অর্জুন রামপালের মতো বলিউড স্টাররা। এই ছবি থেকেই অর্জুন রামপালের সঙ্গে ঋতুপর্ণর বন্ধুত্ব শুরু। এই ছবির পরপরই ঋতুপর্ণ ঘোষণা করেন তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের 'দেবী চৌধুরাণী' করবেন ভেবেছেন। ছবিতে দেবী চৌধুরাণীর ভূমিকায় ক্যাটরিনা কাইফ এবং নায়ক ব্রজেশ্বরের চরিত্রে অর্জুন রামপাল। ভবানী পাঠকের চরিত্রে কমল হাসান। ঋতুপর্ণর নির্দেশনায় ছবির প্রযোজক অর্জুন রামপাল স্বয়ং।

তখনও ক্যাটরিনা 'জারা জারা টচ্ মি' বা 'চিকনি চামেলি', 'কমলি' নাচে ঝড় তোলেননি। ছিলনা তাঁর কোনও স্টারডম, কিন্তু গসিপ সেগমেন্টে ক্যাটরিনা ছিলেন শিরোনামে। ঋতুপর্ণর হাত ধরেই তাঁর অভিনয়সত্তা বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে পড়ত বলাই বাহুল্য। বম্বে-ঘেঁষা কাস্টিং করে নিজের ছবিকে আঞ্চলিক পরিমণ্ডল থেকে বের করতে চাইতেন ঋতুপর্ণ। ততদিনে বচ্চন পরিবারের চারজন স্টার ঋতুপর্ণর ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছেন। ক্যাটরিনা দেবী চৌধুরাণী, এই খবর রটার পর ঋতুপর্ণর স্তুতি খুব একটা হয়নি। বরং বিরূপ মন্তব্যই শুনতে হয়েছিল ঋতুপর্ণকে। হাসির রোলও উঠেছিল। যে ঐতিহাসিক চরিত্রে সুচিত্রা সেনকে দেখেই বাঙালি অভ্যস্ত তাঁর জায়গায় ক্যাটরিনা কাইফকে বড় নগণ্য লেগেছিল দর্শকদের। কেউ কেউ বলেছিল সুচিত্রা সেনের বিকল্প একমাত্র মাধুরী দীক্ষিত। কিন্তু সবটাই অলীক ভাবনার ফসল ছিল। কারণ ছবির শ্যুট তো হয়নি।ঋতুপর্ণ জানিয়েছিলেন "এ ছবি সর্বভারতীয় দর্শকদের কথা ভেবেই বানাব। বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনির নির্যাস নিয়ে হবে আমার নিজের চিত্রনাট্য, হিন্দি বা ইংরেজিতে। বঙ্কিমসাহিত্যে ব্রজেশ্বর একদমই নগণ্য চরিত্র। কিন্তু আমার ছবিতে ব্রজেশ্বরকেও লিড রোলে রাখব। দেবী চৌধুরাণীর ক্যাটরিনার লুক মিলবেনা সুচিত্রা সেনের সঙ্গে। বরং অনেক লৌহমানবী করা হবে ক্যাটরিনাকে। অনেক বেশি পুরুষালী। দরকারে মাথা মুণ্ডন করেই দেখাব ক্যাটরিনাকে। যে ডাকাতসর্দার ভবানী পাঠকের মতোই। যে পুরুষ ডাকাতদের সঙ্গে অন্তরঙ্গে বহিরঙ্গে কোনও অংশে কম নয়।" কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষ এ ছবি আর এগোতে পারেননি। নানা কারণে ছবির কাজ পিছিয়ে যায়। ক্যাটরিনাও ডেট দিতে পারেননি পরে।

কিন্তু কদিনের মধ্যেই ঋতুপর্ণ বদলে ফেলেন তাঁর 'দেবী চৌধুরাণী' ছবির কাস্টিং। প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন ক্যাটরিনা নয়, ঐশ্বর্যা রাইকে ভেবেছেন তিনি দেবী চৌধুরাণী। যা শুনে দুঃখ পেয়েছিলেন ক্যাটরিনা। আর ঐশ্বর্যা কী ভেবেছিলেন? সলমনের তৎকালীন প্রেমিকা কাইফ সুন্দরীকে 'দেবী চৌধুরাণী' করেই টেক্কা দিতে চেয়েছিলেন কী রাইসুন্দরী! এমন গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল ইন্ডাস্ট্রিতে।
২০১০ সালে মুক্তি পায় মণি রত্নমের 'রাবণ'। যে ছবিতে দুরন্ত লুকে পর্দা কাঁপিয়েছিলেন অভিষেক বচ্চন আর ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন দু'জনেই। ততদিনে তাঁদের বিয়েও হয়ে গিয়েছে। সেসময় 'আনন্দলোক' পুরস্কারে সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার নিতে কলকাতা এসেছিলেন অভিষেক-ঐশ্বর্যা। দু'জনেই তখন সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন 'ঋতুদার সঙ্গে আমাদের টেলিফোনে কথা হয়েছে এই ছবি নিয়ে। কোনও কাগজে কলমে ছবির চুক্তি হয়নি।'

এরপর বড়দিনের ছুটিতে বিদেশ ভ্রমণে চলে যান ঐশ্বর্যা-অভিষেক। সেসময় 'চিত্রাঙ্গদা' ছবির নির্মাণে ব্যস্ত ছিলেন ঋতুপর্ণ। এরপর আর ঐশ্বর্যাকে নিয়ে 'দেবী চৌধুরাণী' করেই ওঠেননি তিনি। শেষে সোনম কাপুরকে ভেবেছিলেন দেবী করবেন কিন্তু আকস্মিক ভাবেই ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। হলনা আর তাঁর স্বপ্নের প্রোজেক্ট 'দেবী চৌধুরাণী'।