
শেষ আপডেট: 31 August 2021 17:12
'সাহেব বিবি গোলাম'-এর ছোটো বউঠানও এই সিঁদুর পরে স্বামীকে কাছে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন যাতে স্বামী চুনিদাসির কাছে যেতে না পারে। কিন্তু সে সবই স্তোকবাক্য! শুধু মোহিনী সিঁদুর নয়, পটেশ্বরী ছোটো বৌ বাইজিদের মতো নিজেই নাচ গান করে, স্বামীর হাতে মদের পেয়ালা তুলে দিয়েও ছোটো কর্তাকে ঘরে আটকে রাখতে পারেননি রাতে।
বিমল মিত্রের 'সাহেব বিবি গোলাম' ছিল ব্রিটিশ আমলে বাঙালি বাবুদের জীবনচর্চার প্রতিচ্ছবি। ইংরেজ-পুষ্ট বাঙালি জমিদাররা নিজেদেরও বিলিতি কায়দায় মুড়ে ফেলেছিল। ভোগ-বিলাসে মত্ত সেইসব জমিদাররা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে শেষ হয়ে যান। তবু সেসব দিনের গোপন গল্প জানলে আজও গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। 'সাহেব বিবি গোলাম' বহুচর্চিত বহু-পঠিত ভীষণ জনপ্রিয় কাহিনি।
পঞ্চাশের দশকে 'সাহেব বিবি গোলাম'-এর বাংলা চলচ্চিত্রায়ণ করেন পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। সংগীত পরিচালনা করেন রবীন চট্টোপাধ্যায়। সুমিত্রা দেবী, উত্তম কুমার, নীতিশ মুখোপাধ্যায়, অনুভা গুপ্ত, ছবি বিশ্বাস অভিনীত সেই ছবি আজও কাল্ট ক্লাসিক।
এরপর ষাটের দশকের শুরুতেই 'সাহেব বিবি গোলাম' নিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্র বানালেন প্রযোজক, অভিনেতা গুরু দত্ত। 'সাহিব বিবি অউর গুলাম'। অভিনয়ে মীনা কুমারী, গুরু দত্ত, ওয়াহিদা রহমান প্রমুখ। অসামান্য সুর করলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মীনা কুমারী ছোটি বৌঠানের লিপে হৃদয় নিংড়ে গাইলেন গীতা দত্ত। বাংলা এবং হিন্দি দুটি ছবিই ক্লাসিকের মর্যাদা পেল।
https://youtu.be/7oeQvBDPiy0
এ দুটো ছবি দেখে আর বিমল মিত্রের লেখা বহুবার পড়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের একটা স্বপ্ন ছিল তিনি তাঁর মতো করে 'সাহেব বিবি গোলাম'-এর চিত্ররূপ দেবেন। ব্যস্ততম পরিচালকদের যা হয়, একটা ছবির স্বপ্ন দেখে অন্য ছবি করতে বাধ্য হতে হয় প্রযোজকদের চাপে। ঋতুপর্ণও ব্যতিক্রম ছিলেননা।
২০০৫ সালে ঋতুপর্ণ ভেবেছিলেন বলিউডে 'সাহেব বিবি গোলাম' হিন্দি ছবি করবেন। শুধু ভাবা নয়, কাস্টিং থেকে প্রোডাকশান অনেকদূর অবধি এগিয়েছিল।
ততদিনে ঋতুপর্ণ ঘোষ টলিউডের এক নম্বর পরিচালক তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে ঋতুপর্ণর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল বলিউডেও। কারণ তার অনেক আগেই ঋতুপর্ণর ছবিতে বলিউড আর্টিস্টরা অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গেছেন। কিরণ খের 'বাড়িওয়ালি' করেই তো সর্বভারতীয় স্তরে বড় অভিনেত্রী হিসেবে সম্মান পেলেন। তারপর ঋতুপর্ণর 'শুভ মহরৎ' ছবিতেও কাজ করে ফেলেছেন শর্মিলা ঠাকুর, রাখি গুলজার বা নন্দিতা দাসের মতো অভিনেত্রীরা। সর্বোপরি ঋতুপর্ণর 'চোখের বালি' বাংলা ছবিতে ঐশ্বর্য রাই বিনোদিনীর রোল করে ফেলেছেন।
[caption id="attachment_2353372" align="aligncenter" width="600"]
'চোখের বালি' ছবিতে বিনোদিনী ঐশ্বর্য রাই[/caption]
ঋতুপর্ণর হিন্দি ছবি 'রেনকোট'-এও ছিলেন ঐশ্বর্য। এছাড়াও বচ্চন পরিবারের চার সদস্যই একমাত্র ঋতুপর্ণর সঙ্গেই কাজ করেছেন। তো বলিউড স্টারদের কাছে ঋতুপর্ণ ছিলেন একজন অতি শ্রদ্ধাশীল এবং চাহিদাসম্পন্ন পরিচালক।
[caption id="attachment_2353369" align="aligncenter" width="600"]
'রেইনকোট' ছবিতে অজয় দেবগণ-ঐশ্বর্য[/caption]
ঋতুপর্ণর ছবির বাজেট কম, তাই তাঁরা রাজি হতে না চাইলেও জাতীয় পুরস্কার পাবার মোহে বহু বলিউড স্টারই ঋতুকে খুব একটা নিরাশ করতেননা।
২০০৫-এ তখন সবে সবে ঋতুপর্ণর 'অন্তরমহল' পিরিয়ড ছবি মুক্তি পেয়েছে। তাঁর আগে মুক্তি পেয়েছিল ঋতুপর্ণর ড্রিম প্রোজেক্ট 'চোখের বালি'।
[caption id="attachment_2353379" align="aligncenter" width="600"]
'অন্তরমহল' ছবিতে শর্মিলা-তনয়া সোহা আলি খান[/caption]
ঋতুপর্ণ রীতিমতো প্রেসের সামনে 'সাহেব বিবি গোলাম' হিন্দি ছায়াছবি করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। ছবিটি প্রযোজনা করবার কথা ছিল প্রীতিশ নন্দী-র।
ঋতুপর্ণ কাস্টিংও বেছেছিলেন তারকাখচিত। ছোটো জমিদারবাবু সলমন খান, ছোটো বৌ প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ভূতনাথ জন আব্রাহাম ও জবার ভূমিকায় বিদ্যা বালান।
এছাড়াও বিভিন্ন চরিত্রে রাইমা সেন, প্রিয়াঙ্কা শর্মা ও অনু কাপুরকে নেবার কথা ভাবেন ঋতুপর্ণ।
২০০৫ সালে এ খবর বড় খবর ছিল বৈকি। ঋতুপর্ণ তো যে কোনও স্টারকে নিয়ে ছবি করার ক্ষমতা রাখতেন। বিশেষত ছোটো বৌঠান প্রিয়াঙ্কা চোপড়া হতেন ঋতুপর্ণের ছবির মূল চরিত্র। প্রিয়াঙ্কা সম্পর্কে খোলসা করে বলেছিলেন ঋতুপর্ণ "গুরু দত্তর 'সাহিব বিবি অউর গুলাম'-এ ছোটো বৌঠান চরিত্রের বয়সের তুলনায় মীনা কুমারী ছিলেন বেশি বয়স্ক। প্রিয়াঙ্কা ছোট বৌ চরিত্র অনুযায়ী একদম পারফেক্ট আমার মতে। আমি করতে চাই প্রিয়াঙ্কা-সলমনকে নিয়ে এই ছবি।"
তবে ঋতুপর্ণ এটাও জানিয়েছিলেন "এখনই আমি 'সাহেব বিবি গোলাম'-এর শ্যুটিং শুরু করতে চাইনা। সবে সবে আমি 'চোখের বালি' আর 'অন্তরমহল' দুটো সাহিত্যধর্মী পিরিয়ড ছবি করেছি। পরের ছবি নিজের চিত্রনাট্যে করতে চাই। তারপরে হাত দেব বিমল মিত্রের 'সাহেব বিবি গোলাম'-এর হিন্দি চলচ্চিত্রায়ণে।"
'অন্তরমহল' কিন্তু বেশ নিন্দিত হয়েছিল সেই সময়ে। সাধারণ দর্শক এই ছবি অশ্লীল ছবি তকমা দিয়েছিল। এমনকি 'পর্ন-যুক্ত ঋতু' বলেও ঋতুপর্ণকে ট্রোল করা হয়েছিল। তখন ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ছিলনা, কিন্তু বিতর্ক কিছু কম হয়নি। পুরস্কার জিতেছিল বেশ কিছু 'অন্তরমহল' এবং ঋতুপর্ণর এটি একটি দুঃসাহসী ছবি তো বটেই। 'অন্তরমহল'-এর বিতর্ক কি ঋতুকে 'সাহেব বিবি গোলাম' করার থেকে কিছুটা বিমুখ করেছিল? হয়তো!
সেসময় তারপর ঋতুপর্ণ বানালেন 'দোসর'।
[caption id="attachment_2353391" align="aligncenter" width="600"]
দোসর[/caption]
আর যে সময় 'সাহেব বিবি গোলাম' কল্পিত হিন্দি ছবিতে ঋতুপর্ণ জবার ভূমিকায় বিদ্যা বালানকে নির্বাচন করেন, সেসময় বিদ্যা বালানের 'পরিণীতা' রমরমিয়ে সমস্ত প্রেক্ষাগৃহে চলছিল। তখন তো বিদ্যা-যুগ চলছে রীতিমতো। বাংলা সাহিত্যের হিন্দি পরিবর্তিত রূপ ছিল 'পরিণীতা'ও। তাই বিধু বিনোদ চোপড়া ও প্রদীপ সরকারের এই ছবি কতটা বক্সঅফিসে ও সমালোচকমহলে প্রভাব ফেলবে তার উপর নির্ভর করছিল ঋতুপর্ণর 'সাহেব বিবি গোলাম' করার বাস্তবায়ণ। 'পরিণীতা' হিট করেছিল যদিও অনেকটাই বদল ঘটেছিল মূল শরৎ-সাহিত্য থেকে। আবার এর আগে সঞ্জয় লীলা বনশালীর 'দেবদাস' যাতে আমুল বদল ঘটেছিল মূল সাহিত্যের। 'দেবদাস' বক্সঅফিসে তুমুল হিট করলেও লোকে বলেছিল "ঐ ছবি বনশালীর দেবদাস। শরৎচন্দ্রের দেবদাস নয়।"
[caption id="attachment_2353394" align="aligncenter" width="322"]
'পরিণীতা'য় বিদ্যা বালান[/caption]
ঋতুপর্ণও যে নিজের ঘরানাতেই বিমল মিত্রকে ভেঙে ছবি বানাতেন সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখেনা। কারণ 'চোখের বালি'ও ঋতুপর্ণ রবীন্দ্রনাথকে ভেঙেই বানিয়েছিলেন। যা অনেক রবীন্দ্রবোদ্ধা মানতে পারেননি।
বহু জল্পনা কল্পনা করে এমন একটি তারকাখচিত ছবি 'সাহেব বিবি গোলাম' ঋতুপর্ণর করা হয়ে ওঠেনি। বম্বের আর্টিস্টদের ডেট সমস্যা এর একটা বড় কারণ। বাংলার পরিচালকের ছবির বাজেট নিয়েও বলিউড স্টাররা নাক কুঁচকে থাকেন। আবার প্রযোজক সমস্যাতেও হয়তো এই ছবি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
পঞ্চাশের দশকের বাংলা ছবি 'সাহেব বিবি গোলাম' কিন্তু শ্যুট হয়েছিল কলকাতার গোপন রাজপ্রাসাদ 'মার্বেল প্যালেস'-এ। ঋতুপর্ণ ও হয়তো শ্যুট করতেন তাঁর ছবির কিছু অংশ মার্বেল প্যালেসে।
ঋতুপর্ণর ইউনিটের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় ঋতুপর্ণর একটা স্বভাব ছিল। যে কোনও অছিলায় ঋতুপর্ণ বড় বড় স্টারকে ফোন করে কথা বলতেন। আউটডোরে গিয়ে অন্য ছবির শ্যুটিংয়ে কোনো স্টার থাকলে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা মেরে আসতেন ঋতুপর্ণ। সবসময় যে তাঁদের নিজের ফিল্মে ডাকতেন তা নয়। তবে অনেক সময়ই ঋতুপর্ণ অনেক ছবির ভাবনা তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন এবং যার ফলে মিডিয়ায় বড় বড় খবর হত এই স্টার সেই স্টার ঋতুপর্ণ ঘোষের পরের ছবিতে কাজ করছেন। ঋতুপর্ণের হাত ধরে 'সাহেব বিবি গোলাম' ছবি হলে সর্বভারতীয় স্তরে একটি মাস্টারপিস ছবি হতে পারত।
তবে ঋতুপর্ণ কিন্তু ছোটো পর্দায় হিন্দিতেই 'সাহিব বিবি অউর গুলাম' বানিয়েছিলেন। রবিনা ট্যান্ডন করেছিলেন ছোটি মালকিনের চরিত্র। এছাড়াও ছোটোবাবু আয়ুব খান, মেজবাবু অর্জুন চক্রবর্তী, মেজো বৌঠান রূপা গাঙ্গুলি, জবা করেন মৌলি গাঙ্গুলী, ভূতনাথ রাজেশ। তৎকালীন একটি সর্বভারতীয় বেসরকারি চ্যানেলে সিরিয়ালটি সম্প্রচারিত হয়।
বেশ সুন্দর কাজ হয়েছিল। তবে সেই অনুযায়ী দর্শকনন্দিত হয়নি কাজটা। ঋতুপর্ণ বলেছিলেন "ছোটো পর্দায় আমি ঠিক মতো বিমল মিত্রের সাহিত্যকে ধরতে পারিনি, যেটা বড় পর্দায় হলে অনেক বেশি ভালো পারতাম। তবে রবিনা ট্যান্ডন যেভাবে এসে আমার সঙ্গে কাজ করেছিলেন তাতে রবিনার সিরিয়াসনেস প্রশংসনীয়।"