ঋদ্ধির এই অ্যাকাডেমির বড় গুণ নতুন করে মহিলাদের গানে ফেরানো। শেখার তো কোনও বয়স হয় না। আর পাঁচজন মেয়ের মতো ঘর-সংসার করতে গিয়ে তাঁদের গানের জগৎ থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছিল।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 July 2025 20:40
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোকে তাঁর সমসাময়িক যুগের কবিরা চিরকালই কম আলো পেয়েছেন। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাতে গিয়ে বাকিদের দিকে প্রদীপ ধরার লোক পাওয়া যায় না। অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, তিন স্রষ্টা গীতিকার ও সুরকার রূপে বাংলা গানকে যে ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, সে তুলনায় প্রাপ্য মর্যাদা তাঁরা কিন্তু পাননি।
অতীতে যদিও এই তিন কবির গানের কদর করার সমঝদার শ্রোতা ছিল, বর্তমানে একদমই শ্রোতার সংখ্যা কমে আসছে ক্রমশ। কিন্তু সব আলো একেবারেই নিভে যায়নি। আলোলিকা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় হেমন্তের আকাশ প্রদীপ হাতে তিন কবিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন এই বর্তমান সময়ে। বেশ কয়েক দশক ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে রজনীকান্তের গান, অতুলপ্রসাদী ও
দ্বিজেন্দ্রগীতিকে মূলধারায় নিয়ে এসেছেন তা প্রশংসনীয়।

গত ১৯ জুলাই ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর মিউজিক অ্যাকাডেমির নিবেদনে 'উইসডম ট্রি' কাফেতে হয়ে গেল 'ত্রিবেণী সঙ্গম' অনুষ্ঠান। ঋদ্ধি ও তাঁর ছাত্রীরা গানে গানে তর্পণ করলেন তিন কবিকে। আর উইসডোম ট্রি কাফে খুলেছেন আর এক কিংবদন্তি সুরকার সুধীন দাশগুপ্তর পুত্র সৌম্য দাশগুপ্ত।
শুরুতেই ঋদ্ধির অপূর্ব গানে সূচনা হল অনুষ্ঠানের। সবথেকে নজর কাড়ল ঋদ্ধির পোশাক পরিকল্পনা। নিজে পরেছেন লাল ঢাকাই সঙ্গে দলের মেয়েরা সবাই শ্বেতশুভ্র শাড়িতে অপরূপা। ঋদ্ধির এই অ্যাকাডেমির বড় গুণ নতুন করে মহিলাদের গানে ফেরানো। শেখার তো কোনও বয়স হয় না। আর পাঁচজন মেয়ের মতো ঘর-সংসার করতে গিয়ে তাঁদের গানের জগৎ থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছিল। ঋদ্ধির প্রেরণায় এই সংসারী মহিলারা আবার নতুন করে গানের জগতে ফিরে এসেছেন। তাঁরা দেখালেন এভাবেও ফিরে আসা যায়। তাঁরা যখন সাদা শাড়ি পরে গাইছেন 'আমরা এমনই ভেসে চলে যাই', তখন যেন শ্রোতারাও দুলেদুলে ওঠে। এক মধ্যবয়স্কা গৃহিনী কী সুরে গাইলেন 'তুমি নির্মল কর', তাঁর গানে মন পরিশুদ্ধ হয়ে যায়।

এমনই পরপর চলল অ্যাকাডেমির ছাত্রীদের গানের সম্ভার। সমবেত সঙ্গীতে 'কত ভাবে বিরাজিছ বিশ্ব মাঝারে' বা 'মোরা নাচই ফুলে ফুলে' এমন সব তিন কবির গানে মন ভরে গেল।
তবে শেষ পূর্ণ হচ্ছিল না, যতক্ষণ না ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় গাইলেন। সকলের অনুরোধে ঋদ্ধির কন্ঠে শোনা গেল 'কে তুমি বসি নদীকূলে একেলা? কার লাগি এত উতলা? কে তরী বাহি আসিবে গাহি? খেলিবে তার সনে কি খেলা?'। অতুলপ্রসাদী গানে মন প্রাণ জুড়িয়ে দিলেন ঋদ্ধি।

তবে এখানেই শেষ হয়, তিন কবিকে ঘিরে অনুষ্ঠান হলেও উপরি পাওনা ছিল ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের নিবেদনে নাটকের অপেরা গান। সবার অনুরোধে তাঁদের আসন্ন অনুষ্ঠানের কিছু ঝলক দেখালেন তাঁরা। কেয়া চক্রবর্তীর কথা স্মরণ করে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত 'ভালমানুষ' নাটকের 'আমি যখন মেয়ে থাকি... আমি যখন ছেলে থাকি ...'। যে প্রাণশক্তিতে এমন অপেরা গানের ঝলক দেখালেন তাঁরা তা এক বিস্ময়!
এদিনের অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় বিনোদন লাইফস্টাইল সাংবাদিক সোমা লাহিড়ীকে সংবর্ধনা জানালেন ঋদ্ধি। সোমা লাহিড়ীর কাজ থেকে সাজ সবের প্রশংসা করলেন ঋদ্ধি। তিন কবিকে যে মেনস্ট্রিমে সকল স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় মিউজিক অ্যাকাডেমি তা সত্যি বাঙালি হিসেবে গর্বের।

বৃষ্টিস্নাত কানে তখনও রেশ রয়ে গেল
'একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলাম নয়ন-জলে।
সহসা কে এলে গো এ তরী বাইবে ব’লে
যা ছিল কল্পমায়া, সে কি আজ ধরল কায়া?
কে আমার বিফল মালা পরিয়ে দিল তোমার গলে।'