ডিমেনশিয়ার ছায়ায় হারিয়ে যেতে থাকা এক মানুষ। কালিধর। মধ্যবয়স পেরিয়ে, স্মৃতি-ভোলা এক কুয়াশায় ঢাকা জীবন।

‘কালিধর লাপাতা’
শেষ আপডেট: 15 July 2025 14:24
‘আমি তারই সাগরে ভাসি, যে সাগরে ডুবে গিয়েছিলেম একদিন...’
ডিমেনশিয়ার ছায়ায় হারিয়ে যেতে থাকা এক মানুষ। কালিধর। মধ্যবয়স পেরিয়ে, স্মৃতি-ভোলা এক কুয়াশায় ঢাকা জীবন। পরিবার বলে, “বোঝা হয়ে গেছো।” ভাইদের সম্পত্তির ভাগ কমে যাওয়ার ভয়। তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় একদিন ফেলে আসে কুম্ভমেলার ভিড়ে। শত মানুষের ভেতরে একা ফেলে রেখে যায়—যেন অচল কোনও পুরনো জিনিসপত্তর।
কিন্তু মানুষ চাইলেই কি হারিয়ে যায়? না পারে না। কালিধরও হারায় না, খুঁজতে শুরু করে নিজেকে। অজানা পথে—নদীর ঘাট, মেঠো রাস্তা, পাখির ডানায় ভেসে থাকা এক বিস্তৃত সবুজে। দেখা হয় ছোট্ট বল্লুর সঙ্গে, সে অনাথ। স্বপ্নালু চোখ। শুরুতে বিরক্তিকর, পরে এক অপূর্ব বন্ধুত্ব
বল্লু যেন কালিধরের জীবনে জীবনের আবার ফিরে আসা। দু’জনের একসঙ্গে পথ চলা শুরু হয়—এক বাকেট লিস্ট নিয়ে। কোথাও রামলীলা, কোথাও নদীর ধারে বসে গল্প। যেন ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই লুকিয়ে আছে জীবন ফিরে পাওয়ার চাবিকাঠি।
কালিধর বুঝতে পারে—পরিচয় মানে শুধু অতীত নয়, বর্তমানের অভিজ্ঞতাতেও নিজেকে খুঁজে পাওয়া। বয়সের ভার, অসুখে জর্জরিত হলেও, মনে জমে থাকা আবেগ আবার জেগে ওঠে।
প্রেম, ভয়, বিস্মৃতি—সব একসঙ্গে মিশে যায় এক সফরের গল্পে। পরিচালক মধুমিতার এই রিমেক হলেও, ‘কেডি’র তুলনায় এখানে আবেগ আরও কোমল, আরও গভীর। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে আছে একধরনের শান্ত সৌন্দর্য—ধুলো-মাখা প্রান্তর, শিশিরে ভেজা পাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ, কুয়াশায় ঢাকা সকাল।
অভিষেক বচ্চন চুপচাপ, অথচ বলিষ্ঠ। চোখে মুখে ক্লান্তি, আর একরাশ আবেগ। ছোট্ট বল্লু, অনবদ্য—এক চিলতে হাসি দিয়েই সব জয় করে নেয়। এই ছবি নাটকীয় নয়, স্পিডও নেই বেশি। কিন্তু ঠিক সেখানেই তার সার্থকতা। জীবনের সব না-বলা কথাগুলো যেন অস্ফুটে বলিয়ে দেয়। এক বন্ধুত্ব, এক আবেগ, আর এক হারিয়ে যাওয়া মানুষের নিজের দিকে ফিরে তাকানোর গল্প।
'কালিধর লাপাতা' মনে করিয়ে দেয়—জীবন যতই কঠিন হোক, এক টুকরো ভালোবাসা, একফালি বন্ধুত্ব আর প্রকৃতি পারে হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে। শুধু এক সিনেমা নয়—অনুভূতি। দেখতে দেখতে বুকের মধ্যে একটা নরম কিছু গলে যায়। যেমন করে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থেকে মন চুপচাপ কেঁদে ওঠে। মন ছুঁয়ে যায়। হালকা গতিতে বয়ে যাওয়া আবেগের নদী। যেখান থেকে উঠে আসে জীবনের সবচেয়ে জরুরি সত্যি—‘যতদিন বাঁচি, ততদিন খুঁজে যেতে হয় নিজেকেই...’