সিনেমার পর্দা কখনও কখনও ইতিহাসকেও নতুন করে বাঁচায়। এবার সেই আলো ছড়াল প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দেশ পাপুয়া নিউগিনিতে।

ঋতাভরী চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: 27 August 2025 12:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিনেমার পর্দা কখনও কখনও ইতিহাসকেও নতুন করে বাঁচায়। এবার সেই আলো ছড়াল প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দেশ পাপুয়া নিউগিনিতে। স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বছরে দাঁড়িয়ে এই দেশ প্রথমবারের মতো অস্কারে পাঠাচ্ছে তাদের ছবি—‘পাপা বুকা’। আর এই ছবির অন্যতম মুখ ঋতাভরী চক্রবর্তী।
ছবির কাহিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক অজানা সত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার অধ্যায়ে ভারত ও পাপুয়া নিউগিনির মধ্যে গড়ে ওঠা অদেখা সেতুবন্ধন, বিসর্জন আর মানবিকতার গল্পই ফুটে উঠেছে ‘পাপা বুকা’র পরতে পরতে। বৃদ্ধ যোদ্ধা ‘পাপা বুকা’ দুই ভারতীয় ইতিহাসবিদকে সঙ্গে নিয়ে উন্মোচন করেন এমন সব কাহিনি, যা দুই দেশের অতীতকে একসূত্রে গেঁথে দেয়।
এই সিনেমার পরিচালক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় বিজুকুমার দামোদরন। যিনি ‘ট্রিস আন্ডার দ্য সান’-এর জন্য সাংহাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃতও হয়েছেন। তাঁর হাত ধরে তৈরি হওয়া এই ছবি শুধু এক চলচ্চিত্র নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের দলিল।
অভিনেতাদের তালিকাও বেশ অভিনব। পাপুয়া নিউগিনির ৮৫ বছরের প্রাচীন উপজাতি নেতা সাইন ববোরা রয়েছেন মুখ্য চরিত্রে। তাঁর সঙ্গে ভারতীয় অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তী ও প্রকাশ বারের অভিনয় ছবিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। আছেন স্থানীয় শিল্পীরাও—জন সিকে, বার্বারা আনাতু, জ্যাকব ওবুরি, স্যান্ড্রা দাউমা প্রমুখ।

প্রযোজনা থেকে টেকনিক্যাল টিম—সব জায়গাতেই ছবিটি হয়ে উঠেছে এক আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন। তিন-তিনবার গ্র্যামিজয়ী রিকি কেজ সুরের দায়িত্বে, সিনেমাটোগ্রাফিতে ইয়েধু রাধাকৃষ্ণন, আর গল্পের সহলেখক ড্যানিয়েল জনেরধাগট। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, ছবির কলাকুশলীদের সিংহভাগই তরুণ ছাত্রছাত্রী, যাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। এই অন্তর্ভুক্তি ছবিটিকে শুধু সিনেমা নয়, এক শিক্ষামূলক আন্দোলন হিসেবেও গড়ে উঠেছে।
প্রযোজক নোয়েলিনে টাউলা উনুমের ভাষায়, “‘পাপা বুকা’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রয়াস। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চল্লিশের বেশি ছাত্রছাত্রী এই ছবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন হাতে-কলমে।”
সবচেয়ে প্রতীকী দিকটি হল সময়। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দেশে মুক্তি পেতে চলেছে ‘পাপা বুকা’। আর একই বছরে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে পাপুয়া নিউগিনি। যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর স্বাধীনতার একসঙ্গে মেলবন্ধন। অস্কারে এটাই পাপুয়া নিউগিনির প্রথম পদক্ষেপ। তাই এই ঘোষণার মুহূর্ত ছিল আবেগে ভরপুর। জাতীয় সাংস্কৃতিক কমিশনের প্রধান ডন নাইলেস বলেছেন, “এই ছবি আমাদের গল্প, আমাদের শিল্পভাষা। অস্কারের মঞ্চে তুলে ধরতে পারা এক ঐতিহাসিক গর্ব।”

অন্যদিকে পরিচালক বিজুকুমারের কথায়, “এই সিনেমা কেবল দুই দেশের ইতিহাস নয়, মানবতার জয়গান। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে পাপুয়া নিউগিনির হয়ে প্রথম অস্কারে নাম ওঠা এক অপার সম্মানের।” ঋতাভরীও গর্বিত এই যাত্রায় সঙ্গী হতে পেরে। তাঁর উপস্থিতি ছবিটিকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক আবেদন। ভারতীয় দর্শকের কাছে এটি হয়ে উঠছে আবেগেরও অংশ—যেখানে দেশের শিল্পী যুক্ত হয়েছেন এক বিশ্বমঞ্চে, আরেক দেশের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে। শেষ পর্যন্ত ‘পাপা বুকা’ যেন মনে করিয়ে দেয়—দেশ, ভাষা বা ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, মানুষের যন্ত্রণা আর ভালোবাসার ভাষা একটাই। আর সেই ভাষাই অস্কারের মঞ্চে প্রথমবারের মতো পাপুয়া নিউগিনিকে নিয়ে যাচ্ছে, ঋতাভরীর মতো শিল্পীদের সঙ্গে করে। এক দেশের স্বাধীনতার উল্লাস, আরেক দেশের শিল্পীর হাসি মিলেমিশে যেন একটাই কথা বলে—সিনেমা শেষ পর্যন্ত মানুষকেই জয়ী করে।