কানে পাম দ’অর জয়ী ইরানি পরিচালক জাফর পানাহি—যিনি ইদানীং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে নিজের নতুন ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’-এর প্রচারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—সেই দিনই গথাম অ্যাওয়ার্ডে তিনটি পুরস্কার জিতলেন, যেদিন ইরান তাঁকে অনুপস্থিত অবস্থায় এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল।

জাফর।
শেষ আপডেট: 2 December 2025 13:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কানে পাম দ’অর জয়ী ইরানি পরিচালক জাফর পানাহি (Jafar Panahi)—যিনি ইদানীং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে নিজের নতুন ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’-এর প্রচারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—সেই দিনই গথাম অ্যাওয়ার্ডে তিনটি পুরস্কার জিতলেন, যেদিন ইরান তাঁকে অনুপস্থিত অবস্থায় এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল।
তাঁর আইনজীবী মোস্তফা নিলি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাজা-সহ পানাহির উপর জারি হয়েছে দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের সদস্য হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞাও। অভিযোগ—রাষ্ট্রবিরোধী ‘প্রচারণামূলক কার্যকলাপ’, যদিও নিলি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। তিনি আরও জানিয়েছেন, রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুতই আবেদন দাখিল করা হবে।
এমন কঠোর রায় ঘোষণার চাপা উত্তাপের মধ্যেই নিউ ইয়র্কের গথাম অ্যাওয়ার্ডসে হাজির হন পানাহি—যেখানে তিনি ছিলেন সেরা পরিচালক, সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য এবং সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মনোনীত। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি উৎসর্গ করেন তাঁর পুরস্কার সেই সব স্বাধীন চলচ্চিত্রকারদের, “যাঁরা নীরবে ক্যামেরা চালু রাখেন, কখনও বিনা সমর্থনে, কখনও জীবন বাজি রেখে, কেবলমাত্র সত্য ও মানবতার উপর বিশ্বাসে।” তিনি বলেন, এই উৎসর্গ যেন সামান্য হলেও সেই সব শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা, “যাঁরা দেখা ও দেখানোর অধিকার হারিয়েও সৃষ্টি করে চলেছেন, বেঁচে থেকেছেন।”
এরই মধ্যে এক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, নিউ ইয়র্কের এই অনুষ্ঠানের পর তিনি মরক্কোতে মারাকেশ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও যোগ দেবেন—সেখানে তাঁর ছবির প্রদর্শনী ও এক বিশেষ আড্ডা-পর্ব নির্ধারিত। ছবিটি ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের তরফে ২০২৬ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে সরকারি মনোনয়ন পেয়েছে। বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলস, সিয়াটেল, সান ফ্রান্সিসকো, শিকাগো, বোস্টন এবং নিউ ইয়র্ক শহর ঘুরে ঘুরে তিনি ছবির প্রদর্শনীতে উপস্থিত হচ্ছেন। তাঁর এই যাত্রাপথ নিয়ে নেয়ন এক বিশেষ স্বল্পদৈর্ঘ্যের ডকুমেন্টারি তৈরি করছে, যা মুক্তি পাবে ২০২৬ সালের শুরুতে।
ইরানি বংশোদ্ভূত হলেও বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসকারী এই পরিচালকের সঙ্গে ইরান সরকারের সংঘাত বহুদিনের। ২০১০ সালে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন এবং রাষ্ট্র-সমালোচনামূলক চলচ্চিত্র বানানোর কারণে তাঁর উপর জারি হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা, দেশত্যাগের নিষেধও। ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা’র অভিযোগে তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও দু’মাস জেল খেটে তিনি জামিনে মুক্ত হন। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তিনি গোপনে বানিয়ে ফেলেন ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’ (২০১১) এবং পরবর্তীতে আলোড়ন তোলে তাঁর ‘ট্যাক্সি’ (২০১৫), যেখানে তিনি ট্যাক্সিচালকের ভূমিকায় ক্যামেরা ধরেন। ২০২২ সালে সহ-চলচ্চিত্রকারদের একটি প্রতিবাদ আন্দোলনের সূত্র ধরে তাঁকে ফের গ্রেফতার করা হয়, যদিও সাত মাস পর তিনি মুক্ত হন।
নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এই বছর মার্টিন স্করসেসির সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পানাহি অকপটে স্বীকার করেছিলেন—দেশ ছেড়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, সম্ভব নয় নিজের মাটি ছেড়ে দূরে থাকা। তাঁর কথায়, ইরানের অসংখ্য প্রতিভাবান নির্মাতা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন; “ওই সব চলচ্চিত্র—যেগুলো অস্তিত্বই পেল না—সেই শূন্যতাই সবচেয়ে কষ্ট দেয়।”
‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’-এ তিনি বুনেছেন এক অস্বস্তির গল্প—মেকানিক বাহিদ (ভাহিদ মোবাসেরি) হঠাৎই দেখা পান এমন এক ব্যক্তির, যাঁকে তিনি সন্দেহ করেন একজন নিষ্ঠুর কারারক্ষী বলে। অনিশ্চয়তার আতঙ্কে তিনি জড়ো করেন কয়েকজন প্রাক্তন বন্দিকে। সবাই মিলে টেহরানের রাস্তায় আটক ব্যক্তিকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা ঠিক করতে চান—কতটা এগোবে তাঁদের প্রতিশোধের পথ? সেই নৈতিক টানাপড়েনই ছবির কেন্দ্রবিন্দু।
ইরানে আবারও কারাদণ্ড, আবারও নিষেধাজ্ঞা—কিন্তু বাইরে দেশে আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভরে ওঠা মঞ্চ। জাফর পানাহির জীবনের এই দ্বৈত বাস্তবতা যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্নটা তাই শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়—সিনেমা কি সত্যিই থামানো যায়? নাকি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে সৃষ্টি?