মানুষটি সব সময়েই সরল উচ্চারণে বিশ্বাসী, রসিকতায় অকপট, তবু কথার ধার এতটাই টানটান, যে আঘাত লেগে যায় শোনার পরেও।

শেষ আপডেট: 1 December 2025 19:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মানুষটি সব সময়েই সরল উচ্চারণে বিশ্বাসী, রসিকতায় অকপট, তবু কথার ধার এতটাই টানটান, যে আঘাত লেগে যায় শোনার পরেও। সেই শিলাজিৎ মজুমদার রবিবার সন্ধেয় চুপচাপ বেরিয়ে পড়েছিলেন শহরের এক নামকরা প্রেক্ষাগৃহে—‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ ছবিটি দেখতে। টিকিট বাছাই করে, মোটা দামের আসন কেটে, ভেবেছিলেন—আরামে বসে নিরিবিলিতে ছবি দেখবেন। কিন্তু তিনি কি আদৌ সেই শান্তির স্বাদ পেয়েছিলেন? তাঁর বক্তব্য, প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে যা ঘটেছে, তা ছবির নয়—বরং দর্শকের ‘পারফরম্যান্স’! সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই এক দীর্ঘ পোস্টে ক্ষোভ, বিস্ময় আর হতাশার সঙ্গমে তিনি লিখলেন নিজের দেখা-শোনা।
তিনি লিখছেন—“ছবিটা এত আলোচনায়, না দেখলে বুঝি একটা বড় ‘মিস’। তাই সব দিক সামলে অনলাইনেই দামের সেরা টিকিটটা কেটে নিলাম। ট্যাক্স-ফ্যাক্স ধরে সাড়ে চারশো টাকা। ছবির সমালোচনা করব—এ ক্ষমতা আমার নেই, কাজও নয়। আমি শুধু দর্শকদের দেখলাম বেশি।” তাঁর বক্তব্য, রবিবারের সন্ধের এই ভরা শো তিনি ভেবে গিয়েছিলেন আরও জমজমাট হবে। কিন্তু হল ভরল অর্ধেকও না! আর যারা এলেন, তাঁরা যেন ছবি দেখতে নয়—বরং তামাশা করতে।
ছবি শুরু হতেই প্রেক্ষাগৃহে হুড়োহুড়ি হাসির ঢেউ। চরিত্র গালাগাল করলেই দর্শকের উচ্ছ্বাস! কেউ হেসে লুটোপুটি, কেউ খিলখিল, কেউ আবার নীরব তৃপ্তিতে। “বেড়াল মারা—হাসি, পাগলকে লাথি মারা—হাসি, রুদ্রনীল কাউকে বোকা বললেই—হাসি। এমনকি যখন সুদীপের প্রিয় কচ্ছপটা রান্না করে ফেলল এক অভিনেতা, তখন তো হল ভরল মেয়েলি হাসিতে। পুরুষদের হাসি পেলাম না। ভাবলাম, গালাগাল শুনে মেয়েরা এত আনন্দ পান কেন?”—লিখেছেন শিলাজিৎ।
তাঁর পাশে বসা কুড়ি-একুশ বছরের এক তরুণী নাকি থামতেই পারছিলেন না, বিশেষত যখন অনুরূপার পোষা কৃষ্ণেন্দু নামের কুকুরটিকে ‘রান্না’ করা হয়। অথচ শিলাজিৎ পাচ্ছিলেন না কোনও হাসি। বরং তাঁর মন পড়েছিল অন্যদিকে—“হলের AC কাজ করছে তো? কারও নিরামিষ খাবারের গন্ধে আমার গা ঘিনঘিন করছিল। আমি তো আমিষখোর, নিরামিষ সহ্য করতে পারি না। এই জন্যই হলে যাই না, তবু যাই কখনও কখনও।”
তারপর আসে পপকর্নের কথা। তিনশো পঞ্চান্ন টাকার রেগুলার সল্টেড ভুট্টার খই! দর্শকরা কচমচ শব্দ তুলে, দামী কোলা খেয়ে ‘ঘড়ক’ ঢেকুর তুলে, ফোন ধরে বাড়ির চাবির অবস্থান জানাতে ব্যস্ত। পাশের লোক কী ভাবছে—তার তোয়াক্কা নেই। সেই দৃশ্য তাঁর মনে করিয়ে দেয় নওয়াজউদ্দিনের সেই বিখ্যাত সংলাপ—কেন ভুট্টার দানা ফোটে, কেন আওয়াজ করে।
এইসব দেখে শিলাজিৎ লিখছেন—“আজ সিনেমা নয়, দর্শকের সমালোচনা করা জরুরি।” এবং এখানেই তাঁর তীক্ষ্ণ পরামর্শ—“বাংলার পরিচালক-প্রযোজকদের বলছি—টিকিটের দাম অন্তত পপকর্নের চেয়ে বাড়ান! আজ যারা সিনেমা দেখতে এসেছিলেন, যদি প্রত্যেকে পঞ্চাশ-একশো টাকা বেশি দিতেন, আপনাদের পাঁচ-দশ হাজার ইনকাম বাড়ত।” তাঁর দাবি, বাংলা সিনেমার টিকিটের দাম সাড়ে চারশো—এটা হাস্যকর! “আমরা কনসার্টে দু-হাজার টাকার টিকিট দিতে পারি। হল ভরুক বা না ভরুক। সিনেমা তো গান থেকেও বড় শিল্প—তার দাম এত কম কেন?”
তাঁর স্পষ্ট কথা—“দর বাড়ান। যারা গালাগাল শুনে হাসতে আসেন, তাঁদের টিকিট পপকর্নের থেকেও দামী করুন!” বাংলা সিনেমা ভালো হোক কিংবা খারাপ—রবিবার রাতে একটি বহুচর্চিত ছবি দেখতে আসার মূল্য বোঝা উচিত। তাঁর আরও কটাক্ষ—“যদি কেউ না আসে? তারা যাক, গিয়ে খাক ওই অযথা দামী ভুট্টার খই। কে বলেছে সিনেমা দেখতেই হবে?” দেশে যেখানে সত্তর শতাংশ মানুষ আজ কোনওরকমে পেট ভরে ঘুমোবেন, সেখানে সিনেমা নামক বিলাসে সামান্য বাড়তি দাম দিতে দোষ কী—প্রশ্ন শিলাজিতের।
শেষে তাঁর মন্তব্য যেন এক কাঁটা—“সিনেমা যদি খেতেও না আসে কেউ, তবু বাংলা ভাষায় বানানো সিনেমার দাম থাকতে হবে। থাকবে তো?”