আইএমডিবি জানাচ্ছে ‘চড়ক’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন শিলাদিত্য মৌলিক। বিভিন্ন পোস্টারে রয়েছে তাঁর নামও। আর ছবি প্রযোজনা করেছেন আরও এক ফিল্মমেকার। সুদীপ্ত সেন। তিনি আবার এমন এক ছবি করেছেন, তা ছিল বেশ চর্চিত। ‘দ্য কেরালা স্টোরি’। এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। চলতি বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হতে চলেছে ‘চড়ক’। এবং তার পর থেকেই একেবারে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে পরিচালক এবং প্রযোজকের ধুন্ধুমার কান্ড!

শিলাদিত্য-সুদীপ্ত। ছবি: শুভ্র শর্ভিন ।
শেষ আপডেট: 21 May 2025 17:22
আইএমডিবি জানাচ্ছে ‘চড়ক’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন শিলাদিত্য মৌলিক। বিভিন্ন পোস্টারে রয়েছে তাঁর নামও। আর ছবি প্রযোজনা করেছেন আরও এক ফিল্মমেকার। সুদীপ্ত সেন। তিনি আবার এমন এক ছবি করেছেন, তা ছিল বেশ চর্চিত। ‘দ্য কেরালা স্টোরি’। এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। চলতি বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হতে চলেছে ‘চড়ক’। এবং তার পর থেকেই একেবারে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে পরিচালক এবং প্রযোজকের ধুন্ধুমার কান্ড!
পরিচালক শিলাদিত্য লিখলেন, ‘আমার ধৈর্য্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। যখন তুমি একজন মানুষের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নাও, তখন তার হারানোর কিছু থাকে না। যথেষ্ট হয়েছে।’
কী কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তা অনুমান করে বোঝা যাচ্ছে তা হল ‘স্বীকৃতি’। কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যে সকল আমন্ত্রণ পত্র রয়েছে, তাতে কোত্থাও নেই পরিচালককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। শিলাদিত্য মৌলিকের নাম হাওয়া হয়ে গিয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে ‘সুদীপ্ত সেনের ছবি’। শিলাদিত্য মৌলিকের পোস্ট ছাড়াও সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকা কলাকুশলীরাও পোস্ট করে চলেছেন, পরিচালকের সমর্থনে। যেমন লিখেছেন অভিনেত্রী শ্রেয়া ভট্টাচার্য। তেমনই এক আমন্ত্রণের চিঠির ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন।
‘শিলাদিত্য মৌলিক সেই পরিচালক, যাঁর সঙ্গে আমি একটি অত্যন্ত চিন্তন এক ছবিতে কাজ করেছি — ছবিটির নাম ‘চড়ক’। আমি নিজের চোখে দেখেছি, তিনি এই ছবির জন্য কতটা পরিশ্রম করেছেন, কতটা নিখুঁত নিষ্ঠায় নিজের সৃজনশীলতা ঢেলে দিয়েছেন। কিন্তু আজ আমি স্তব্ধ — বিস্মিত ও ব্যথিত, যখন দেখি ছবির প্রযোজক তাঁর নাম পরিচালকের তালিকা থেকে মুছে দিতে চেয়েছেন। শুধু তাই নয়, প্রযোজক এমনকি পরিচালকের নাম খারাপ করার চেষ্টাও করেছেন। দুঃখিত, কিন্তু প্রশ্ন জাগে — আমরা কি প্রতারণা আর ভণ্ডামির মাঝে বাঁচতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি? আমরা কি ক্রমাগত আরও বেশি নিচে নেমে যাচ্ছি?কেন কেউ অন্যের সৃষ্টি চুরি করতে চাইবে? কেন কেউ সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নিতে চাইবে একটি শিল্পীর সৃষ্টিকে? এটা কি মানবিক? এটা কি সহাবস্থান? এটা কি আমাদের সমাজের মুখ? নাকি আমরা সত্যিই আমাদের বিবেক হারাতে বসেছি?’

এ মতো অবস্থায় শিরোনামের লাইনটি মাথায় আসে! সিনেমা তুমি কার? শিলাদিত্য না সুদীপ্তর!
স্বভাবতই প্রথমে ধরার চেষ্টা করা হয় প্রযোজক সুদীপ্ত সেনকে। তিনি জানান, যে তিনি দেশে নেই, রয়েছেন ‘কান’-এ। হোয়াটসঅ্যাপে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, চড়ক ছবির পরিচালক কে, আপনি না শিলাদিত্য মৌলিক? তিনি লেখেন, ‘শিলাদিত্য’। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ‘কান’-এর মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আমন্ত্রণ পত্রে পরিচালকের নাম নেই, রয়েছে আপনার নাম, এর কারণ ঠিক কী? তিনি লেখেন, ‘কান’-এ এই ছবির ডাক থেকে আমন্ত্রণ পর্ব গোটাটাতেই আমি করিয়েছিলাম, শিলাদিত্য নয়!’ তিনি আরও লেখেন, ‘চিঠিতে নাম থাকা জরুরি নয়, ছবিতে নাম থাকাটা জরুরি!’
‘চড়ক’ ছবির বিষয় নিয়ে একটি সমস্যার কথাও উঠে আসে কিছুদিন আগে। অভিযোগ প্রযোজক সুদীপ্ত সেনের লগ্নির অনেকটা টাকা নিয়ে নয়ছয় করা হয়েছে, সঙ্গে এও যে ছবির সঙ্গে যুক্ত বহু কলাকুশলী পারিশ্রমিকটুকুও পাননি। এর সত্যতা নিয়ে সুদীপ্ত লেখেন, ‘আমার মেহনত এর টাকা...কতগুলো লোক লুটেপুটে খেলো!’ তিনি এও লেখেন, ‘আমি নিজেই পরিচালনা করতাম। কিন্তু আমি আমার বন্ধুকে ভরসা করেছিলাম, বুঝতে পারিনি আমার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে’ অভিযোগের তির ওঠে পরিচালক শিলাদিত্যর দিকে, তিনি লেখেন, ‘শিলাদিত্যের করা ফিল্ম বাজেট নিয়ে ছবিটি শুরু হয়েছিল। এখন বাজেট দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। এখানেই থামেননি সুদীপ্ত, লেখেন, ‘কিন্তু আমার সবথেকে বেশি ভরসা ছিল শিলাদিত্যর ওপর... আমি চেয়েছিলাম বাংলা সিনেমার জন্য কিছু করতে। হয়তো সেটাই ছিল আমার ভুল। আর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমার সেই অগাধ বিশ্বাস। শুটিংয়ের প্রথম ভাগেও আমি যাইনি। আমি যা কিছু টাকাপয়সা দিয়েছি, সবটাই দিয়েছি ওঁর টিমকে, যেন তাঁরা নিজের মতো করে খরচ করে কাজটা এগিয়ে নেয়।
দ্বিতীয়তে ফোনে ধরা হয় ‘পরিচালক’ শিলাদিত্য মৌলিককে। ফোন তুলে সুদীপ্ত সেনের গোটা বক্তব্য শুনে তিনি বলেন, ‘চড়ক-এর বিভিন্ন পোস্টারে আমার নাম রয়েছে। আমন্ত্রণ পত্রে নাম থাকলে কিছু বলার থাকত না। ‘সুদীপ্ত সেনের ছবি’ এটা না হয়ে, যদি প্রযোজক হিসেব থাকত, কী ক্ষতি হতো, আমি জানি না!’ টাকাপয়সার নয়ছয় নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে, সে প্রসঙ্গে পরিচালক বললেন, ‘যে বাজেটের কথা সুদীপ্তবাবু বলছেন, তা ক্রিয়েটিভ বাজেট। তার মধ্যে পোস্ট প্রোডাকশন কিংবা অভিনেতাদের পারিশ্রমিক তা ছিল না। আমি ওঁর বিশ্বাসভঙ্গ করিনি। একটা হিন্দি ছবিতে, কলাকুশলীরা পারিশ্রমিকরা পারিশ্রমিক নিয়েছে, যা তাঁরা বাংলা ছবি করার ক্ষেত্রে নিয়ে থাকে। শুধুমাত্র আমার কথায়।’ শিলাদিত্যর পাল্টা অভিযোগ প্রযোজক সুদীপ্ত সেনের বিরুদ্ধে, তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ বসেছিলাম, টাকা পাঠাননি। এখনও পর্যন্ত আমি আমার পারিশ্রমিকের ৫০ শতাংশ টাকা পাইনি। আমার বাবা এখন এক চোখে দেখতে পান না! শুধুমাত্র সঠিক সময়ে চিকিৎসা করাতে পারিনি বলে! বারবার বলেছিলাম, কিছুটা টাকা অন্তত দিন। আমি ওঁকে মেল পর্যন্ত করেছি, সেই মেলের রিপ্লাই এখনও পাইনি! আরেকটি বিষয় যদি তিনি এই কথা বলেন, যে আমি ওঁর বিশ্বাসভঙ্গ করেছি, তাহলে তিনি এই ছবি নিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?’
‘চড়ক’ বাংলার ছবি — বাঙালির ছবি। পরিচালক বাঙালি, প্রযোজকও বাঙালি, এবং ছবির অধিকাংশ কলাকুশলীরাও তাই। এই ছবি দর্শকদের আগ্রহ কেড়েছে তার গভীর, আবেগময় গল্প বলার ধরণ ও বাংলার প্রাচীন চড়ক পুজোর প্রেক্ষাপটকে ঘিরে। এমন একটি ছবিতে যদি 'নাম নিয়ে বিভ্রান্তি', 'পরিচালকের প্রাপ্য স্বীকৃতির অভাব' কিংবা 'আর্থিক দুর্নীতি'র মতো ঘটনা ঘটে, তা শুধু ছবিটির জন্যই নয়, গোটা বাংলা চলচ্চিত্র জগতের জন্য অপমানজনক এবং লজ্জার। এটা বাঙালির গর্বের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়।