শেষ আপডেট: 10 January 2020 03:59
লক্ষ্মী আগরওয়ালের ঘটনা কমবেশি সকলেই জানি আমরা, সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারে ৩২ বছরের নাইম খান। অপরাধ, লক্ষ্মী তার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। আজ থেকে ১৫ বছর আগে না ছিল মানুষের মধ্যে অ্যাসিড নিয়ে এমন সচেতনতা, না ছিল এ ক্ষতির সম্যক ধারণা। আইনি লড়াইয়ের পথটাও স্পষ্ট ছিল না অনেকের কাছে। সহজ ছিল না বিকৃত মুখের একটা মেয়েকে সমাজে মেনে নেওয়া।
এই সব 'না'গুলোকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন লক্ষ্মী। ভারতের প্রথম অ্যাসিড ভিকটিম, যিনি প্রথম মুখের ওড়না সরিয়ে আইনের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বিচার চেয়েছেন। দীর্ঘ লড়াইয়ে আদায়ও করেছেন। মনের মানুষের সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন, মা হয়েছেন। একইসঙ্গে যিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার অপর নাম। আন্তর্জাতিক সাহসিকতা পুরস্কার পাওয়া গর্ব।
সিনেমায় লক্ষ্মী হয়েছেন মালতী। তিনি যথন প্রথম পর্দায় আসেন, তখন অ্যাসিড হামলার পরে সাত বছরের আইনি যুদ্ধ পেরিয়ে গেছে। জীবনের অর্থ তখন লড়াই। চাকরি নেই, সমাজে সহানুভূতি নেই। পরতে পরতে উন্মোচিত হয় সংগ্রাম, হতাশা, হার না মানার কাহিনি। ফিরে আসে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ফেস-রিকনস্ট্রাকশন সার্জারির ঘটনা। লড়াইয়ের ময়দানে মিলেমিশে যায় প্রেম, যাপন, উদযাপন। চলকে ওঠে অনাবিল প্রাপ্তিরা। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে বারবার জ্বলে ওঠে বিচার চাওয়ার আগুন। সে আগুনে পুড়ে যায় যা কিছু অকিঞ্চিৎকর।
"আপনার মেয়ে তো মেয়েদের স্কুলে পড়ে। ওর ফোনে সব ফোন নম্বর ছেলেদের কেন তাহলে?" অ্যাসিড হামলার অভিযোগ দায়ের করতে গেলে মালতীর বাবাকে এই প্রশ্নটাই প্রথম করেছিলেন তদন্তকারী পুলিশ অফিসার। ঠিক এই জায়গা থেকেই দর্শকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, এ ছবি নিছক একটা বিচ্ছিন্ন কাহিনি বলে না। এ ছবি সেই তীব্র পিতৃতন্ত্রের কথা বলে, যে পিতৃতন্ত্রের আস্ফালনে বিচারব্যবস্থাও ঝুঁকে যায়। যে আস্ফালনে অবলীলায় সামনে এসে দাঁড়ায় অপরাধ নয়, অপরাধী নয়, বরং আক্রান্ত কিশোরীর চরিত্র!
২০১২ সালের ডিসেম্বরে নির্ভয়া গণধর্ষণ কাণ্ডে দেশ জোড়া বিক্ষোভের মধ্যে দিয়েই সিনেমাটি শুরু। সেখানেই এক টেলিভিশন সাংবাদিক এবং সাংবাদিক-সমাজকর্মী আমোলের (বিক্রান্ত মাসে) মধ্যে কথোপকথনে প্রথম মালতীর নাম শোনা যায়। তাদের আলোচনার বিষয়ই ছিল অ্যাসিড বিক্রির বিরুদ্ধে একটি জনস্বার্থ মামলা। এই মামলাই দায়ের করেছিলেন অ্যাসিড আক্রান্ত মালতী আগরওয়াল।
অ্যাসিড হামলার ঘটনায় আইন কীভাবে বিচার করে, তার এক রূপরেখা নির্মাণ করেছে ছপাক। তাই মালতী এবং তার পরিবারের আবেগ ও যন্ত্রণাই শুধু নয়, পাশাপাশি সিনেমাতে দেখানো হয় দু'টি সমান্তরাল আইনি লড়াই। প্রথমটি অপরাধী বশির খানের বিরুদ্ধে মামলা করার, অন্যটি মালতীর অ্যাসিড বিক্রির নিষেধাজ্ঞার জন্য জনস্বার্থ মামলা।
এই গোটা পর্বে দীপিকাকে দেখে যেন মনে হয়েছে, অভিনয় করেননি। সমর্পণ করেছেন নিজেকে। উজাড় করে নিংড়ে দিয়েছেন নিজের সবটুকু অভিনয় সত্ত্বা, সবটুকু মানবিকতা। ছবি মুক্তির আগে প্রচারের এক পর্বে দীপিকা বলেছিলেন, এ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে নাকি তিনি অবসাদে চলে গিয়েছিলেন। গান রিলিজের দিন আবেগে কেঁদেও ফেলেছিলেন তিনি। সে অবসাদের বা কান্নার ধার যে বড় কম নয়, তা স্পষ্ট হয় এই ছবি দেখলেই। প্রতিটি দৃশ্যে, প্রতিটি অভিব্যক্তিতে, প্রতিটি চিৎকারে দীপিকাকে ছাপিয়ে সামনে এসেছেন মালতী। বলিউডের গ্ল্যামার গার্লটির যেন মৃত্যু হয়েছে সিনেমার ওই ১২৩ মিনিটের জন্য। দীপিকার শরীরে বেঁচে রয়েছেন কেবল মালতী।
সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা হয়ে ওঠা এক প্রথমসারির বলিউড নায়িকার পক্ষে চোখ-নাক-মুখহীন, চামড়া গুটিয়ে যাওয়া একটা মুখকে নিজের সঙ্গে ধারণ করা, তাকে প্রকাশ করা কতটা কঠিন, তা হয়তো অভিনয় জগতের মানুষরাই ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু দীপিকা শুধু ওইটুকু করেননি, একটা বিকৃত মুখকেই কেবল ফুটিয়ে তোলেননি অবিকৃত ভাবে। তিনি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শরীরে, মননে, হৃদয়ে মালতী হয়ে উঠেছেন।
তাঁর ঝলসে যাওয়া মুখ আয়নায় প্রথম আসে ভণিতা ছাড়াই। ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনও কাড়ানাকাড়া নয়, বরং বাজে 'কাল হো না হো' সিনেমার গান। হর ঘড়ি বদল রহি হ্যায় রূপ জিন্দেগি... যেমনটা হওয়ার কথা। চিৎকার করে ওঠেন দীপিকা। সেই চিৎকারটাই, যেটা মালতী করেছিলেন। যেটা এ দেশের হাজার হাজার অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলা করেছেন নিজেকে প্রথমবার আয়নায় দেখে।
এ আয়নায় শুধু মালতীর মুখ দেখা যায় না। এ আয়নায় দেখা যায় গোটা সমাজের মুখ। মালতীর গুটিয়ে যাওয়া চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে সমাজের ক্লেদ, বিষ, লাঞ্ছনা। এই সমাজই তো মালতীকে কুশ্রী বলে দাগিয়ে দেয়, একঘরে করে। অথচ আদতে এই সামাজিক নির্মাণই মালতীকে উরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে অ্যাসিড হানা থেকে।
মালতীর আইনজীবী অর্চনা বাজাজের ভূমিকায় চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। মাধুরজিৎ সারঘি। বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা মালতীকে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করার দৃশ্য মন ছুঁয়ে যায়। সিরাজ আন্টির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পায়েল নায়ার, যাঁর বাড়িতে মালতীর বাবা (মনোহর তেলি) রান্নার কাজ করেন। মালতীর মায়ের ভূমিকায় গীতা আগরওয়ালের অভিনয় বেশ লক্ষ্যণীয়। মালতীর প্রেমিক বিক্রান্তে মানানসই।
সহজ সংলাপ, বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমাটোগ্রাফি, সাদামাঠা এডিটিং এ ছবিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সহজ খাতে তরতর করে এগোয় একটি কঠিন ছবি। সর্বোপরি জরুরি ছবি। বলিউডের মুকুটে এ ছবি যেন কোনও পালকের মতো গোঁজা নয়, বরং ধারালো ছুরির ফলার মতো গেঁথে থাকবে বহুদিন। বারবার দর্শকদের দাঁড় করাবে সমাজের আয়নায়। প্রশ্নের মুখোমুখি করবে। বলিউডে তো বটেই, সমাজের ইতিহাসেও মাইলফলক হয়ে থাকবে এ ছবি।