চলতি বছর মার্চে দেশজুড়ে আরও একবার মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবি ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালে নির্মিত এই ছবিটি এখন এক ঝকঝকে 2K ডিজিটাল সংস্করণে ফিরে এসেছে বড় পর্দায়।

নায়ক উত্তম
শেষ আপডেট: 24 July 2025 16:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চলতি বছর মার্চে দেশজুড়ে আরও একবার মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবি ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালে নির্মিত এই ছবিটি এখন এক ঝকঝকে 2K ডিজিটাল সংস্করণে ফিরে এসেছে বড় পর্দায়। কৃতজ্ঞতা যায় প্রযোজক আর.ডি. বনসলের পরিবারের প্রতি, যাঁরা ৩৫ মিমি ফিল্মটি সংরক্ষণ করে ফিরিয়ে এনেছেন নব গৌরবে। সময়োপযোগী এই মুক্তির পিছনে আছে একটি বিশেষ উপলক্ষ—২০২৬ সালে নায়ক-এর ৬০ বছর এবং উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ একসঙ্গে পালনের প্রস্তুতি।
তবে উত্তম কুমারের ‘নায়ক’ হয়ে ওঠার যাত্রাটা সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয়। ১৯৫১ সালে জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা অচলপত্র-তে প্রকাশিত হয় একটি কার্টুন—‘বেঙ্গলের হিরো’। সেখানে একটি হাঁটতে থাকা শিশুর মুখে ছিল এক নবাগত অভিনেতার চেহারা, যিনি প্রেমিকার গলায় ঝুলে বলছেন, “ডার্লিং, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?” সেই মুখটি ছিল উত্তম কুমার চট্টোপাধ্যায়ের—তখন মাত্র ২৫ বছরের এক অচেনা যুবক। ক্যালকাটা পোর্ট কমিশনার অফিসের কেরানি তিনি, রাতদিন ছুটছেন সিনেমায় ঘাঁটি খুঁজতে। পাশে ছিল না কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, সামনে ছিল না সম্ভাবনার আলো।
ফলাফল? ব্যর্থতা আর বিদ্রূপ।
কিন্তু মাত্র ছ’বছর পর চিত্রটাই পালটে যায়। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পায় ‘হারানো সুর’—এক রোমান্টিক মেলোড্রামা, যার গল্পের সূত্র Random Harvest থেকে। ছবিটি বিশাল জনপ্রিয়তা পায়, এবং জাতীয় পুরস্কারও জেতে। পুরস্কার নিতে উত্তমকে দিল্লি যেতে হবে শুনে হাওড়া স্টেশন জড়ো হয়ে যায় হাজার-হাজার অনুরাগী। এমন ভিড় যে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। স্টেশনের উল্টো গেট দিয়ে তাঁকে প্রবেশ করিয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়, আর চারদিকে শুধু একটাই নাম ধ্বনিত হচ্ছিল—উত্তম কুমার।
এই উত্থান এক রূপকথার মতোই। আর এই রূপকথাই সত্যজিৎ রায় নিয়ে এসেছিলেন ‘নায়ক’ ছবিতে। এক রাতের ট্রেন যাত্রা—কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত—যেখানে একজন চলচ্চিত্র নায়ক মুখোমুখি হন নিজের দ্বন্দ্ব, ভয়, একাকীত্ব আর আতঙ্কের। এই নায়ক, অরিন্দম মুখার্জি, বাস্তবে যেন সে উত্তম কুমারই। আর উত্তম নিজেই সেই চরিত্রে অভিনয় করে যেন নিজেকেই উন্মোচন করলেন। একদিকে সিলভার স্ক্রিনেক গ্ল্যামার, অন্যদিকে তাঁকে ধাওয়া করছে নিঃসঙ্গতা—এই দুইয়ের টানাপড়েন সত্যজিৎ রায় তুলে ধরেছেন অপূর্ব দক্ষতায়।
আর সেই বাস্তব আর ফিকশনের মেলবন্ধনে উত্তম কুমার নিজেরই মূর্তি গড়লেন নতুনভাবে। যে অভিনয় একদিকে নিখুঁত, অন্যদিকে নিজস্ব স্টারডমকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস। সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য যেন এক মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন—উত্তমকে দিয়ে উত্তমকে খুঁজে বের করার প্রয়াস।

শর্মিলা ঠাকুরের ‘অদিতি’ চরিত্রটিও ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবিম্ব—এক সাংবাদিকের প্রশ্নে প্রশ্নে খোলস ছাড়তে থাকে অরিন্দম। আর ট্রেনের বন্দিদশায় সেই উত্তম–অরিন্দম যেন উন্মোচিত হতে থাকে স্তরে স্তরে—জনতার উচ্ছ্বাসের নিচে ঢাকা পড়ে থাকা এক মানুষ।
চলচ্চিত্রটির প্রযুক্তিগত দিকেও ছিল বহু নতুনত্ব। চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্রের এটি ছিল শেষ কাজ রায়বাবুর সঙ্গে—‘ব্যাক প্রজেকশন’, ‘আইরিস ইন’, বাউন্সড লাইটের অসাধারণ প্রয়োগ, আর আসল ট্রেনের ভেতরের হুবহু সেট তৈরির কাহিনি—সব মিলিয়ে সিনেমা হয়ে ওঠে এক টেকনিক্যাল স্টান্স!

এমন এক সেট দেখে উত্তম নিজেই বিস্মিত হয়েছিলেন—একটা স্টুডিওর ভেতরে কেমন করে এমন নিখুঁত ট্রেন বানানো সম্ভব! যন্ত্রপাতি এসেছিল রেলওয়ে কোচ ফ্যাক্টরি থেকে, এবং বেশ কিছু শব্দ রেকর্ড হয়েছিল সিঙ্ক সাউন্ডে। আর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে ছিল ‘জ্যাজ’ ধাঁচ, যা সিনেমাটিকে এক আধুনিক ছন্দে বেঁধে রেখেছিল।
বহু বছর পর উত্তমের প্রয়াণের পরে, ১৯৮০ সালে, সত্যজিৎ রায় সানডে ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘নায়ক আমি বানিয়েছি, চিত্রনাট্য আমার। কিন্তু উত্তম কুমার এই সিনেমাটিকে নিজের করে নিয়েছিলেন। এমন পারফরম্যান্স, যেখানে পরিচালক প্রশংসা করলেও তা যথেষ্ট নয়, কারণ সেটা অভিনেতার অন্তর্নিহিত গুণ থেকেই এসেছিল। আমি বলতেই পারি—উত্তম কুমার ছিল নিখুঁত। বাংলা তো বটেই, ভারতীয় চলচ্চিত্রেও তাঁর কোনও বিকল্প ছিল না, আজও নেই।’
তাই ‘নায়ক’ আজ শুধুমাত্র এক সেরা অভিনেতার অনবদ্য অভিনয় নয়, বরং এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পকর্ম—যেখানে তারকা, পরিচালক, প্রযুক্তি ও ভাবনা একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে কালজয়ী ছবি। নতুন সংস্করণে বড় পর্দায় তা আবার দেখে যেন এক নতুন উপলব্ধি—যে উত্তম কুমার শুধুই নায়ক ছিলেন না, তিনি সময়েরও মুখ।