উত্তমকুমার কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদে কোন রাজনৈতিক দলের লোক বসে আছেন এটা কখনও ভাবেননি। কংগ্রেস, সিপিএম সবার পাশে থেকেছেন। এই যে দেশের প্রতি সম্মান, মানুষের প্রতি ভালবাসা, এই কারণেই আজও উত্তম কুমার মহানায়ক হয়ে আছেন।'

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 July 2025 15:04
শারদপ্রাতে মাধবীরাতের বউঠাকুরানি রূপে চিরন্তন ‘চারুলতা’ তিনি। আবার তিনি উত্তমকুমারের অজস্র হিট ছবির নায়িকাও। তিনি মাধবী মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গেই মন নিয়ে কাছাকাছি আরও দূরে যেতে চেয়েছিলেন উত্তম।
উত্তমকুমারের প্রয়াণ দিনে 'দ্য ওয়াল'-এ তাঁর স্মৃতিচারণে কিংবদন্তি অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। আলাপচারিতায় শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

মাধবী মুখোপাধ্যায় জানালেন একদম অন্য আঙ্গিকের দরকারি কথা। বললেন, 'আজ ৪৫ বছর হল উত্তম কুমার চলে গিয়েছেন। কিন্তু আজও যেখানেই যাই, সবাই উত্তম কুমারের কথাই জিজ্ঞেস করেন। আরও তো অনেক বড় অভিনেতা ছিলেন ঐ সময়, তাঁদের কথা তো কেউ জিজ্ঞেস করে না! কেন? তার কারণ হল, উত্তম কুমার যেমন বড় অভিনেতা ছিলেন, ওঁর সমসাময়িক সুপুরুষ অভিনেতা আরও অনেকে ছিলেন। নাম আমি বলব না। তাহলে কি উত্তম কুমার সুপুরুষ বলে আজও প্রাসঙ্গিক? না। বিশাল বড় শিল্পী বলে? সে তো অনেকে আছেন। তার কারণ হচ্ছে, উত্তম কুমারের এমন একটা মন ছিল, যা দিয়ে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে উনি মিশতেন। ভেদাভেদ ছিল না। যাঁরা ছোট তাঁদের কাছে টেনে নিতেন উত্তম কুমার, যাঁরা বড় তাঁদের শ্রদ্ধাও করতেন। '

উত্তমকুমারের পরোপকার নিয়ে মাধবী বললেন 'যখন দেশে বন্যা হয়েছে, উত্তম কুমার দেখলেন ওঁর কাছে যা পয়সা আছে সেটা মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া যথেষ্ট নয়। কিন্তু উনি যদি নিজে রাস্তায় নেমে অর্থ সাহায্য করতে বলেন, মানুষ এগিয়ে আসবে। তাই করেছেন উনি। বাড়ির মেয়ে বউরা গলার সোনার হার খুলে বন্যাত্রাণ ফান্ডে উত্তম কুমারের হাতে দিয়েছেন। এটা যখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনকার ঘটনা।
আবার যখন জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী, তখনও উত্তম কুমার বলিউড ও টলিউড স্টারদের নিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করে বিশাল অঙ্কের টাকা জ্যোতি বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ত্রাণের কাজে। উত্তমকুমার কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদে কোন রাজনৈতিক দলের লোক বসে আছেন এটা কখনও ভাবেননি। কংগ্রেস, সিপিএম সবার পাশে থেকেছেন। এই যে দেশের প্রতি সম্মান, মানুষের প্রতি ভালবাসা, এই কারণেই আজও উত্তম কুমার মহানায়ক হয়ে আছেন।'

উত্তম কুমারের আরও অনেক স্বপ্ন ছিল, সেই সব স্বপ্নপূরণ কেন হয়নি, তাও জানালেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। অকপটে বললেন, 'একটা হাউস করবেন বলে উনি ভেবেছিলেন। কর্মাশিয়াল ছবি হবে একটা ফ্লোরে, আর্ট ছবি হবে একটা ফ্লোরে আর একটা ফ্লোরে মঞ্চ হবে। আমি বলি সব ফিল্মই আর্ট ফিল্ম। তবু তো একটা বিভাজন করা হয়। তাই উনি এটা ভেবেছিলেন। এরকম জায়গা উনি অনেক খুঁজেছেন। কয়েকটা জায়গা ওঁকে দিয়েছিলেন সরকার, কিন্তু সেই জায়গাগুলো ওঁর পছন্দ হয়নি। তার পরে তো উনি চলেই গেলেন অকালে।"
তবে আজও বেঁচে আছে উত্তম কুমারের আর এক স্বপ্ন, যা উনি গঠন করেছিলেন। 'শিল্পী সংসদ'। এই শিল্পী সংসদ গড়ে, টাকা তুলে, শেষ বয়সে কর্মহীন দুস্থ শিল্পীদের সাহায্যে আর্থিক ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন উত্তম কুমার। কাদের কাদের না টাকা তুলে দিয়েছেন উত্তম কুমার ও শিল্পী সংসদ-- অখিল বন্ধু ঘোষ (গায়ক), অমূল্য হালদার (অভিনেতা), আলপনা গুপ্ত (অভিনেত্রী), ঋত্বিক ঘটক (পরিচালক), নীভাননী দেবী (অভিনেত্রী), আশালতা মুখার্জী (অভিনেত্রী), অজিত চ্যাটার্জী (কৌতুকাভিনেতা), নবদ্বীপ হালদার ও তাঁর পরিবার, নৃপতি চ্যাটার্জী, আরতি মজুমদার (অভিনেত্রী), সুশীল মজুমদার (অভিনেতা), জয়শ্রী সেন, বব দাস (কোরিওগ্রাফার)-- এমন আরও অসংখ্য নাম, যাঁদের পাশে দাঁড়ান উত্তম কুমার।

অভিনেত্রী শমিতা বিশ্বাসের গাড়ি দুর্ঘটনা হলে মুখের প্লাসিক সার্জারি করতেও টাকা দেন উত্তম কুমার ও শিল্পী সংসদ।
উত্তম কুমার যখন মারা গেলেন তার পরে রিলিজ করেছিল ওঁর 'দুই পৃথিবী' ছবিটা। সেই ছবি শুধু স্বর্গীয় উত্তমকুমারকে দেখতে লোকে সিনেমা হল হাউসফুল করে দেয়। এই ছবি সুপারহিট করার সব টাকাপয়সাই হল শিল্পী সংসদের সম্পদ। সেই পয়সা দিয়েই চলছে আজও। যেমন কয়েক বছর আগেই প্রয়াত মিস শেফালীকেও শেষ বয়সে দেখে এই শিল্পী সংসদ। তাছাড়া আজও উত্তম কুমারের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনে শিল্পী সংসদ দুটো অনুষ্ঠান করে। তার থেকে প্রাপ্ত টাকা যায় শিল্পী সংসদ ফান্ডে। কেন আজও আসেন দর্শকরা? উত্তম কুমারকে ভালোবাসেন বলেই তো। "এটা তো উত্তম কুমারের আদর্শ। পরের প্রজন্ম কী করবে, শিল্পী সংসদকে বাঁচিয়ে রাখবে কিনা, জানি না। তবে এখনও পর্যন্ত আছে।' শুধু তাই নয় সুপ্রিয়া দেবীর পর দীর্ঘদিন শিল্পী সংসদের সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। সভাপতি হিসেবে মাধবী অনেক কাজও করেছিলেন। এখন সভাপতি পদে রয়েছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

ব্যক্তিগত উত্তমকে নিয়ে মাধবী বললেন 'আমার নিজের জীবনেও দেখেছি, আমি যখন উত্তম কুমারের ছবি করতে গিয়েছি আউটডোরে, তখন আমরা একটা পরিবারের মতো। উত্তম বাবু আর সুপ্রিয়া দেবী ওঁদের সঙ্গে আমায় ডেকে নিতেন সব ব্যাপারে। সুপ্রিয়া দেবী রান্না করতেন, তার পরে আমরা তিনজনে বসে খেতাম। উত্তম বাবুর মধ্যে ভেদ জ্ঞানটা একটু কম ছিল।
উত্তম বাবু নেই, সুপ্রিয়া দেবীও নেই। খুব মনে পড়ে সুপ্রিয়া দেবীর কথা। শেষ যখন ওঁর বাড়ি গেলাম শিল্পী সংসদের এক মিটিংয়ে, আমায় বারবার বলেছেন, 'মাধু তুই আমার সঙ্গে সারাদিন থাকবি আমিই রান্না করব, তোকে রেঁধেবেড়ে খাওয়াব।' আমার আর সময় করে যাওয়া হয়নি। সুপ্রিয়া দেবী চলে গেলেন, আমার একটা আফসোস থেকে গেল।' সজল চোখে বলে চলেন মাধবী।