রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত ‘নির্ভানা ২০২৫’-এর মঞ্চে নাচ ও গানের মাধ্যমে সমাজের একাধিক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরলেন শিল্পীরা।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 21 December 2025 12:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাচ শুধু মুদ্রা আর তাল-লয়ের খেলাই নয়, নাচ যে বক্তব্য রাখে, সমাজকে প্রশ্ন করে এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়-তারই জীবন্ত প্রমাণ দিল নির্ভানা ২০২৫ (NIRVANA 2025)। দমদম রিদমস্কেপের (Dum Dum Rhythmscape) বার্ষিক নৃত্যানুষ্ঠান, হল রবীন্দ্রসদনে।
শুরু থেকেই অনুষ্ঠানটির সুর ছিল স্পষ্ট-শিল্প মানে কেবল মঞ্চের আলো নয়, শিল্প মানে দায়বদ্ধতা। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে শ্রীমতী অনুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Smt. Anushree Banerjee) তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই সন্ধ্যায় অংশ নেন দমদম রিদমস্কেপের ২০০-র বেশি শিক্ষার্থী। তাঁদের সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগ করে নেয় আশিয়ানা (NGO Aashiyana)-র শিশুরা। একসঙ্গে নাচ, একসঙ্গে গল্প বলা—এই মিলনই যেন গোটা অনুষ্ঠানের প্রাণ হয়ে ওঠে।
নৃত্যানুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘নারী’ (Naari)। এই প্রযোজনায় সময়ের স্রোতে মহিলাদের যাত্রাপথকে তুলে ধরা হয়। সতীদাহের মতো ভয়াবহ সামাজিক প্রথা থেকে শুরু করে আজকের দিনের পণপ্রথা, নারী নির্যাতন ও যৌন হিংসার মতো বাস্তব সমস্যার ছবিই উঠে আসে নাচের ভাষায়। কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও যন্ত্রণা, কোথাও আবার আশার আলো- সব মিলিয়ে ‘নারী’ দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। বক্তব্যে কোথাও অতিনাটক নেই, কিন্তু অনুভূতিতে ছিল তীব্রতা। নাচের মুদ্রা আর দৃশ্যকল্পে প্রশ্ন ছোড়া হয়েছে সমাজের দিকেই।
এছাড়াও সন্ধ্যাজুড়ে একের পর এক দৃশ্যত ও আবেগে ভরপুর নৃত্য পরিবেশন হয়। প্রতিটি পরিবেশনেই ছিল গল্প বলার চেষ্টা-কখনও সম্পর্কের কথা, কখনও মানবিকতার, কখনও আবার আত্মপ্রকাশের।
অনুষ্ঠানের ভাবনার কথা বলতে গিয়ে শ্রীমতী অনুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “‘নির্ভানা ২০২৫’ আমার কাছে খুব কাছের একটা প্রজেক্ট। আমি চাই আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শুধু স্টেপ শেখায় আটকে না থেকে বুঝুক, একজন শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব কী। আমাদের কাছে নাচ মানে শুধু পারফরম্যান্স নয়, নাচ মানে সংবেদনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি আর সচেতনতা। আশিয়ানার শিশুদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিয়ে আমরা এমন গল্প বলতে চেয়েছি, যা ভাবায়, নাড়া দেয় এবং বদলের কথা মনে করিয়ে দেয়।”
অনুষ্ঠানটি দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সোমলতা আচার্য (Ms. Somlata Acharya)। তাঁর কথায়, “নাচ এমন একটা মাধ্যম, যেখানে অনেক সময় শব্দের প্রয়োজনই পড়ে না। ‘নির্ভানা ২০২৫’ খুব সুন্দরভাবে মনে করিয়ে দিল শিল্প কীভাবে সচেতনতা, সহমর্মিতা আর দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।”
শিক্ষাবিদ ও কাউন্সেলর ডাঃ জোনাকি মুখোপাধ্যায় (Dr. Jonaki Mukherjee) সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকটি তুলে ধরে বলেন, “যখন ছোটরা শিল্পের মাধ্যমে সামাজিক বাস্তবতাকে প্রকাশ করে, তখন সেটা শুধু পারফরম্যান্স থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মসমীক্ষা আর আরোগ্যের মাধ্যম। নির্ভানা ২০২৫ সংলাপ, অন্তর্ভুক্তি আর মানসিক সচেতনতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
এই সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন একঝাঁক বিশিষ্ট অতিথি ডাঃ জোনাকি মুখোপাধ্যায়, সোমলতা আচার্য, ভারতের প্রথম মহিলা দমকলকর্মী তানিয়া সান্যাল (Ms. Taniya Sanyal), তন্তুজ-র (Tantujā) ম্যানেজিং ডিরেক্টর আইএএস রবীন্দ্রনাথ রায় (Mr. Rabindranath Roy, IAS), বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার কোহিনূর সেন বরাট (Mr. Kohinoor Sen Barat) এবং নৃত্যশিল্পী সুজয় ঠাকুর (Mr. Sujoy Thakur)।