মোহিনী লেখেন “মুক্তির মন্দির সোপান তলে”। সেই গানে সুরারোপ করে প্রথম গেয়ে শোনান কৃষ্ণচন্দ্র দে।
এই গান শুধু গানের বইতে নয়, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজী জয়ন্তীর আবশ্যিক অঙ্গ হয়ে ওঠে। কিন্তু তখন কপিরাইট বা রয়্যালটি— কিছুই পাননি।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 17 August 2025 20:29
প্রতিবারের মতো এবারও সকাল থেকে পাড়ায় পাড়ায় বাজছে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই আগুনঝরা গান— “মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান”। অথচ এই গানটির স্রষ্টার নাম ক’জনই বা মনে রাখেন? অনেকেই অজ্ঞতার কারণে উল্টে বলেন, এই গানটি নাকি প্রচলিত।
এ গান লিখেছিলেন কবি মোহিনী চৌধুরী। এক কিংবদন্তি গীতিকার, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের আবেগকে শব্দে বেঁধে যুগের পর যুগ মানুষের মনে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

১৯২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায় জন্ম মোহিনী চৌধুরীর। ছাত্রাবস্থাতেই সপরিবার কলকাতায় চলে আসেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালিখির ঝোঁক, বিশেষত গান। তাঁর গানে গ্রামবাংলার জীবন, বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও দেশপ্রেম মিলেমিশে থাকত।
চারের দশকের গোড়ায়, ১৯৪৩ সালে প্রথম রেকর্ড হয় তাঁর লেখা গান। সামান্য জনপ্রিয়তা পেলেও সঠিক স্বীকৃতি তখনও দূরে। এই সময়েই তাঁর জীবনে আসেন এক বন্ধু, অশোক সরকার। নজরুলপ্রেমী, চুল-দাড়ি নজরুলের মতো, কখনও ম্যাজিক দেখান, কখনও অদ্ভুত খেয়ালে মেতে থাকেন। একদিন হঠাৎ এসে বললেন, "তুই তো গান লিখছিস, চল, তোকে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাছে নিয়ে যাব। তাঁর ছবিতে গান লিখবি।"
শৈলজানন্দ তখন নামী পরিচালক, নতুন ছবির ব্যস্ততা। রাস্তায় দেখা হতেই নবীন গীতিকারকে বললেন, "তোমার গানের খাতা দিয়ে যাও, পরে দেখে নেব।"
কিন্তু পরে জানা গেল, ছবির সব গানই নজরুল লিখবেন, সুর করবেন গিরীন চক্রবর্তী। মোহিনীর গান বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। হতাশ হয়ে খাতা ফেরত নিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু শৈলজানন্দ তাঁকে এক বিশেষ দৃশ্যের জন্য গান লেখার সুযোগ দেন। সেই গান ছিল, “দিন দুনিয়ার মালিক তোমার দীনকে দয়া হয় না”। ‘অভিনয় নয়’ (১৯৪৪) ছবির এই গান হিট হয়ে মোহিনীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
অসাধারণ জনপ্রিয়তার পরও পরবর্তী সময়ে বহু জায়গায় গীতিকার হিসেবে লেখা হতে লাগল, ‘প্রচলিত’। বন্ধু অশোক সরকার একদিন আমেরিকায় একটি আন্তর্জাতিক গানের অ্যালবামে গানটি শুনে দেখলেন, গীতিকার অজ্ঞাত। অথচ তিনি নিজেই তো এই গানের সূত্রধর! চিঠি লিখে প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু মীমাংসা হওয়ার আগেই প্রয়াত হলেন।
মুক্তির মন্দির সোপান তলে— ইতিহাসের সঙ্গী
স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাপে, রবীন্দ্র-নজরুল-অতুলপ্রসাদের পথ অনুসরণ করে মোহিনী লেখেন “মুক্তির মন্দির সোপান তলে”। সেই গানে সুরারোপ করে প্রথম গেয়ে শোনান কৃষ্ণচন্দ্র দে।
এই গান শুধু গানের বইতে নয়, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজী জয়ন্তীর আবশ্যিক অঙ্গ হয়ে ওঠে। কিন্তু তখন কপিরাইট বা রয়্যালটি কিছুই পাননি। প্রতিটি রেকর্ডের জন্য মাত্র ছ’টাকা। স্ত্রী লীলা চৌধুরীর ক্ষোভের জবাবে তিনি বলতেন, "টাকা তো সেপটিক ট্যাঙ্কে যাবে, সৃষ্টি থেকে যাবে।" এই গান আন্দামানের সেলুলার জেলের দেয়ালে খোদাই করা হয়েছিল। কিন্তু গীতিকারের নাম বাদ পড়েছিল। একমাত্র ডায়মন্ড হারবারের অরবিন্দ উদ্যানে তাঁর নাম-সহ গানটির শিলালিপি রয়েছে।
পাঁচ-ছয়ের দশকে গায়ক সবিতাব্রত দত্ত তাঁর প্রতিটি শোতে গানটি গাইতেন এবং গীতিকারের নাম ঘোষণা করতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শেখ মুজিবর রহমানের উপস্থিতিতে এই গান গেয়ে মোহিনীর নাম জনসমক্ষে উচ্চারণ করেন সবিতাব্রত। রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত সেই মুহূর্ত মোহিনীর জীবনের অন্যতম গর্বের অধ্যায় হয়ে থাকে।
‘মুক্তির মন্দির’-এর রেকর্ডের অপর পিঠে ছিল “আজি কাশ্মীর হতে কন্যাকুমারী”, যুদ্ধের আহ্বানমুখর গান। কিন্তু স্বাধীনতার পর সরকার গানটি নিষিদ্ধ করে ‘সিন্ধু’ শব্দ ব্যবহারের অভিযোগে। হাইকোর্টের উকিল অনিল মল্লিক যুক্তি দেন, “জাতীয় সঙ্গীতে সিন্ধু শব্দ থাকলে, এই গান নিষিদ্ধ কেন?” এবং গানটি পুনরায় চালু হয়।
‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি’, ‘সখি চন্দ্রবদনী’, ‘ভালবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, এ রকম বহু গান কালজয়ী হয়েছে। উত্তম কুমারের ছবির নামকরণেও এসেছে তাঁর গান। তবে সাফল্যের পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন অবহেলা। সুযোগের দরজা বারবার বন্ধ হয়েছে।
দেশভাগের বেদনা থেকে জন্ম নেয় গান, “শুনি তাকদুম বাজে ভাঙা ঢোল”। পরে এর কথায় পরিবর্তন করে হয় “বাংলাদেশের ঢোল”, আর বহু মানুষ ভুলভাবে ধরে নেন গানের লেখক মীরা দেববর্মণ। এখানেও হারিয়ে যায় মোহিনীর নাম।
পরিবারের সমস্যা, সুযোগের অভাব, আর্থিক টানাপড়েন, সব মিলিয়ে একসময় চেতলার বস্তিতে ভাড়া থাকেন। সংসদীয় সচিব ও শিল্পপতির সহকারী হিসেবে চাকরি করেন। ছোট ছেলের অগ্নিদগ্ধ মৃত্যু তাঁর ও লীলা চৌধুরীর জীবনে অমোচনীয় ক্ষত রেখে যায়। ১৯৮৭ সালের ২১ মে, সারাদিন স্টুডিওতে গান রেকর্ডিংয়ের কাজে কাটানোর পর বাড়ি ফেরেন শুধু টোস্ট-অমলেট খেয়ে। রাতে হৃদরোগে প্রয়াত হন।
পরের দিন তাঁর মৃত্যুতে সঙ্গীত বা রাজনৈতিক জগতের একজন মানুষও হাজির হননি। এমনকি যাঁদের জন্য আগের দিন গান লিখেছিলেন, তাঁরাও না।
মোহিনী চৌধুরী ছিলেন সহজ-সরল মানুষ। নিজের জন্য গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেননি। তবুও বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি থেকে গেছেন এক মহীরুহের মতো। আজও তাঁর গান বাজে, মানুষ গায়, কিন্তু গীতিকারের নাম অজানাই থেকে যায়।
তাই শতবর্ষে প্রশ্নটা রয়ে যায়, আমরা কি কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করতে পারলাম? যে মানুষ বাংলা স্বদেশি গানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁকে মনে রাখাই হোক আমাদের স্বাধীনতা দিবসের আসল অঙ্গীকার।