মোতিলাল বলিউডের ‘গোল্ডেন এরা’র এক এমন শিল্পী, যাঁর নাম মস্ত খাতায় সোনালি কালির কলমে লেখার কথা ছিল।

ছবি-সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 11 June 2025 17:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক দশকে ৬০টির বেশি ছবিতে নায়কের চরিত্র, পার্শ্বচরিত্র ও দোর্দন্ডপ্রতাপ ভিলেনের চরিত্রে পর্দা কাঁপিয়েছেন একসময়। মহাত্মা গান্ধীর প্রশংসা পেয়েছিলেন, তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরেছিলেন। এহেন মানুষকে মৃত্যু টলাতে পারেনি, বরং হারিয়ে দিয়েছিল জীবন। একাকীত্ব ও অবহেলায় কাটে তাঁর শেষ জীবন।
মোতিলাল বলিউডের ‘গোল্ডেন এরা’র এক এমন শিল্পী, যাঁর নাম মস্ত খাতায় সোনালি কালির কলমে লেখার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভারতীয় সিনেমা প্রায় ভুলতে বসেছে তাঁকে।
১৯৫৫ সালের 'দেবদাস'-এ চুনিলালের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয়। পাশাপাশি, ‘সম্পৎ’ (১৯৫২), ‘অনাড়ি’ (১৯৫৯), ও ‘পয়গাম’ (১৯৫৯)-এর মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয় ছিল সাবলীল ও চরম বাস্তবধর্মী। প্রথম হিট পেয়েছিলেন মেহবুব খানের 'জাগীরদার' (১৯৩৮)-এর হাত ধরে। তাঁর শেষ ছবি ‘ছোটি ছোটি বাতেঁ’ মুক্তি পায় তাঁর মৃত্যুর পর।

ছবি-সংগৃহীত
মোতিলাল এমন এক প্রডিজি, যাঁর অভিনয় দেখে পাঠ নেন অমিতাভ, নাসিরুদ্দিন, দিলীপ কুমারের মতো তাবড় তাবড় অভিনেতা।
অমিতাভ বচ্চন একবার লিখেছিলেন, ‘আজ যদি মোতিলাল জীবিত থাকতেন, তাঁর বহুমুখী প্রতিভা তাঁকে আজকের সময়েও সামনের সারিতে শ্রেষ্ঠ আসনজুড়ে থাকতেন।’
নাসিরুদ্দিন শাহ ২০২৩-এ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা যেমন বলরাজ সাহনি ও মোতিলালের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ছিলাম, আজকের প্রজন্ম আমাদের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে এগোচ্ছে।’
পরিচালক সুধীর মিশ্র একবার বলেছিলেন, ‘মোতিলালের কাজ নিয়ে রেট্রোসপেকটিভ হওয়া উচিত। অভিনয় শেখার স্কুলে তাঁকে নিয়ে পড়ানো উচিত, জানা উচিত তাঁকে। তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা এক অভিনেতা।’
‘অচ্ছুত’ (১৯৪০) নামের একটি ছবিতে এক দলিত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মোতিলাল। ছবিতে সমাজ সচেতনতার এই দৃষ্টান্ত দেখে মহাত্মা গান্ধী ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল পর্যন্ত প্রশংসা করেছিলেন এই গুণী মানুষটির। সেই যুগে দাঁড়িয়ে এই ছবি ছিল জাতপাত ও ছুঁতমার্গ বিরোধী একটি সাহসী পদক্ষেপ।

ছবি-সংগৃহীত
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আয়নায় নানা রঙের আলো খেলেছে বরাবর। অত্যন্ত রঙিন ও মুক্তস্বভাবের মানুষটি ভালবাসতেন জুয়া, বিলাসবহুল জীবনযাপন। পছন্দ ছিল বিমান চালানো। কিন্তু এই জীবনচর্যাই তাঁকে অর্থনৈতিকভাবে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয় আস্তে আস্তে। তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিলেন অভিনেত্রী শোভনা সমর্থ, যিনি অভিনেত্রী কাজলের দিদিমা, তনুজার মা।
১৯৬৫-তে মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৫৪। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটিয়েছিলেন অর্থহীনতা ও আংশিক অবহেলায়। তাঁর প্রযোজিত ‘ছোটি ছোটি বাতেঁ’ সিনেমার ব্যর্থতা ও ছবির বিনিয়োগে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত তাঁকে অর্থহীন এক জীবনে এনে ফেলে।
তবে জীবনের কাছে তাঁর শেষ এক প্রশ্ন রয়ে গিয়েছিল, যার উত্তর তিনি পাননি। শান্তির আশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন যেথা সেথা। ১৯৬৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে মোতিলাল বলেছিলেন, ‘আমার শেষ ছবির চরিত্রটি, যার নামও মোতিলাল- একজন দার্শনিক। যে পৃথিবীকে, এই জগৎসংসারকে ভালবাসে, অথচ এই জগৎসংসারই তার প্রতি সদয় নয়। সেই চরিত্রে আমি আমার জীবনের ছায়া খুঁজে পাই।’
মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাৎকারে হাট করে খুলে দিয়েছিলেন জীবনের যাবতীয় পর্দা। সহজ এক স্বীকারোক্তি, ‘আমি তিনবার হার্ট অ্যাটাক, একবার প্লেন ক্র্যাশ, একবার ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি। এবং বেশ কয়েকটা বাজে ছবিও করেছি।’
জীবন তাঁকে ছেড়ে গেলেও মৃত্যুর পর কিঞ্চিৎ ক্ষতে মলমের প্রলেপের মতো এসেছে দু’টি জাতীয় পুরস্কার। ২০১৩ সালে তাঁর সম্মানে ভারত সরকার একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।