পুণীত প্রকাশ পরিচালিত ‘মহারানি ৪’ শুধু এক রাজনৈতিক গল্প নয়—এটি এক মহিলার নীরব অথচ নির্ভীক উত্থানের কাহিনি। গোটা ওয়েব সিরিজটাই যেন ফুলের পাপড়ির মতই। একটি করে পাপড়ি তুলে দেখা যাচ্ছে নতুন গল্প বেরিয়ে আসছে। আর প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি বিশ্বাসই একদিন পরিণত হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতায়।

শেষ আপডেট: 7 November 2025 12:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারে ভোট (Bihar Election 2025) চলছে। তার মধ্যেই ঠেট বিহারি লব্জে গাঁথা ওয়েব সিরিজ ‘মহারানির’ চতুর্থ (Maharani Season 4) সিরিজ মুক্তির প্রথম দিনেই হইচই ফেলে দিল। একে তো বিহার ভোটে এবার টানটান উত্তেজনা চলছে। গত সব নির্বাচনের রেকর্ড ছাপিয়ে বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় রেকর্ড ভোট পড়েছে। তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতি যখন মশগুল, তখন মহারানি পৌঁছে গিয়েছে দিল্লির ক্ষমতার করিডরে।
পুণীত প্রকাশ পরিচালিত ‘মহারানি ৪’ শুধু এক রাজনৈতিক গল্প নয়—এটি এক মহিলার নীরব অথচ নির্ভীক উত্থানের কাহিনি। গোটা ওয়েব সিরিজটাই যেন ফুলের পাপড়ির মতই। একটি করে পাপড়ি তুলে দেখা যাচ্ছে নতুন গল্প বেরিয়ে আসছে। আর প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি বিশ্বাসই একদিন পরিণত হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতায়।
এবারের গল্পের সূত্র (Maharani Season 4 Storyline)
তৃতীয় সিজনের শেষে দেখা গিয়েছিল, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী রানি ভারতী (হুমা কুরেশি) ক্রমে হয়ে উঠছেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্র। চতুর্থ সিজনে তিনি পা রাখেন দিল্লির জাতীয় রাজনীতিতে, যেখানে ক্ষমতা মানেই ক্ষুরধার, আর প্রতিশ্রুতি মানেই ছলনা।
প্রধানমন্ত্রী সুধাকর শ্রীনিবাস জোশী (বিপিন শর্মা)—চতুর, অহংকারী ও নির্মম এক রাজনীতিক—যখন জোটসঙ্গীর সমর্থন হারিয়ে বিপাকে পড়েন, তখন তিনি সাহায্যের হাত বাড়ান বিহারের মুখ্যমন্ত্রী রানির দিকে। কিন্তু রানি, যিনি তাঁর হাতে একসময়ে রাজনৈতিকভাবে অপমানিত হয়েছিলেন, এবার প্রকাশ্যে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। সেই মুহূর্তে শুরু হয়ে যায় এক ঠাণ্ডা যুদ্ধ—ক্ষমতার, প্রতিশোধের, আর আত্মসম্মানের। জোশী যখন এক পায়রা খাওয়াতে খাওয়াতে ব্যঙ্গ করে বলেন, “এই রানী তো আমার কথা শোনে”, তখন সেই দৃশ্যই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীকী চিত্র। রানি তাঁর চোখের দৃষ্টিতেই জানান দেন—এই দাবার বোর্ডে এবার তিনিই চাল দেবেন। রানি ভারতীর রাজনীতিতে আসা ছিল দুর্ঘটনা। কিন্তু ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে তাঁর উঠে আসা এক মহাকাব্যের মতো যাত্রা। এক অশিক্ষিত গৃহবধূ থেকে দেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী—এই পথের প্রতিটি ধাপ ছিল রক্ত, ঘাম, আর নিঃসঙ্গতার কাহিনি।
‘মহারানি ৪’-এ রানি শুধু রাজনীতিক নন, তিনিই এক দার্শনিক চরিত্রও। তিনি জানেন, ক্ষমতার মুকুটে যতই রত্ন ঝলমল করুক, তার নিচে কাঁটাগাছের শিকড়ই থাকে। তিনি নিজের পদত্যাগ ঘোষণা করেন, মঞ্চ ছেড়ে দেন নতুন প্রজন্মকে। কিন্তু সেই পদক্ষেপই তাঁর পরিবারের মধ্যে ফাটল ধরায়। ছেলে জয়প্রকাশ (শারদুল ভারতবাজ)—উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজের দাবি জানায়, কিন্তু রানি মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসান মেয়ে রোশনিকে (শ্বেতা বসু প্রসাদ)। সেই এক সিদ্ধান্তই গোটা পরিবারকে টেনে নেয় রাজনৈতিক অস্থিরতায়—একদিকে ছেলের অহংকার, অন্যদিকে মেয়ের দ্বিধা, আর মাঝখানে রানি, যিনি একই সঙ্গে মা, নেতা, ও রণকৌশলী।
চরিত্রের জটিলতা: প্রতিটি মুখোশের আড়ালে আরেক মুখোশ
রানি’র চারপাশে গড়ে ওঠা চরিত্রগুলো এই সিজনের মূল শক্তি। কাবেরী শ্রীধরন (কানি কুস্তিরি): রানি’র ব্যক্তিগত সচিব, যিনি একদিকে তাঁর প্রতি অনুগত, অন্যদিকে নৈতিক দ্বন্দ্বে ভোগেন। গৌরী শঙ্কর পাণ্ডে (বিনীত কুমার): সুযোগসন্ধানী রাজনীতিক, যিনি কখনও শত্রুপক্ষ, কখনও সহযোগী—এক রাজনৈতিক গিরগিটি। গায়ত্রী উপাধ্যায় (রাজেশ্বরী সচদেব): প্রধানমন্ত্রীর প্রেমিকা ও উপদেষ্টা, যিনি ক্ষমতার নেপথ্যে এক ধূর্ত কুশীলব। সত্যেন্দ্রনাথ মিশ্র (প্রমোদ পাঠক): দলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যিনি নিজেকে রানির যোগ্য উত্তরসূরি মনে করেন, কিন্তু রানি তাঁকে নয়, নিজের মেয়েকে এগিয়ে দেন—এতে দলের মধ্যে জন্ম নেয় নতুন ষড়যন্ত্র।এই চরিত্রদের আন্তঃসম্পর্কই সিরিজকে করে তুলেছে জটিল ও বাস্তব। ক্ষমতার লড়াই এখানে কেবল সংসদে নয়, পারিবারিক ডিনার টেবিলেও চলে।
রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন
পরিচালক পুণীত প্রকাশ রাজনীতিকে কোনো ‘গ্ল্যামারাইজড থ্রিলার’-এ পরিণত করেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শীতল নিষ্ঠুরতা—সিবিআই ও আয়কর দপ্তরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, সংবাদমাধ্যমের দলদাসে পরিণত হওয়া, জোট সরকারের অস্থিরতা, এবং নৈতিকতার পরাজয়। দেখতে দেখতে মনে হয় যেন আজকের খবরের শিরোনামগুলিই কাল্পনিক পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
চতুর্থ সিজিনেও হুমা কুরেশি এক কথায় অনবদ্য। তাঁর মুখের এক ঝলক নীরব অভিব্যক্তিই বলে দেয় কতটা গভীর যন্ত্রণা আর তীক্ষ্ণ কৌশল লুকিয়ে আছে এই চরিত্রে। তিনি চিৎকার করেন না, তিনি রাজনীতি করেন নীরবতায়—এটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
বিপিন শর্মা দুর্দান্ত। তাঁর প্রধানমন্ত্রী চরিত্রটিতে আছে কর্কশ রসবোধ, আত্মমুগ্ধতা, এবং সেই ছলনাময় আকর্ষণ যা বাস্তব রাজনীতিতেও অচেনা নয়। শারদুল ভারতবাজ এই সিজনের সবচেয়ে বড় চমক। তাঁর চরিত্র জয়প্রকাশ একদিকে মায়ের প্রতি ভালোবাসায় বাঁধা, অন্যদিকে হিংসা ও অসন্তোষে দগ্ধ। তাঁর সংলাপ ও দৃষ্টির বিনিময়ে বোঝা যায়—এই পরিবারেও রাজনীতি রক্তের মতোই প্রবাহিত। শ্বেতা বসু প্রসাদের রোশনি চরিত্রে এক সংযত দৃঢ়তা আছে—তিনি মায়ের ছায়া নন, বরং তাঁর পরবর্তী অধ্যায়।
দৃশ্যায়নে পরিচালক দেখিয়েছেন সংযম। অযথা আলো বা আড়ম্বর নেই। সরকারি দফতরের ধূসর করিডর, মুখ্যমন্ত্রীর বাংলোর অন্দরমহলের শৈত্য, সংসদের উত্তেজিত বিতর্ক—সব কিছুই বাস্তবের ছোঁয়া রাখে। সঙ্গীতে আনন্দ এস. বাজপেয়ীর লোকগান ‘হুমার ভাইয়া’ ও ‘সুগনওয়া’ সিরিজে আঞ্চলিক স্বাদ এনে দিয়েছে। রাজনীতির মধ্যেও সেই মাটির গন্ধ, মানুষের কণ্ঠস্বরই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
শেষ দৃশ্যে যখন রানি ভারতী মেয়ের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেখছেন, তাঁর চোখে জল জমে। নিজের প্রথম শপথগ্রহণের ভয়, অজ্ঞতা, উচ্চারণের ভুল—সব স্মৃতি ফিরে আসে। এখন তিনি অভিজ্ঞ, কিন্তু একা। ক্ষমতা তাঁকে শক্তি দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে শান্তি। রানি ভারতী যেন শিখিয়ে দেয়, রাজনীতির রাজমুকুটে যদি রত্ন থাকে, তবে তার ধারও থাকে—আর সেই ধারই একজন নারীকে করে তোলে রাণী।