লোপা হলেন খাঁচার পাখি আর সাহানা বনের পাখি। এ গান যেন দুই পাখির কথোপকথন রচিত হল মঞ্চে।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 31 August 2025 20:14
একবার সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের প্রথম যৌবনের ছবি পোস্ট করে জনপ্রিয় গায়িকা সাহানা বাজপেয়ী (Sahana Bajpeyi) লিখেছিলেন 'তখন আমি নবম শ্রেণী, তখন আমি শাড়ি'। সাহানার মনে চিরকাল ছিল সেই জয় গোস্বামীর লেখা লোপামুদ্রা মিত্রর গাওয়া 'বেণীমাধব'। লোপামুদ্রাকে দেখেই সাহানার গানের জগতে আসা। সাহানার রোলমডেল তখন লোপামুদ্রা ও তাঁর কবিতা-গান। 'অবনী বাড়ি আছো', 'সাঁকোটা দুলছে', 'আবার আসিব ফিরে' এসব গানেই ডুবে আছেন সাহানা। তিনি নিজেও জানতেন না সেই লোপামুদ্রা মিত্র তাঁকে ফোন করে বলবেন 'চল আমরা একসঙ্গে মঞ্চে গান গাই!
জি ডি বিড়লা সভাঘরে গত ২৩ অগস্ট,২৫ শনিবার প্রথম বার একসঙ্গে জুটি বেঁধে লাইভ গান গাইলেন লোপামুদ্রা-সাহানা। দুই সময়ের গায়িকা এক মঞ্চে।
জি ডি বিড়লা সভাঘরের উদ্যোগেই এমন একটি অনির্চনীয় সঙ্গীত সন্ধ্যা উপহার পাওয়া গেল। দুই গায়িকার গানের সঙ্গে সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন গাবু ।

বাংলা ভাষা বাঁচাতে বর্তমানে যে লড়াই চলছে সেই প্রাসঙ্গিকতা টেনে সাহানা প্রথমে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথের গান 'প্রচণ্ড গর্জনে আসিল একি দুর্দিন--. দারুণ ঘনঘটা, অবিরল অশনিতর্জন'। স্যমন্তক সিনহার আয়োজনে এই রবীন্দ্রসঙ্গীত দুর্দান্ত আবহে আগেই গেয়েছিলেন সাহানা। এবার গাবুর ব্যান্ডের স্পর্শে এ গানে প্রথমেই দর্শকমন জিতে নিল।
এবার লোপামুদ্রা-সাহানা দ্বৈত কণ্ঠে গাইলেন 'তোমরা যা বল তাই বল'। যেন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। লোপা বললেন 'সাহানা আর এই গাবুদের ব্যান্ড আমার থেকে অনেক জুনিয়র। কিন্তু ছোটদের সঙ্গে দৌড়তে আমার ভাল লাগে।'
অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথের গান ও মাটির গান। সাহানার গলায় আছে মাটির সুর। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বহুদিন যদিও তিনি বিদেশিনী। কিন্তু লাল মাটির গন্ধ আজও তাঁর কণ্ঠে অব্যাহত। 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি,মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি' লালন ফকিরের গানকে প্রাণ দিলেন সাহানা। লালন সাঁইজির গানে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়েও মানবতা বড় হয়ে উঠল।

লোপা ধরলেন এবার নিজের গান সৈকত কুণ্ডুর কথায় জয় সরকারের সুরে 'এ মানচিত্র জ্বলছে জ্বলুক এই দাবানল পোড়াক চোখ, আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক'। মন্ত্রমুগ্ধ সমস্ত জি ডি বিড়লা সভাঘর। সমবেত কণ্ঠে সবাই গলা মেলালেন 'আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক'।
সাহানা এবার ফিরে গেলেন তাঁর বাংলা ছবিতে প্লেব্যাকে। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'মহারাজ একী সাজে', তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় 'এক যে ছিল রাজা' ছবির সেই গান। এবার সেই সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'হেমলক সোসাইটি'র জনপ্রিয় গান লোপা ধরলেন 'কতবার তোর আয়না ভেঙে চুরে ঘুরে তাকাই. আমার মতে তোর মতন কেউ নেই'। সাহানা অকপটে জানালেন এই গান প্রথমে তিনিই সৃজিতের কাছে গাইতে আবদার করেছিলেন। কিন্তু সৃজিত বলেন 'এ গান লোপাদি ছাড়া ভাবাই যায় না'! এই মুক্তকণ্ঠে অকপট স্বীকারোক্তি শুনে লোপামুদ্রা এই গান গাওয়ার সময় সাহানাকেই উৎসর্গ করলেন। গাবুর মিউজিকে গমগম করে উঠল যখন লোপা-সাহানা ডুয়েট গাইছেন 'কখনো চটি জামা ছেড়ে রেখে রাস্তায় এসে দাঁড়া'।
এবার আবার মাটির গানে ফিরলেন সাহানা। 'কী যাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে' সত্যি সত্যি সাহানা। সেই একই ভাব রেখে লোপা ধরলেন তাঁর দু দশক আগের সিডি যুগের 'সোনা বন্দে আমারে দিওয়ানা বানাইলো'। তিনি অকপটে বললেন লোকগানের উচ্চারণে তিনি দর ছিলেন না। কিন্তু স্বর্গীয় কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য লোপামুদ্রাকে বলেছিলেন 'লোপাদি তুমি যেমন পারো সেই উচ্চারণেই গাইবে লোকগান'! লোপা বললেন সেই ২০০১ সাল থেকে লোকগান গাইতে আমি লড়ে যাচ্ছি। লোপা মুগ্ধ করলেন যখন গাইছেন 'রূপের ঝলক দেখিয়া তার আমি হইলাম কালা'।

এবার আবার দু'জনে ফিরলেন রবীন্দ্রনাথের গানে। লোপা হলেন খাঁচার পাখি আর সাহানা বনের পাখি। এ গান যেন দুই পাখির কথোপকথন রচিত হল মঞ্চে। এরপর লোপামুদ্রার কণ্ঠে 'বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচেনা' মন ভরাল। আবার সাহানার কণ্ঠে 'আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারে লয়ে যাও আমায়' শুনে সবাই চুপ। সত্যি অপার হয়ে বসে রইল হাউসফুল বিড়লা সভাঘর। লোপা-সাহানা দু-জনায় ভাবতেই পারেননি তাঁদের দেখতে হাউসফুল হবে সভাঘর। সমঝদার ক্লাস শ্রোতাদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল প্রেক্ষাগৃহ।
জয় সরকারের নতুন সংগীত আয়োজনে লোপামুদ্রার হিট রবীন্দ্রসঙ্গীত 'মম চিত্তে'। তাও তিনি শুনিয়ে মন ভরিয়ে দিলেন। তবে সঙ্গীত আয়োজনে এবার গাবু। যার বাবা ছিলেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়। সেই 'মহীনের ঘোড়াগুলি'র পথপ্রদর্শক।
বিদেশে থাকা সাহানা অশ্রুসজল হয়ে বললেন সামনেই পুজো আসছে কিন্তু আমাকে ঠান্ডার দেশে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে অফিস করতে হয়। লোপা বললেন 'মন খারাপ কর না' সাহানা ধরলেন শরতের গান
'আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে'।
এবার মঞ্চে দুই গায়িকা খুললেন নতুন এক খেলা। দু'জন দু'জনকে দিলেন চ্যালেঞ্জ। তবে একে আবদার বলাই ভাল। আবদারটা কী?
সাহানা গাইবেন লোপার আইকনিক গান আর লোপা গাইবেন সাহানার সিগনেচার গান। দু'জনেই ভীষণ শঙ্কিত। ভরসা জোগান দর্শকরা। তাঁরা চিরাচরিতের বাইরে এই বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে চান।
লোপামুদ্রা মিত্র গাইলেন 'আমার হাত বাঁন্ধিবি, পা বাঁন্ধিবি, মন বাঁন্ধিবি..কেমনে..
আমার চোখ বাঁন্ধিবি, মুখ বাঁন্ধিবি
পরান বাঁন্ধিবি, কেমনে...'

গান শেষে লোপাদিকে জড়িয়ে ধরলেন সাহানা। দু'জনের চোখে জল। এবার গাছকোমর দিয়ে আঁচল দিয়ে সাহানা ধরলেন 'ছাতা ধরো হে দেওরা হ্যেসান সুন্দর খোঁপা আমার ভিগ গিলাই না'। লোপা বললেন এ গান তো আমার নিজের নয়, প্রথম গেয়েছিলেন কালী দাশগুপ্ত। সেই গানের সাহানার গলাতেও দারুণ খুলল। গানের তালে তালে নেচেও উঠলেন লোপামুদ্রা।
তবে লোপামুদ্রার এই সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ নিবেদন ছিল 'যাও পাখি'। বর জয় সরকার তাঁকে সব শক্ত গান দেন বলে একটু মজাও করলেন। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহের দেওয়ালে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল লোপার উদ্যত কণ্ঠ।
সাহানা শেষে শোনালেন তাঁর প্রথম মেয়েবেলায় লেখা গান 'একটা ছেলে মনের আয়নাতে এক্কাদোক্কা খেলে'!
তবে দু-জনায় সমস্ত শ্রোতাদের সঙ্গে গাইলেন তাঁদের শেষ নিবেদন 'রেখো না আর,বেঁধো না আর,কুলের কাছাকাছি। আমি ডুবতে রাজি আছি, তোমার খোলা হাওয়া।'
সত্যি এই বিরল সন্ধ্যা ছিল খোলা হাওয়ার মতোই। সাদা খোলের শাড়িতে দুই গায়িকা দাঁড়িয়ে যে ভাবে নতুনদের সঙ্গে গেয়ে গেলেন তা প্রশংসাতীত। যাবার সময় সকল দর্শকের মনে একটাই প্রশ্ন ''আর কি কখনো কবে এমন সন্ধ্যা হবে'!