'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবি থেকেই ভানু-জহর জুটির সর্বাধিক জনপ্রিয়তা শুরু হয়। তবে পরের দিকে ছবিতে তাঁদের জায়গা কমতে থাকে। কোন জায়গায় হয়ত ৬০ টা শট, সেখানে ৫৮ টা শটে নায়ক-নায়িকা। বাকি দুটোতে ভানু-জহর। এরমধ্যেই নিজেদের জাত চেনাতে হত তাঁদের।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 19 September 2025 14:37
বাংলা ছবিতে ভানু-জহর জুটি ছিল বক্সঅফিসে হিট। কিন্তু এই জায়গাটা পেতে তাঁদের কম লড়াই করতে হয়নি। বহু মানুষের অবহেলা, বঞ্চনা, উপহাস পার করে এই জুটি তৈরি হয়েছিল। অথচ তাঁদের কাজ ছিল মানুষকে হাসানো। হাসি দিয়েই তাঁরা দু'জন সকলের মন জয় করে নেন। কিন্তু সে যুগ থেকে আজও কৌতুক অভিনয় এই দেশে সর্বজনস্বীকৃত শিল্পকলার মর্যাদা পায়নি। এদিকে একসময় জলসা থেকে অফিস ক্লাবের ফাংশানে কৌতুকাভিনয় বড় জায়গা পেত। যে জুটি এই কৌতুকাভিনয়কে মধ্যবিত্তর অন্দরমহলে জনপ্রিয় করে তোলেন তাঁরা হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায়। সাদা কালো যুগের বাংলা ছবির লরেল-হার্ডি যেন তাঁরা।
আজ জহর রায়ের জন্মদিনে ভানু-জহর জুটির বন্ধুত্বের গল্প। বহু মানুষ তাঁদের জুটি ভাঙতে চেয়েছিল কিন্তু সেই জুটি ভেঙেছিল জহর রায়ের মৃত্যুতে। তবু বাংলা ছবির ইতিহাসে এই ব্র্যাকেট কেউ ভাঙতে পারেনি, পারবেও না।

জহর রায়ের সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচয় হয় পরিচালক সুশীল মজুমদারের বাড়িতে। সে ১৯৪২ সালের কথা। জহর ছিল পাটনার মানুষ। আর ভানু সবেসবে ঢাকা থেকে কলকাতা এসে উঠেছেন সুশীল মজুমদারের বাড়িতে। ঐ বাড়িতে সুশীল মজুমদারের স্ত্রী পাটনার মেয়ে হবার সুবাদে সেখানে জহর আসতেন।
'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবি থেকেই ভানু-জহর জুটির সর্বাধিক জনপ্রিয়তা শুরু হয়। তবে পরের দিকে ছবিতে তাঁদের জায়গা কমতে থাকে। কোন জায়গায় হয়ত ৬০ টা শট, সেখানে ৫৮ টা শটে নায়ক-নায়িকা। বাকি দুটোতে ভানু-জহর। এরমধ্যেই নিজেদের জাত চেনাতে হত তাঁদের।
অভিনেতাদের তুলে ধরার একটা চেষ্টা থাকে কিন্তু মেনস্ট্রিম বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে সেটা একেবারেই হয়নি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন 'হয়তো নায়ক-নায়িকা কথা বলছেন, ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তখন আমাদের ঢুকিয়ে দেওয়া হল। চিরকাল আমাদের শুনতে হয়েছে, একটা কিছু করে দাও ভাই, দর্শক যাতে হাসে। বাংলা ছবির এইটাই হচ্ছে দেউলেপোনা- হাসির পরিস্থিতি সৃষ্টি করবার ক্ষমতাও সকলে হারিয়ে বসে আছেন। প্রযোজকরা চিরকাল হাসির বাংলা ছবি করতে এসছেন হাতে টাকা কম থাকলেই। তাঁরা আর অভিনেতাদের কী টাকা দেবেন!'
একসময় ভানু বলছেন ''সাড়ে চুয়াত্তর' ছবিতে আমরা দু'জনেই অভিনয় করেছি কিন্তু প্রচারের সময় শুধুই উত্তম-সুচিত্রার নাম। শেষমেশ দর্শক চাহিদায় এমন ঝামেলা শুরু হল যে পাবলিসিটি অফিসার বাধ্য হলেন ভানু-জহরের নাম পোস্টারে দিতে। জহর ছিল অত্যন্ত শান্তপ্রিয় মানুষ, কোনও ঝামেলার মধ্যে যেতে চাইত না। জহর অনেক সময় এসব ঘটলে আমাকে বলেছে 'চেপে যা, ঝামেলা করিস না।'
জহর রায় অভিনয় ক্ষমতাটা পেয়েছিলেন পৈতৃক সূত্রে। জহরের বাবা সতু রায় ছিলেন নির্বাক যুগের ছবির একজন দাপুটে অভিনেতা। British Dominion Film Co র ছবিতে অভিনয় করেছেন। একসময় বহু বঞ্চনা সইতে হলেও, ভানু-জহরকে নিয়েই একমাত্র তাঁদের নামে সুপারহিট ছবি হয়েছে এই বাংলায়। 'ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট', 'ভানু পেল ইত্যাদি', 'এ জহর সে জহর নয়' ইত্যাদি।
তবে তাঁদের এই জুটি ভাঙতে চেয়েছিল বেশ কিছু নিন্দক। উভয়ের কাছেই উভয়ের নামে আজেবাজে কথা রটিয়েছিল। তাঁদের বন্ধুত্বে চিড় ধরানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। ভানু-জহর প্রকৃতই দু'জনকে চিনতেন। জহর রায়ের নিজের বাড়ি থাকলেও এক মেসবাড়িতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। সে ঘর ছিল জহরের পড়ার লাইব্রেরি। এমনকী তাঁর থেকে সত্যজিৎ রায়ও বই ধার নিতেন। একজন ব্যক্তি ভানুর কাছে এসে জহরের নামে বলতে লাগলেন, জানেন জহরের বাড়িতে অনেক বই দেখলাম। আসলে ওসব বুজরুকি। পড়াশোনা মোটেই করে না।' ভানু বললেন 'আমি কিন্তু আমার সব বইতে মলাট দিয়ে রেখেছি, পাছে জহরের কাছে গিয়ে আবার না বলেন, ভানুটা কিস্যু পড়াশোনা করে না।'

জহর রায়ও এমন অনেক কানভাঙানি দেওয়া মানুষদের এমন জবাব দিতেন। জহরকে এক ব্যক্তি বললেন 'কি আপনি একটা নিজের গাড়িও করতে পারলেন না?' তার উত্তরে অম্লানবদনে জহর বলেছিলেন 'কেন ভানু তো করেছে!'
ভানু বলতেন 'জহর আর আমার বন্ধুত্বের মধ্যে কোনও ফাঁক ছিল না। আমার কিছু ভাল হলে জহরের কী গর্ব। আমাদের বন্ধুত্ব পারিবারিক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। ভানুর স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের মত ছিল জহরের মতো কমেডি অ্যাক্টিং কেউ করতে পারে না। আমার ছোট ছেলে আমেরিকা গেল যখন জহরের কী আনন্দ। ত্রিশ বছর যাবৎ 'ভানু-জহর' এক ব্র্যাকেট ছিল। জহর মারা যেতে সেই ব্র্যাকেটটা ভেঙে গেল।'