
শেষ আপডেট: 18 July 2022 09:17

লতা মঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar), আশা ভোঁসলের জমানায় মুম্বই নগরীতে গান গেয়ে যে বাঙালি গায়িকা সারা ভারতের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি আরতি মুখোপাধ্যায় (Arati Mukherjee)। যার কণ্ঠ তার আগেই জয় করেছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঘরানা। বাংলা ছবির প্লে ব্যাকে আরতি যেন সত্যিই কোকিলকণ্ঠী। বম্বেতে বাংলার সেই কোকিল কণ্ঠ হিট হতেই বম্বের কোকিলকণ্ঠীদের যেন ভিত নড়ে যাবার উপক্রম হল। সেসব দিন আজও ভুলতে পারেননি আরতি মুখোপাধ্যায়। তিনি আমাদের বাঙালিদের গর্ব। কিন্তু বম্বেতে, এমনকি কলকাতাতেও কতটা সম্মান পেয়েছেন তিনি!
লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে আরতির মন ভারাক্রান্ত। তবু সব না-পাওয়া যে ভুলে থাকাও যায় না। মনের আগল খুললেন আরতি মুখোপাধ্যায়।
লতাজির সঙ্গে আপনার স্মরণীয় ঘটনা কিছু মনে পড়ে?
বম্বের কনটেস্টেই লতাজি, আশাজি সবাই এসেছিলেন গান শুনতে। আমি তখন ভীষণ ছোট। গান গেয়ে কাকা পিসিদের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বাড়িটা ছিল একদম সাঙ্গীতিক পরিবার। আমার মাও ছিলেন ভীষণ গানভক্ত। মা-ও আমার সঙ্গে যেতেন। আমি গান গেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি দর্শক আসনে। হঠাৎ শুনলাম আশাজি গেয়ে উঠলেন 'ইনা মিনা ডিকা'। শ্রী রামচন্দ্র কনডাক্ট করেছিলেন। মুগ্ধ হয়ে যাই আশাজির গলায় অমন ওয়েস্টার্ন গান শুনে। সেদিন ওই গানটা আশাজিকে তিনবার গাইতে হয়েছিল দর্শক অনুরোধে।
অল ইন্ডিয়া কনটেস্ট জেতার পর বাংলার পাশাপাশি বম্বেতে কাজ শুরু করলাম। অনিল বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করলাম বম্বেতে। হেমন্তদার সঙ্গে কলকাতা থাকতেই পরিচয় ছিল। কিন্তু তখন আমার বয়স খুব কম, তাই ফিরে এলাম কলকাতায়। পরে আবারও বম্বে থেকে ডাক এল। আবার গেলাম।
সত্যি কথা বলতে কী, তখন বম্বে শাসন করছেন লতাজি আর আশাজি। তাঁদের সঙ্গে গান করাটা অনেকটা স্বপ্নের মতো। আমি তো শুরুর দিকে বম্বেতে শিশুশিল্পী হিসেবে গাইতাম। হেমন্তদার সুরে 'সাহারা' ছবিতে ডুয়েট গাইলাম লতাজির সাথে। মীনা কুমারীর লিপে লতাজি আর আমি ডেজি ইরানির লিপে। মা সন্তানের গান। লতাজি আমাকে দেখে বললেন তুমি আমার মেয়ে। তখন আর একদম ভয় করল না লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ডুয়েট গাইতে।
https://youtu.be/mGThRagc94U
তারপর যখন বড় হয়ে নায়িকার লিপে বম্বেতে গাইতে গেলেন তখন লতা মঙ্গেশকরের এই মাতৃত্বের পরশ পেয়েছিলেন?
নাহ। বম্বেতে গাইতে এসে আমরা অনেক দুঃখ ভোগ করেছি। কিন্তু আমরা নীরবে থেকেছি। আমি, সুমন কল্যাণপুর অনেক সুপারহিট হিন্দি গান গেয়েছি। শ্রোতারা সেসব গান আজও মনে রেখেছেন। কিন্তু আমাদের গানের সংখ্যা বাড়ল না কেন? সুমনের গলা অসম্ভব ভাল ছিল। আমি সুমনের থেকে অনেকটা ছোট। কিন্তু সুমনজি কি আজ কোনও খবরে আছেন? কী অমানুষিক পলিটিক্সের শিকার সুমন কল্যাণপুর।
[caption id="attachment_2430730" align="aligncenter" width="327"]
সুমন কল্যাণপুর[/caption]
আমি কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করে বম্বেতে এসেছিলাম। দুদিন গান গেয়ে নাম করার লোভে চলে আসিনি। কিন্তু বম্বের পলিটিক্সের শিকার হয়েছি। কলকাতাও আমাকে কী দিয়েছে? ভোট পাওয়ার জন্য সব নাটক চলছে। কলকাতায় যাঁরা রাজত্ব করছেন তাঁরা কারও কথা শোনেন! কে ভাল গাইছে, কে মন্দ গাইছে তাঁরা কি শোনেন! আমরা কোন সুবিধেটা পাচ্ছি! বলেই বা কী হবে! কেউ তো শুনবে না।
আমি বম্বেতে কেন বেশি গান পেলাম না, সেটা নিয়ে কলকাতার একজনও শিল্পী বলেছেন? কেউ গলা তুলেছেন? কেউ না। অথচ দেখেছি বম্বের গায়িকারা কলকাতায় গেলে কার্যত তাঁদের পা ধুইয়ে দিচ্ছেন কলকাতার শিল্পীরা। আমার গান কলকাতার লোকদের ভাল লাগতে হবে না। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলেদের নিয়ে থাকুন আপনারা। কোনওদিন সুমন কল্যাণপুরকে নিয়ে আলোচনা দেখেছেন? সুমনজির বাংলা উচ্চারণ শুনেছেন? সুমন আর আমি সারাজীবন বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে দুঃখ ভোগ করেছি। কেউ খোঁজ নেয়নি।
এখন শুধু কে কার ক্ষমতা দেখাবে এই চলছে। বম্বেতে আমি বহুদিন আছি। আমার প্রচুর আত্মীয়স্বজন বম্বেতে থাকার সুবাদে গানের জগতের আর রাজনৈতিক জগতের নোংরামি দেখেছি।
কিন্তু কলকাতা আগে অনেক ভাল ছিল, যখন আমি কলকাতায় গান গেয়েছি। এখন দেখি, যাঁরা গান সে অর্থে জানেই না, গলা দিয়ে হাওয়া বেরোচ্ছে, তাঁরাও এখন সব কলকাতায় প্রাইজ-টাইজ পায়। টিভি খুললে তারাই বাইট দেয়। কলকাতায় কটি মাত্র লোক সব জায়গায় ঘুরছেন।
বারবার শুনেছি 'কলকাতায় আপনি তো সন্ধ্যাদির পরেই' আর বম্বেতে 'আপনি লতাজি আশাজির পরেই'। তুলনা কেন? আমি কারও আগে বা পরে নই। আমি আমার নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। সন্ধ্যাদি সন্ধ্যাদির স্টাইলে গেয়েছেন, আমি আমার স্টাইলে গেয়েছি। সন্ধ্যাদিকেও তো এই বয়সে একটা পদ্মশ্রী ছুঁড়ে দিয়েছে। ন্যূনতম তাঁকে একটা পদ্মবিভূষণ তো দেওয়া উচিত!
কলকাতায় যখন আমি আর সন্ধ্যাদি একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা কেউ কারও গান কেড়ে নিইনি। এসব দেখতামও না, কাকে কোন মিউজিক ডিরেক্টর কী গান দিলেন! আমাকে যেটা যোগ্য মনে করেছেন দিয়েছেন। কিন্তু বম্বের গল্পটা অন্য ছিল। সেখানে লতাজিই তখন সব।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হত সবটা?
লতাজি অনেক বড় সঙ্গীত সাধিকা। তাঁর প্রতি তাঁর মৃত্যুর পর আর আমার কোনও অভিযোগ নেই। আগেও তো নীরবেই ছিলাম সারাজীবন। বলে কি কোনও লাভ হবে! কেউ শুনবে না। কিন্তু যে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছি সেটা ভুলে যাব কী করে।
কলকাতায় গান পাওয়া নিয়ে সন্ধ্যাদি আর আমি কোনও দিন ঝগড়াঝাঁটিও করিনি। এটা কি ভদ্দরলোকে করে? কিন্তু ভারতবর্ষের সবথেকে বড় আর্টিস্ট যে, সে কিন্তু করেছে। তাহলে অন্যদের আর কী বলব!
বাচ্চাদের মতো সে একেবারে আবদার ধরে বসে থাকতেন। লতাজির জেদ ছিল, কোনও গান ওঁর চাই মানে সেই গানটা চাই-ই চাই। উনি চেয়েছেন মানে ওঁকে দিতেই হবে গানটা। আমরা তো কোনও দিন এসব কথা বলিনি। অথচ উনি বলেছেন, ওই উচ্চতায় থেকেও।
https://youtu.be/B3InwZu_5ag
লতাজি আর আশাজির সম্পর্ক তো আপনি কাছ থেকে দেখেছেন!
দুই বোনের ঝগড়া সবাই জানে। সে যে কী ঝগড়া, গান থেকে প্রপার্টি, সব নিয়ে। ওঁদের দুজনের ঝগড়া মিটলে যদি কোনও গান পড়ে থাকে তবে আমি, সুমনজি, বাকি যারা গাইতাম, তারা পেতাম। এখনও তাই। যে শিল্পীর যা যোগ্যতা নেই, তাঁরা তার বেশি পাচ্ছেন তাঁবেদারি করে। কলকাতার নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীই শুধু লতাজির প্রয়াণে বাইট দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের গানের হিট রেকর্ড আমার থেকে অনেক কম।
আরতি মুখোপাধ্যায় অনেক সাধনা করে গানটা শিখেছে, কিন্তু এই পলিটিক্সে সেভাবে গাইতে পারলাম কই! সন্ধ্যাদিকে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে যা কদর্যতা হল, তারপর আমার আর কোনও পুরস্কারের দরকার নেই। আমার এত কষ্ট লেগেছে সন্ধ্যাদির জন্য। আমাদের থেকে অনেক লঘু মাপের শিল্পী বড় বড় পুরস্কার পাচ্ছেন, তাঁরা রাজনৈতিক সভায় যান বলে।
আপনি যখন 'মাসুম' ছবিতে গান গেয়ে ফিল্মফেয়ারে শ্রেষ্ঠ গায়িকার সম্মান পেলেন বম্বেতে, তখন লতাজি আশাজির থেকে কোনও শুভেচ্ছা বার্তা এসেছিল? ফিল্মফেয়ারই কি আপনার কাল হল বম্বেতে?
দূর! কে ফোন করবে? ভেবেছিল পুরস্কার পেল, এবার যাক। আমার যখন বম্বেতে বিয়ে হল তখন বম্বের আর্টিস্টরা ভেবেছিলেন, এই রে কলকাতার আর্টিস্ট আমাদের এখানে পাকাপাকি রয়ে গেল! ওদের ভাত মারব এটাই ভেবেছিল। এই সব কথা বললে শেষ হবে না।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আর ডি বর্মণ, বাপ্পি লাহিড়ি-- এদের থেকে গান কেন কম পেয়েছি সেসব আর বলে কী হবে! অনেক তো বলেই দিয়েছি, তাতেই স্পষ্ট। কিন্তু ওঁদের সুরে যে কটা গান গেয়েছি বিশাল হিট। তবু পরে গান পাইনি। সব ব্র্যান্ড ভ্যালু লতা-আশার। সুমন তো একেবারে অন্তরালেই সরে গেছে তাই। অনেকেই যোগ্য না হয়েও ঢের বেশি পুরস্কার পেয়েছেন। ফালতু পুরস্কারের জন্য আমি আর লালায়িতও নই।
কিন্তু আরতি মুখোপাধ্যায়ের গান, সংগ্রামী জীবন এখনও সবাই শোনে। আপনার প্রচুর ফ্যান আজও।
সত্যি কথা কজন লেখার বা বলার সাহস রাখে বলুন তো? সব তো গড্ডলিকা প্রবাহে চলছে। মানলাম আমার গান শোনে, কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। এটা হচ্ছে সবথেকে দুঃখের কথা। গান আমি ছাড়িনি। ছাড়ব না। যারা শিল্পী তাঁরা মৃত্যুর শেষদিন অবধি গান গায়। কিন্তু আমি প্রফেশনালি আর গান গাইব না। প্রফেশানটা একটা সম্মান। আমি যেসব গান গেয়ে এসেছি শ্রোতাদের কাছে আমার সেই মুগ্ধতাটাকে নষ্ট করব না।
(আরতি মুখোপাধ্যায় যা যা বলেছেন, তা ওঁর ব্যক্তিগত মত। দ্য ওয়াল সে মত প্রকাশ করেছে মাত্র। কোনও শিল্পীকে অবমাননা করার উদ্দেশ্য দ্য ওয়ালের নেই।)
দ্বিজেনদা পদ্মভূষণ আর সন্ধ্যাদি পদ্মশ্রী! দ্বিজেনদা কি বেশি বড় শিল্পী! বিস্ফোরক আরতি